কেনিয়ার উত্তরাঞ্চলে সামবুরুর তৃণভূমিতে অবস্থান নারীর নিরাপদ আবাসস্থল উমোজা গ্রামের। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের শেকল থেকে মুক্ত সেখানকার নারীরা। নিজেদের ঐতিহ্যকে পুঁজি করে জীবিকা নির্বাহ করে তারা। স্বামী ছাড়াও যে বেঁচে থাকা যায় তার জলজ্যান্ত প্রমাণ এই অঞ্চলের নারী সম্প্রদায়।
১৯৯০ সালের দিকে ব্রিটিশ সেনা কর্তৃক ধর্ষণ, নির্যাতন এবং পরিবার থেকেও অবহেলার শিকার হয়েরেবেকা লোলোসোলিসহ ১৫ জন নারী নিয়ে গঠিত হয় নারীর একক সম্প্রদায় উমোজা গ্রাম। এখানকার সব বাসিন্দারাই হয় ধর্ষণ, না হয় বাল্যবিবাহ কিংবা শারীরিক নির্যাতনের ভুক্তভোগী। তবে নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে তারা আজ সাবলম্বী, সুখী।
রেবেকা লোলোসোলি যখন তার পরিবারের সাথে বসবাস করতেন, তাকে প্রায়ই নিগৃহীত হতে হতো শারীরিক ও মানসিকভাবে। তিনি আশঙ্কা করেন, হয়তো এরকম আরও নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় অসহায় নারীদের। তারপর তিনি চিন্তা করেন নারীদের একক সমাজ গড়ে তোলার কথা। আর সেটিই তার কাল হয়ে দাঁড়ায়। প্রচন্ড মারধরের পর তিনি যখন হাসপাতালের শরনাপন্ন হন, তখনও তাকে হুমকি দেয়া হয় আকারে-ইঙ্গিতে। নারীদের অধিকার নিয়ে কথা বলার অপরাধে এরকম শিক্ষা দেয় পুরুষতান্ত্রিক সমাজ।
তবে হেরে যাননি লোলোসোলি। সব বাধা অতিক্রম করে নিজের স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করেছেন। উমোজার নারীরা এখন ঘুম থেকে উঠে ভয়হীন হাসিমুখ নিয়ে। এছাড়া নিজেদের আকর্ষণীয় গয়নার জন্য অর্জন করেছে বিশ্বজোড়া খ্যাতি। পর্যটকদের কাছে সেগুলো বিক্রি করে স্বাচ্ছন্দ্যে সন্তান লালন-পালন করছেন।
উমোজা গ্রামের স্বকীয় বৈশিষ্ট্যটি হলো উজ্জ্বলরঙা প্যাটার্নের সামবুরু স্কার্ট এবং শার্ট আর গলাজুড়ে কাঙ্গা নামক এক ধরনের গয়না। যা দেখলেই চেনা যায় আফ্রিকার এ অঞ্চলের নারীদের তৈরি সেগুলো। এছাড়া আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো এখানকার শিক্ষিত নারীরা সামবুরু গ্রামের আশেপাশের অঞ্চলগুলোতে বাল্যবিবাহ এবং এফজিএম বা ফিমেল জেনিটাল মিউটিলেশন সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করে।
সামবুরু অঞ্চলে গয়না সম্পর্কিত একটি হীন প্রথা এখনো চলমান। যেখানে মেয়েরা তাদের বাবার থেকে প্রথম নেকলেস পরার অধিকার গ্রহণ করে বিডিং এর মাধ্যমে। আর এজন্য ছোট মেয়েদের বয়স্ক একজন যোদ্ধার নিকট অস্থায়ী বিবাহে আবদ্ধ হতে হয়। তাদের রীতি অনুসারে জন্মনিয়ন্ত্রণ বৈধ তবে গর্ভধারণ নিষিদ্ধ। দূর্ঘটনাবশত গর্ভধারণ করলে জোরপূর্বক গর্ভপাত করা হয় সেখানে।
উমোজার নারীদের উদ্যোগে সৃষ্ট অ্যাকাডেমির প্রধান মিলকা দ্য গার্ডিয়ানকে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, বিডিং প্রথার বৈধতার জন্য অল্পবয়স্ক মেয়েদের শারীরিক অক্ষমতাকে প্রাধান্য দিয়ে গর্ভপাত করা হয় সামবুরুর বিভিন্ন জায়গায়। কিন্তু উমোজা কখনো নারীকে শারীরিক কিংবা মানসিকভাবে নিপীড়িত হওয়ার পক্ষে নয় হোক অল্পবয়স্ক, মধ্যবয়স্ক বা বৃদ্ধা। যার প্রমাণ পাওয়া যায় নাগুসির কথায়। যিনি পাঁচ সন্তানের মায়ের ভূমিকা পালন করার পাশাপাশি নিজের হাতে গয়না তৈরি করে জীবনধারন করছেন। উমোজায় তাকে কখনো কোনো কাজে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়নি। তিনি এখন প্রাণ খুলে বাঁচেন আর গর্ববোধ করেন।
২০২১ সালের মার্চ মাসে প্রকাশিত রয়টার্সের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী এ গ্রামে বাস করছেন ৩৭ জন নারী ও তাদের সন্তান।
আতঙ্কিত দিনগুলোর কথা মনে করতে গিয়ে এখনো ভয়ে শিউরে ওঠে অনেকে। সেরকমই একজন হলেন জেইন। দ্য গার্ডিয়ানের নেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আমি উমোজাতে এসেছিলাম এরকমই উত্তপ্ত এক দুপুরে। যখন ছেলে-মেয়েরা ক্লান্তির ভারে ঘুমাচ্ছিল। মধ্যবয়স্কা নারীরা চাটাই বুনছিল আর গল্প করছিল। আমি যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। আমাকে তারা নাচে-গানে অভ্যর্থনা জানালো।
পায়ের একস্থানে গভীর ক্ষত দেখিয়ে তিনি বলেন, একদিন আমি যখন মাঠে ভেড়া-ছাগল চড়াচ্ছিলাম আর কাঠ সংগ্রহ করছিলাম তখন গুর্খা পরিহিত তিনজন আমাকে মাটিতে ফেলে দিল। ধর্ষণের শিকার হলাম আমি। তারপর আমি যখন এই ঘটনায় আমার শারীরিক যন্ত্রণা আর হতাশার কথা আমার শাশুড়িকে জানালাম তিনি ঘরোয়া ঔষধ দিয়েই ক্ষান্ত রইলেন। কিন্তু আমি সুস্থ হলাম না। যখন আমার স্বামীকে এ সম্পর্কে বললেন তিনি আমাকে মারধর করলেন। আমি সইতে না পেরে আমার সন্তানদের নিয়ে চলে এলাম উমোজায়।
পুরুষবিহীন এই গ্রামের নারীরা স্বাধীন ও মুক্ত, জীবিকা ও জীবনযাপন উভয়েই তারা এগিয়ে যাচ্ছেন।
আসরিফা সুলতানা রিয়া বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়ন করছেন।
asrifasultanareya@gmail.com