“মাগো, আজ মনে পড়ছে বিদায় বেলায় তোমার হাসিমুখ” - ‘৭১ এর চিঠি


মোঃ ইমরান | Published: December 27, 2021 14:34:04 | Updated: December 27, 2021 19:17:02


“মাগো, আজ মনে পড়ছে বিদায় বেলায় তোমার হাসিমুখ” - ‘৭১ এর চিঠি

আচ্ছা, সত্যি করে বলো তো লক্ষ্মী, তুমি কি গোমড়া মুখ করে সারা দিন ঘরের কোণে একাকী বসে কাটাও? না, এ চিঠি পাবার পর থেকে তা করো না। আমি কিন্তু টের পেয়ে যাব।

এটি যুদ্ধের ময়দান থেকে লেখা মুক্তিযোদ্ধা পাটোয়ারী নেসার উদ্দিনের (নয়ন) চিঠি। লিখেছিলেন স্ত্রী ফাতেমা বেগমকে (অনু)

হানাদারদের হামলা, রাজাকারদের উৎপাত- সবকিছু সামলে লড়ে যাচ্ছিল মুক্তিযোদ্ধারা। এসবের মাঝেই তারা প্রিয়জনদের চিঠি লিখেছেন। সেসব চিঠি আজকের স্বাধীন বাংলাদেশে বসে পড়তে গেলে বারবার যেন গায়ে শিহরণ অনুভূত হয়।

দোয়া করবেন, যেন আপনার ছেলে দেশের মুক্তিসংগ্রামে জয়ী হতে পারে- বাবাকে লেখা পুত্রের চিঠি।

যুদ্ধে যাওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধা আজিজুল হক তার বাবাকে চিঠিটি লেখেন।

আমি জীবনে কোনোদিন আপনাদের সুখ দিতে পারি নাই। জানি না দিতে পারব কি না। দোয়া রাখবেন। মায়ের প্রতি নজর দিবেন।

টেকেরহাটে যুদ্ধরত আরেক মুক্তিযোদ্ধা মোঃ সিরাজুল ইসলাম বাবাকে চিঠি লেখেন,

আমার অনুপস্থিতিতে মাকে কষ্ট দিলে আমি আপনাদের ক্ষমা করবো না। আমি মৃত্যুর মুখে আছি। যেকোনো সময় মৃত্যু হতে পারে, আমরা প্রস্তুত। দোয়া করবেন মৃত্যু হলেও যেন দেশ স্বাধীন হয়। তখন লাখ লাখ ছেলে বাংলার বুকে পুত্রহারাকে বাবা বলে ডাকবে। এই ডাকের অপেক্ষায় থাকুন।

মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম বড়ছড়া যুদ্ধক্ষেত্রে পাক বাহিনীর বাঙ্কারে হামলা চালান। সীমিত অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন, গুড়িয়ে দেন বাঙ্কার। তবে শত্রুপক্ষের গুলি তার বুকে লাগে। ৮ আগস্ট তিনি শহীদ হন। এ চিঠি লিখেছিলেন ৩০ জুলাই। মৃত্যুর আগাম বার্তা গর্বের সাথেই দিয়েছিলেন বাবাকে।

মামাকে লেখা শহীদ রুমির চিঠি -

পড়ার পর চিঠিটা নষ্ট করে ফেলো। এনিয়ে আম্মাকে কিছু লিখে জানানোর চেষ্টা করো না। তাহলে তাদের বিপদে পড়তে হবে। আমরা ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধ লড়ছি। আমরা জয়ী হবো।

একাত্তরের ১৬ই জুন, পাশা মামাকে রুমী চিঠিটি লিখেছিলেন আগরতলা থেকে। সাবধানতা, শত্রুদের নৃশংসতা সব কিছু লিখেছেন এই চিঠিতে।

তুমি যখন এই পত্র পাবে আমি তখন অনেক দূরে থাকব, একজন মায়ের কাছে সন্তানের চিঠি:

জুন-জুলাইয়ে বাংলায় প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। একাত্তরের এই সময়ে মুক্তিযোদ্ধারা কোনোমতে টিনের চৌচালা ঘর, ক্যাম্পে বা খোলা মাঠে থেকেই দুর্বার এগিয়ে যাচ্ছিলো।

টিনের চালা ঘরে বসে আছি। বাইরে ভীষণ বৃষ্টি, ঘুটঘুটে অন্ধকার। প্রকৃতির চাপা আর্তনাদ শোনা যাচ্ছে টিনের উপর পড়া বৃষ্টির শব্দে। মাগো, আজ মনে পড়ছে বিদায় বেলায় তোমার হাসিমুখ। সাদা ধবধবে শাড়িটায় বেশ মানিয়েছিলো তোমায়......আমরা পশু (পাকিস্তান) ওদের হত্যা করছি। এই তো সেদিন হানাদার বাহিনী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে চরম মার খেয়েছে। মা, তোমার ছোট্ট ছেলে বিপ্লবের হাতেই লেগে আছে বেশ কয়টা পশুর রক্ত।"

চিঠিতে মুক্তিযোদ্ধা ও তার মায়ের পরিচিতি জানা যায়নি।

আরেকজন মুক্তিযোদ্ধা জেল থেকে লিখেন, "আমাদের ওপর তারা অকথ্য অত্যাচার করেছে। আমাদের জেলে অনেকদিন থাকতে হবে। ইদ মোবারক।

ঈদের শুভেচ্ছা দেয়ার জন্য ১১ই নভেম্বর ৭১-এ ক্ষুদে বার্তাটি লেখেন মুক্তিযোদ্ধা কামাল। মায়ের সাথে ইদ আর করা হয়নি। কিছুদিন দিন পর ২১ তারিখে তিনি শহীদ হন।

তুমি যখন পড়তে শিখবে, বুঝতে শিখবে, তখনকার জন্য এই চিঠিটি লিখছি - মেয়ের প্রতি বাবার চিঠি।

মুক্তিযোদ্ধা আতাউর রহমান খান কায়সার একাত্তরের ১৬ জুলাই তার মেয়ের জন্মদিনে চিঠিটি লেখেন।

চিঠিতে, কী অপরাধে তোমার আব্বু আজ তোমার কাছে আসতে পারে না। তোমাকে কোলে নিয়ে আদর করতে পারে না, বড় হয়ে হয়তো বুঝবে, মা।

আরো বলেন, আজকে দেশের জনসাধারণ তোমার আব্বুর মতো অপরাধী কারণ তারা নিজেদের অধিকার চেয়েছিল.....হানাদারদের কাছে এর চেয়ে বড় অপরাধ আর কিছুই নেই। এই অপরাধের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড.... সেই দণ্ড এড়াবার জন্য তোমার আব্বুকে গ্রামে-গ্রামে, পাহাড়ে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে। তাই আজ বুক ফেটে গেলেও আব্বু এসে তোমাকে কোলে নিয়ে আদর করতে পারছে না। তোমার আম্মু এখন দুঃখ পেলে একা একা কাঁদবে। তুমি আদর করে সান্ত্বনা দিও, কেমন? তুমি আমার অনেক অনেক চুমো নিও- ইতি আব্বু।

রাজাকাররা ২৪ ঘন্টা আমাদের বাড়ি পাহারা দিচ্ছে-তোমাকে ধরার জন্য- স্ত্রীর চিঠি তার স্বামী জন্য।

কদবানু আলেয়া একাত্তরের ২৮ সেপ্টেম্বর তার স্বামী মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রাজ্জাককে ঘরের পরিস্থিতি, তার কষ্ট ও সার্বিক অবস্থা জানিয়ে চিঠিটি লেখেন।

তিনি লেখেন, তোমার দ্বিতীয় সন্তানের বয়স যখন ৬ তখন চিঠিটি পাই। তোমার বড় ছেলে সব সময় পতাকা হাতে নিয়ে জয় বাংলা বলতে থাকে আর রাজাকাররা ধমক দেয়।... আল্লাহর কাছে দোয়া করি, দেশ স্বাধীন করে ফিরে এসো সুস্থ দেহে।

তোমার শরীরে পরিবর্তন এসেছে বোধহয়, নিজের প্রতি যত্নবান হয়ো - স্ত্রীকে লেখা চিঠি।

মুক্তিযোদ্ধা পাটোয়ারী নেসার উদ্দিন (নয়ন) একাত্তরের ৭ জুলাই চিঠিটি লেখেন। মায়াভরা চিঠিটিতে স্ত্রীকে অভিমান করতে মানা করেন তিনি।

একেবারে কিছু না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘুমিয়ে পড়েও কিন্তু ঘুমিয়ে থাকতে পারিনি। তুমি এসে ঘুমের বারোটা বাজিয়ে হরেক রকমের এত খানা খাইয়ে দিয়েছো যে আর খেতে পারি না বলে তোমার হাত চেপে ধরে যেই দুষ্টুমি করতে গিয়েছি তখনই ঘুম ভেঙ্গে গেল। নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে দেখি আমি বাড়িতে শুয়ে নেই। সুউচ্চ পাহাড়ের মালভূমিতে তাঁবুর এক কোণ ঘেঁষে আমার ব্যাগটার (যেটা বালিশের কাজ দিচ্ছিল) হ্যান্ডেল ধরে উপরের দিকে তাকিয়ে আছি।

মুক্তিযোদ্ধাদের করুণ পরিস্থিতি, দীর্ঘদিন না খেয়ে থাকা, সঙ্গী হারিয়ে লড়ে যাওয়া, আবার হানাদারদের পরাজিত করে জয়ের উল্লাস - মা ও মাতৃভূমির প্রতি তাদের এই অনুপম আত্মত্যাগ আমাদের উপলব্ধির বাইরে।

মুক্তিযোদ্ধা নেসার, অনুকে লেখা চিঠিতে ইতি টানেন একটি ধাঁধা দিয়ে।

তিন অক্ষরের নাম আমার, হই দেশের নাম।

মধ্যের অক্ষর বাদ দিলে গাছেতে চড়লাম

শেষের অক্ষর বাদ দিলে কাছে যেতে কয়

বলো তো অনু, আমি রয়েছি কোথায়?

মোঃ ইমরান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ এবং সাংবাদিকতা বিভাগের মাস্টার্সে অধ্যয়নরত।

mohd.imranasifkhan@gmail.com

Share if you like