‘ফোরটিন পিকস: নাথিং ইজ ইম্পসিবল’ —কম সময়ে ১৪টি ৮ হাজারি শৃঙ্গ জয়ের গল্প


কৌরিত্র তীর্থ | Published: March 14, 2022 20:44:31


‘ফোরটিন পিকস: নাথিং ইজ ইম্পসিবল’ —কম সময়ে ১৪টি ৮ হাজারি শৃঙ্গ জয়ের গল্প

বেশিরভাগ সময় তারা যে কথাটি বলেন তা হলো- আমার শেরপা আমাকে সাহায্য করেছে। ব্যাস! শেরপাদের যেন কো্নো নাম হয় না। অথচ তাদের বলা উচিত- মিংমা ডেভিড আমাকে সাহায্য করেছে। কৃতিত্ব এবং স্বীকৃতির ভাগ শেরপাদের কপালে বরাবরই কম জোটে, আক্ষেপ ঝরছিল নির্মল পুর্জার কণ্ঠে। ভালোবেসে শেরপারা তাকে ডাকেন নিমসদাই।

৮০০০ মিটারের বেশি উচ্চতার পর্বত পৃথিবীতে আছে কেবল ১৪টি। আর এর সবকয়টি পড়েছে হিমালয়-কারাকোরাম রেঞ্জে। সবচেয়ে কম সময়ে এই আট-হাজারি ক্লাবে পৌঁছাবার রেকর্ড ছিল দক্ষিন কোরীয় পর্বতারোহী কিম চ্যাং-হোয়ের দখলে, ৭ বছর ৩১০ দিন।

নির্মল পুর্জা এসে ঘোষণা দিলেন, যদি বেঁচে ফিরি, এটি আমি সাত মাসে করে দেখাব।

সাত মাস অবশ্য লাগেনি। ছয় মাস ছয় দিনেই নির্মল তার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছান। প্রজেক্ট পসিবল নামের প্রায় অসম্ভব এই অভিযানের গল্প নিয়েই নেটফ্লিক্সে গত বছরের ২৯শে নভেম্বর মুক্তি পায় তথ্যচিত্র ফোরটিন পিকস: নাথিং ইজ ইম্পসিবল।

অভিযানটির উদ্দেশ্য বর্ণনায় নির্মল দুটি বিষয় উল্লেখ করেন। প্রথমত, শেরপাদের প্রাপ্য সম্মান ও স্বীকৃতির বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি এবং দ্বিতীয়ত, মানুষের সক্ষমতার দৌঁড় কতটুকু তা পরখ করে দেখা। এই করতে গিয়ে তিনি ব্রিটিশ স্পেশাল সার্ভিসের চাকরিতে ইস্তফা দিয়েছেন, ইংল্যান্ডে নিজ বাড়ি বন্ধক পর্যন্ত রেখেছেন।

প্রতি চারজন পর্বতারোহীর একজন অন্নপূর্ণা জয় করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেন। আবহাওয়া ও কাঠামোগত কারণে পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্গম পর্বতটি দিয়েই নির্মল প্রজেক্ট পসিবল-এর যাত্রা শুরু করেন। সহযাত্রী হিসেবে পান মিংমা ডেভিড, গেলজেন শেরপা, লাকপা ডেন্ডি ও গেসমান তামাংকে।

২০১৯ সালের এপ্রিল-মে মিলিয়ে তারা নেপালের ছয়টি শৃঙ্গ জয় করেন। এর মধ্যে অন্নপূর্ণা তো রয়েছেই, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এভারেস্ট, লোৎসে ও মাকালু জয় করে নতুন এক বিশ্বরেকর্ডেও তারা নাম লেখান। কাঞ্চনজঙ্ঘা ও ধবলগিরি প্রথম পর্যায়ের অন্য দুটি পর্বত।

এভারেস্টে ট্রাফিক জ্যাম; এভারেস্ট সামিট শেষে নামার পথে নির্মল পুর্জার তোলা বিখ্যাত ছবি

ধবলগিরির চূড়ায়

জুন-জুলাইয়ে বাক্সপেটরা গুছিয়ে প্রজেক্ট পসিবল রওয়ানা দেয় পাকিস্তানের উদ্দেশ্যে। কারাকোরাম রেঞ্জের নাঙ্গা পর্বত, গ্যাশেরব্রুম ১, গ্যাশেরব্রুম ২, ব্রড পিক এবং স্যাভেজ মাউন্টেন হিসেবে পরিচিত কে২, পর্বতারোহী জর্জ বেলের ভাষ্যে যা সবসময় আপনাকে খুনের চেষ্টায় মত্ত, জয় হয় অভিযানের দ্বিতীয় ধাপে। মাত্র ২৩ দিনে এই ধাপ সম্পন্ন হয়।

শীতকালে প্রথমবারের মতো কোনো অভিযাত্রী দলের কে২ জয়

অভিযানের সর্বশেষ পর্যায়ে মানাস্লু, চো উয়ু এবং শিশাপাংমা জয় করেন নির্মল ও তার দল। স্বায়ত্তশাসিত তিব্বতে অবস্থিত শিশাপাংমা আরোহণের অনুমতি আদায়ে নির্মলের লড়াই নিয়ে চাইলে আরেকটি ডকুমেন্টরি বানিয়ে ফেলা সম্ভব!

গ্যাশেরব্রুম ২ জয়ের পথে

গুর্খা সৈন্য থেকে ব্রিটিশ স্পেশাল সার্ভিসের সদস্য বনে যাওয়া নির্মল পুর্জার সঙ্গে তার মায়ের সম্পর্কের গভীরতা এবং স্ত্রীর তাকে সমর্থন করা তথ্যচিত্রটির গুরুত্বপূর্ণ দুটি বিষয়। সেইসাথে শেরপাদের সঙ্গে তার বন্ধন, তাদের মর্যাদা ও পারিশ্রমিকের প্রশ্নে তার আপসহীনতা নতুন নেপালের এক পরিচায়ক বটে।

তথ্যচিত্রটিতে দেখানো নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে নির্মলের বেড়ে ওঠা কিংবা এভারেস্ট জয় করে তেনজিং নোরগের ফিরে আসার দৃশ্য একইসাথে যেন নেপালের সমৃদ্ধ ইতিহাস এবং বঞ্চনার দলিল।

পর্বতারোহণের রেকর্ডবই ওলট-পালট করে নেপালে প্রজেক্ট পসিবল

অভিযানের সময় নির্মল ও তার দলের ধারণকৃত ১০০ ঘণ্টারও বেশি ভিডিও ফুটেজ থেকে তথ্যচিত্রটি নির্মাণ করেছেন টরকিল জোনস। সঙ্গে যোগ করেছেন অ্যানিমেশন, আর্কাইভ ফুটেজ এবং সাক্ষাৎকার।

পর্বতারোহণ নিয়ে একের পর এক উৎকৃষ্ট ও উপভোগ্য তথ্যচিত্রের আগমন এই ধারার ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তারই ইঙ্গিত দেয়। তবে ফ্রি সোলো কিংবা দ্য অ্যালপিনিস্ট- এর মতো তথ্যচিত্র থেকে বিষয়বস্তুর দিক দিয়ে ফোরটিন পিকস খানিকটা ভিন্ন। তথ্যচিত্রটিতে পর্বতারোহণের প্রতিকূলতা, আনন্দমিশ্রিত ভয় বা জয়ের সন্তুষ্টি সম্পর্কে বিশদাকারে দেখানো হয়নি।

এটি যতটা না পর্বতারোহণের কাঠিন্যের, তার চেয়ে বেশি নির্মলের সেই কাঠিন্যকে জয়ের, তার দুর্দমনীয় মানসিকতার। তাকে তাই তথ্যচিত্রে বলতে শোনা যায়, আমি সবসময় নিজেকে বলি, আজ মৃত্যু নয়। হয়তো কাল, হয়তো পরশু। তবে আজ নয়।

কৌরিত্র পোদ্দার তীর্থ বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করছেন।

kouritra001tirtha@gmail.com

Share if you like