Loading...

‘জীবন আমার বোন’: ভিন্ন দর্শনে মুক্তিযুদ্ধ


‘জীবন আমার বোন’: ভিন্ন  দর্শনে মুক্তিযুদ্ধ

“রাজনৈতিক সংকট কি নতুন কোনো ব্যাপার, শয়তানি আর বজ্জাতি কবে গা থেকে ঝেড়ে ফেলতে পেরেছে মানুষ” - সমকালের সাথে মিশে যাওয়া এই উক্তিটি ১৯৭২ সালেই খোকা চরিত্রের মাধ্যমে লেখনীতে তুলে ধরেছিলেন লেখক মাহমুদুল হক।

বাংলা সাহিত্যের শক্তিমান কথাশিল্পী মাহমুদুল হক তার চমকপ্রদ লেখনশৈলী এবং লেখনীর মাধ্যমে  পাঠকের সামনে এক জীবন্ত আবহ তৈরি করতে সর্বদাই সিদ্ধহস্ত।

‘জীবন আমার বোন’ উপন্যাসটিতেও তার লেখনীর  বৈশিষ্ট্যের বিন্দুমাত্র ব্যতিক্রম ঘটেনি। বরং শব্দচয়ন এতটাই জীবন্ত যে পাঠক তার লেখা পড়ে সেই ঘটনার জগতে হারিয়ে যেতে বাধ্য।

উপন্যাস যে সময়ের গল্পে আবর্তিত হয়েছে তা মূলত যুদ্ধ পূর্ববর্তী দেশের অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি।

এ কথা শুনে পাঠক ভেবে নিতে পারেন যে, হয়ত লেখাটা মুক্তিযুদ্ধের সময়কার পটভূমিতে রচিত। কিন্তু পাঠক যতই বইয়ের পাতা উল্টাতে থাকবেন ততই পরিষ্কার বুঝতে পারবেন যে, এ উপন্যাসে সব কিছুকে  ছাড়িয়ে গিয়েছে একটি চরিত্রের ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি এবং তার সার্বিক জীবন–দর্শন।

চরিত্রটির নাম জাহেদুল কবির খোকা। এ উপন্যাসের প্রেক্ষাপট এবং বর্ণিত অন্যান্য সব চরিত্র মিলে শক্তভাবে রচিত হয়েছে খোকা চরিত্রটির ভীত, যার উপর পুরো উপন্যাসের ইমারত নির্মিত হয়েছে।

উপন্যাসের শুরুতে নজর কাড়ে ১৯৭১ সালের ১লা মার্চের অধিবেশন স্থগিত নিয়ে জনগ্ণের প্রতিক্রিয়া। এই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া সবচেয়ে বেশি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে খোকার বয়সী তরুণদের মধ্যে।

কিন্তু খোকাকে এসবের কিছুই স্পর্শ করেনা। একমাত্র ছোটবোন রঞ্জুকে এমন অস্থিতিশীল পরিবেশে বাসায় একা রেখে সে ঘুরে বেড়ায়, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে যায়।

যেখানে তার বন্ধুরা সংগ্রামের জন্য একটু একটু করে প্রস্তুতি নিতে থাকে, সেখানে স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে খোকার মনে প্রশ্ন জাগে, “দেশ আগে না মানুষ আগে?”

প্রকৃতপক্ষে খোকা প্রচন্ড রাজনীতি সচেতন একজন মানুষ।  রক্তপাত তাকে আকর্ষণ করেনা। সে ভাবে, “যে দেশ রক্ত দাও রক্ত দাও বলে দুশো বছর ধরে চিৎকার করে চলেছে, আমাদের কেউ নয় সে, দেশ মাতৃকা তুই নস!”

পাঠক এখানে খোকা চরিত্রের মাধ্যমে মূলত লেখক মাহমুদুল হকের দৃষ্টিকোণ দিয়ে ভিন্নভাবে মুক্তিযুদ্ধকে দেখতে পাবেন। যুদ্ধের প্রতি খোকার টান না থাকলেও তার অন্তর ভালবাসায় পরিপূর্ণ।

উপন্যাসের মধ্যে আরও দেখা যাবে সাধারণ মানুষের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে স্বপ্ন এবং প্রস্তুতির কথা। জানা যাবে অসহযোগ আন্দোলন, ৭ই মার্চের ভাষণ এবং ধীরে ধীরে ২৫ মার্চের কালোরাতের ভয়াবহতার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সূচনার কথা।

এ উপন্যাসের উল্লেখ্যযোগ্য দিক খোকা চরিত্রের কল্পনার জগতে নানা চিন্তার মধ্যকার টানাপড়েন। একদিকে সে যেমন দেশের প্রচলিত যুদ্ধস্রোতের বিপরীতে গিয়ে কল্পনার জাল বোনে। আবার অন্যদিকে নীলা ভাবির সাথে তার ঘনিষ্ঠতা তাকে রীতিমতো দহন করতে থাকে।

আবার একইসাথে তার দুইবোনের মৃত্যু এবং রঞ্জু তাকে অন্যরকম এক মানুষ হিসেবে পাঠকের সামনে উপস্থাপন করায়।

এ উপন্যাসের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য চরিত্র লুলু চৌধুরী, বেলি, ইয়াসিন, মুরাদ, রহমান, রাজীব ভাই।

পুরো উপন্যাস পড়ে পাঠক খোকা চরিত্রের সাথে এত বেশি একাত্ম হবে যে, কখনো তারা যেমন খোকার জন্য সহানুভূতি অনুভব করবে আবার তার প্রতি বিমুখতাও অনুভব করবে। 

খোকা তার বন্ধু মুরাদ, রহমান, ইয়াসিনের মতো যুদ্ধে যায়নি। ২৫ শে মার্চের রাতে সে তার বোনকে একা রেখে নীলা ভাবির বাসায় দুদিন বন্দী ছিল এবং উপন্যাসের একদম শেষে তার বোনকেও চিরতরে হারায়।

এতকিছুর পরেও খোকা এ উপন্যাসের নায়ক। আর এটাই এ উপন্যাসের মহিমাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। 

এ উপন্যাসের পরিচ্ছেদ সজ্জাতেও লেখক দিয়েছেন দক্ষতার পরিচয়। সব মিলিয়ে ১৫৮ পৃষ্ঠার বইটি পাঠকের সামনে নতুন করে সব কিছু ভাবার দ্বার উন্মোচিত করে বলে বইটি বার বার পাঠের দাবি রাখে।

aurthynobonita@gmail.com

 

 

 

 

 

 

Share if you like

Filter By Topic