Loading...

‘গম কূটনীতির’ বীজ বুনছে রাশিয়া

| Updated: September 06, 2021 12:05:42


‘গম কূটনীতির’ বীজ বুনছে রাশিয়া

“ভ্লাদিমির পুতিন মাত্রই রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন। সে সময় এক বৈঠকে পুতিনকে জানান হলো যে প্রয়োজনীয় খাদ্যশস্যের ৫০ ভাগেরও বেশি আমদানি করে থাকে রাশিয়া। আর এ কথা শোনার পর পুতিনের মুখ থেকে রক্ত সরে যায়।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মস্কোর এক বিপণন উপদেষ্টা এসব কথা বলেন ফাইনান্সিয়াল টাইমসের নাস্তাসিয়া অ্যাস্ত্রাশেউস্কায়াকে। ২০০০ সালে অনুষ্ঠিত সেই বৈঠকের কথা স্মরণ করে তিনি আরো বলেন, “পুতিন তখনই রাশিয়ায় উন্নততর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে তাঁর লক্ষ্য হিসেবে ঠিক করেন।” এ বিশেষজ্ঞ এও বলেন, “অন্যের ওপর নির্ভর করাকে ভয় পান পুতিন। আর এখন গম উৎপাদনে বিশ্বে শীর্ষে অবস্থান করে নিয়েছে রাশিয়া। অন্যান্য দেশকেই এখন রাশিয়ার ওপর নির্ভর করতে হয়।”

সোভিয়েত ইউনিয়নের জের টেনে ২০০০ সাল পর্যন্ত চলছিল রাশিয়া। একদিকে আমদানি করা খাদ্যের ওপর নির্ভর করতে হতো।  অন্যদিকে খাদ্যোৎপাদনকারীদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা হতো। খাদ্যোৎপাদন খাতে কোনো ভর্তুকির চেহারা দেখত না কেউ।

২০০৪ সালে রাষ্ট্র-পরিচালিত কর্মসূচি নেন পুতিন। এই কর্মসূচির লক্ষ্য ছিল জাতীয় প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে কৃষি খাতে উন্নয়ন, বিনিয়োগ প্রণোদনা এবং উৎপাদনের বিকাশ ঘটানো। শস্যসহ প্রধান প্রধান খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে ৮০ থেকে ৯৫ শতাংশ স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যমাত্রা এতে গ্রহণ করা হলো। মাত্র এক দশক পরে বাজারে স্বচ্ছতা বাড়ানোর লক্ষ্যকে সামনে রেখে রাশিয়ায় চালু হলো শস্য-সনদ। “সবার সুবিধাকে অগ্রাধিকার দিয়ে বড় বড় উৎপাদনকারী এবং রাষ্ট্র খাদ্যপণ্য বাজারের লুকোচুরি কমিয়ে আনতে রাজি হলো। এর ফলও হয়েছে খুবই ইতিবাচক,” বলেন গাজপ্রোম ব্যাংকের বিশ্লেষক দারিয়া স্নিতকো । তিনি আরো যোগ করেন, “এ পদক্ষেপ নিশ্চিত ভাবেই রপ্তানিতেও সহায়তা করছে।”

২০১৪ সালে ক্রিমিয়া অধিগ্রহণ এবং ইউক্রেনের সঙ্গে টানাপোড়েনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা চাপায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এতে রুশ মুদ্রা রুবেলের দাম ধপ করে পড়ে যায়। এর ফলে রাশিয়া থেকে পণ্য রপ্তানি হয় সস্তা। আবার রাশিয়াও পশ্চিম থেকে আমদানি করা বেশির ভাগ খাদ্যপণ্যের ওপর একই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এই নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ খাদ্যপণ্য উৎপাদন লাফ দিয়ে বেড়ে যায়।

এর কিছু পরেই, ২০১৭ সালে, ভৌগলিক আয়তনে দুনিয়ায় সবচেয়ে বড় দেশটি গম রপ্তানিতে শীর্ষ স্থান অধিকার করে। প্রথমবারের মতো এ ক্ষেত্রে আমেরিকা ‌এবং কানাডাকে হটিয়ে দেয় রাশিয়া। পরে এক সংবাদ সম্মেলনে পুতিন বলেন, “রাশিয়া এখন এক নম্বর দেশ। আমেরিকা এবং কানাডাকে হটিয়ে দিয়েছে রাশিয়া।”

নিষেধাজ্ঞা জর্জরিত রুশ অর্থনীতির জন্য বিদেশি মুদ্রা অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হলো খাদ্যশস্য, বিশেষ করে গম। কৃষিপণ্য রপ্তানিকে নিজের শক্তিকেন্দ্র করে তুলছে রাশিয়া। এখন ইউরেশিয়া, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার বাজারে আস্তে আস্তে ঢুকছে দেশটি। তেল রপ্তানি থেকে আয়ের ওপর নির্ভরতা কমাতে চাইছে রাশিয়া। একইসাথে, কৃষিপণ্যের নতুন নতুন বাজার বের করছে এবং বিশ্বজুড়ে এ লক্ষ্যে কূটনৈতিক তৎপরতাও অব্যাহত রেখেছে। রুশ শস্য ধীরে ধীরে ক্রেমলিনের কাছে নতুন তেল-অস্ত্র হয়ে উঠছে বলেও অনেকে আশঙ্কা করেন। এ পণ্যের মাধ্যমে অনেক দেশকেই রাশিয়ার সম্পদের ওপর নির্ভরশীল করে রাখা যাবে। শুধু তাই না এর জোরে অন্তত অন্য অনেক দেশের দরজাও রাশিয়ার জন্য খুলবে।

২০১৬ সালে তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর সংস্থা ওপেকের সাথে একযোগে নিজ তেল উৎপাদন কমানোর চুক্তি করে রাশিয়া। কার্যত তেল-বাজারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে সৌদি আরব। এ দেশটির সঙ্গে বাণিজ্যের সুযোগ নেওয়ার লক্ষ্যে তেলে উৎপাদন কমায় রাশিয়া। সৌদি আরবের জন্য সে সময় তেলের দাম বাড়ানো রাশিয়ার থেকেও বেশি প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছিল। নিজ বাজেট ব্যয়কে সামাল দেওয়ার প্রয়োজনেই এ দিকে পা বাড়ায় সৌদি আরব। কথাটি বলেন টিএস লোমবার্ডের পুঁজি বিনিয়োগ সংক্রান্ত গবেষণাকারী মাদিনা ক্রসতালেভা। তেল উৎপাদনের মাত্রা কমানো এবং দাম বাড়ানোর এ নীল-নকশার ক্ষেত্রে আপসের পথ ধরে মস্কো। “বিনিময়ে সৌদি আরব তার মুরগী এবং শস্যের বিশাল বাজারের দরজা রাশিয়ার জন্য খুলে দেয়।”

গম আমদানির বেলায় মানের কড়াকড়ি হালে শিথিল করেছে রিয়াদ, এতেই রাশিয়ার জন্য দেশটিতে শস্য রপ্তানির পথ খুলে গেছে। বর্তমানে সৌদি আরবের আমদানি করা শস্যের ১০ শতাংশের যোগান দিচ্ছে রাশিয়া। এ শস্যের সিংহভাগই বার্লি বলে জানায় রেলপথে শস্য পরিবহনে রাশিয়ার প্রধান সংস্থা রাসাগ্রোট্রান্স।

নতুন নতুন বাজারের খোঁজে সফল তদবিরে নামে রাশিয়া। এতে, বিশেষ করে, রাশিয়ার বড়ো খদ্দের বনে যায় এশিয়া, বিশেষত চীন এবং ভিয়েতনাম। ২০২০ সালে রাশিয়ার গরুর গোশত রপ্তানি বাড়ে তিনগুণ আর শূকরের মাংস বাড়ে দ্বিগুণ। দুই খাতেই রপ্তানির হার ওজন এবং ডলার উভয় হিসাবেই বেড়েছে। গত বছর গৃহপালিত পশুর মাংস আমদানির জন্য চীনের বাজার রাশিয়ার জন্য খুলে দেওয়া হয়। রাশিয়ার রপ্তানিকৃত মোট গরুর গোশতের অর্ধেকেই গেছে চীনে। অন্যদিকে ২০১৯ সালের শেষাংশে এসে রুশ শূকরের মাংস আমদানি করতে শুরু করে ভিয়েতনাম। বর্তমানে দেশটির দ্বিতীয় বৃহৎ গোশত রফতানিকারক দেশই রাশিয়া।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, শস্য এবং মাংস রপ্তানির ধারাবাহিকতায় উন্নয়নশীল দেশগুলোতে রুশ উপস্থিতি গভীরতর রূপ নিচ্ছে। বিশেষ করে রুশ পড়শি দেশগুলো এবং যাদের সঙ্গে যোগাযোগে সমস্যা নেই তাদের বেলায় এটি পুরোপুরি বাস্তব হয়ে উঠেছে। আগামী ৩০ বছরে বিশ্বের জনসংখ্যা আরো ২০০ কোটি বাড়বে। এই জনসংখ্যার সঙ্গে তাল মেলাতে হলে ২০৫০ সালের মধ্যে পৃথিবীর খাদ্য উৎপাদন আরো ৪০ শতাংশ বাড়াতে হবে বলে জাতিসংঘের হিসাবে বলা হয়েছে।

রাসাগ্রোট্রান্সের বোর্ড-সদস্য ওলেগ রোজাচেভ দৃঢ়তার সঙ্গে জানান, “খাদ্যশিল্পে রাশিয়ার সুনির্দিষ্ট প্রবৃদ্ধি এবং সফলতার নিশ্চয়তা রয়েছে। ভূরাজনৈতিক অবস্থানই এ শিল্পে রাশিয়ার জন্য মুনাফা যোগানোর নিয়ামক।”

তিনি আরো বলেন, “খাদ্য ঘাটতিতে ভোগে এমন ভোক্তাদেশগুলো বস্তুত রাশিয়ার কাছাকাছি অবস্থিত। আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়-প্রশান্তমহাসাগরীয় অঞ্চল এবং দূরপ্রাচ্যে এ সব দেশের অবস্থান রাশিয়ার খুবই কাছে। এ সব দেশের চাহিদা মেটানোর সহজ ও সংক্ষিপ্ত সরবরাহ পথ রাশিয়ার মধ্য দিয়েই গেছে।”

[ফাইনান্সিয়াল টাইমস থেকে বাংলায় রূপান্তর করেছেন সৈয়দ মূসা রেজা]

Share if you like

Filter By Topic