Loading...

‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’: ধ্রুপদী উপন্যাসে খুনি চরিত্রের উৎসমূল কোথায়!

| Updated: December 27, 2021 17:40:52


‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’: ধ্রুপদী উপন্যাসে খুনি চরিত্রের উৎসমূল কোথায়!

রুশ সাহিত্যের অন্যতম ধ্রুপদী রচনা ফিওদর মিখাইলোভিচ দস্তয়ভস্কি’র ‘অপরাধ এবং শাস্তি’(ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট)। বিশ্ব সাহিত্যের অসীম জগতেও এ পুস্তক শ্রেষ্ঠতম রচনাবলীর অন্যতম উজ্জ্বল গ্রন্থ হয়ে বিরাজ করছে।

সে যুগের এক দুর্ধর্ষ খুনির মনোজগতের অনুসন্ধান করতে যেয়ে কালজয়ী উপন্যাসের পটভূমিতে রচিত হলো ‘দ্য সিনার অ্যান্ড দ্য সেইন্ট’, অ্যালেন লেইন প্রকাশিত এ বইয়ের লেখক কেভিন বার্মিংহাম। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও সাহিত্যের প্রভাষক বার্মিংহামের জ্ঞানের ঝুলিকে সমৃদ্ধ করেছে ইংরেজিতে পিএইচডি। নিউ ইয়র্ক টাইমসের সর্বাধিক বিক্রির তালিকাভুক্ত তার বই ‘মোস্ট ডেন্জারাস বুক ২০১৪’তে জিতে নেয় ‘পেন নিউ ইংল্যান্ড এওয়ার্ড’ এবং ‘ট্রুম্যান ক্যাপোট এওয়ার্ড ফর ক্রিটিসিজম।’ বার্মিংহাম হালের সাড়া জাগানো এই পুস্তক ‘দ্য সিনার অ্যান্ড দ্য সেইন্ট’ নিয়ে এবারে পর্যালোচনা করেন ড্যানিয়েল রে।

১৫৬ বছর আগে, ১৮৬৫’এর এক গরমের দিন। সে সময়কার খ্যাতিমান সাহিত্য প্রতিভা, সাবেক রাজবন্দি, হীনবল, মৃগীরোগে আক্রান্ত ভগ্ন স্বাস্থ্য, জুয়ায় প্রবল আসক্ত ফিওদর দস্তয়ভস্কি ধার-কর্জের পাহাড় প্রমাণ বোঝা হালকা করতে চাইছিলেন। চাইছিলেন পাওনাদারদের তাগাদার হাত থেকে খানিক স্বস্তি। দেনার এই বড় অংকের টাকা ফেরত দেওয়ার তাগিদ থেকে তিনি মগ্ন হলেন ৯০ পাতার এক গল্প লেখায়। একে তিনি ‘অপরাধের মনোজগতের কাহিনি’ বলে অভিহিত করেন। দস্তয়ভস্কি’র ইচ্ছা ছিলো, তার পাঠকদের দিকনির্দেশনা দিয়ে পরিচালিত করবেন এক খুনি ব্যক্তির মনোজগতের গহীনতম প্রকোষ্ঠে।

পরবর্তী ১৮ মাসে কী করে দস্তয়ভস্কি’র সেই সাহিত্য তৎপরতা, ঘাম এবং মেধার অভূতপূর্ব রসায়নে রূপ নেয় ১৯ শতকের মহা উপন্যাসে, প্রকাশ পায় ‘অপরাধ ও শাস্তি’(ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট)’, ‘দ্য সিনার অ্যান্ড দ্য সেইন্ট’ বইতে তাই সুখপাঠ্য করে পরিবেশন করেছেন কেভিন বার্মিংহাম।

একই সমান্তরালে বার্মিংহাম তুলে আনেন দস্তয়ভস্কি রচনার অনুপ্রেরণার উৎসমূলের অন্ধকার ব্যক্তিত্ব, মনোবৈকল্যে আক্রান্ত প্যারিসবাসী পিয়েরে ফ্রাঁসোয়া লেসেনায়ার। চোর, এবং খুনি লেসেনায়ার (১৮০৩-৩৬)’এর প্রতারণার কাজে আত্মবিশ্বাসে খামতি ছিল না। কবি যশোলাভ প্রত্যাশী লেসেনায়ার কারাকক্ষ থেকেও সপ্তাহে এক হাজার পঙক্তির কবিতা রচনা অব্যাহত রেখেছিল।

দস্তয়ভস্কি’র ওপর লেসেনায়ারের প্রভাব-বিশ্লেষণের কাহিনি বার্মিংহামই প্রথম প্রকাশ করেননি। বরং তিনি দস্তয়ভস্কি’র ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’এর নায়ক রাসকোলনিকভ চরিত্র সৃষ্টিতে ফরাসি কারারুদ্ধ নাগরিকটির চরিত্রগুণাবলী মিশেল দেওয়ার বিশদ বিবরণ তুলে ধরেন। সেন্ট পিটার্সবার্গের গরিব সাবেক ছাত্র রাসকোলনিকভ। প্রথাগত নৈতিকতা হতে পৃথকীকরণের অনুভূতি থেকে খুনের রক্তাক্ত প্রান্তসীমায় উপনীত হয় সে।

অপরাধী সংক্রান্ত উপাদান তালাশ করতে যেয়ে দস্তয়ভস্কির নজর আসে লেসেনায়ার। ১৮৬১’তে লেসেনায়ারের ৫০ পাতার জীবনবৃত্তান্ত অনুবাদে সহায়তা করেন তিনি। নিজের সাময়িকীতে ছাপা হয় সে বৃত্তান্ত, আর নিবন্ধটির মুখবন্ধ লিখেছিলেন তিনিই। ১৮৬৪’তে লেসেনায়ারকে নিয়ে আরেকটি নিবন্ধ প্রকাশের ভাবনা করেছিলেন। তবে সেটি ভাবনার চৌহদ্দি ছেড়ে কখনোই প্রকাশের বাস্তবরূপ ধরতে পারেনি। পরের বছরটিতেই দস্তয়ভস্কি নিজেকে নিয়োজিত করেন ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’ রচনায়। এ সময় তার কলমে লেসেনায়ারের রূপবদল ঘটে। পাঠকদের সামনে ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্টের’ নায়ক রাসকোলনিকভের অবয়বেই হাজিরা দিল লেসেনায়ার।

লেসেনায়ারের আদলেই রাসকোলনিকভও আইনের ছাত্র থেকে অপরাধীতে পরিণত হয়। লেসেনায়ারের অনুকরণে রাসকোলনিকভও আইনশাস্ত্রকে উপজীব্য করে প্রবন্ধ প্রকাশ করে। উপযোগবাদী কল্পরাজ্য বা ইউটোপিয়া তৈরিতে বাহ্য-বিশ্বাসী ছিল সেও। ফরাসি ব্যক্তিটির পেশাজীবনের অভিষেকও স্মরণীয়। (জুয়াখানার টেবিলে তার মধ্যে দস্তয়ভস্কির বেপরোয়া স্বভাব ফুটে ওঠে এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামে)। কিন্তু বার্মিংহাম ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’ এ চরিত্রের কেন্দ্রিকতা বর্ণনা করেননি। লেসেনায়ারের বিপথমুখো প্রলোভনসঙ্কুল কাহিনির বর্ণনায় বিস্তর জায়গা বরাদ্দ করেন।

সূচনাতেই বার্মিংহাম শনাক্ত করতে পারেন যে, রাসকোলনিকভ নিছক রুশ পোশাকে সজ্জিত লেসেনায়ারের প্রতিরূপ নয়। রাসকোলনিকভ চরিত্রের ছায়ামূর্তিতে আরো নানা উৎস থেকে এসে জড়ো করা চরিত্রের প্রতিরূপ এঁকেছেন দস্তয়ভস্কি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, রাশিয়ার জারকে হত্যার প্রচেষ্টায় জড়িত আদর্শবাদী তরুণ দিমিত্রি কারাকোজোভ (১৮৪০-৬৬)। কিংবা খবরের কাগজে প্রকাশিত এক উগ্র-রক্ষণশীল ধর্মীয় বিদ্রোহী (বা তথাকথিত রাসকোলনিক)। এই ব্যক্তি এক পাচক এবং ধোপানীকে কুঠার দিয়ে খুন করেছে। তাছাড়া, দস্তয়ভস্কির কারাবাসের সময় টুকে আনা সহবন্দিদের গাল-গল্প এবং তদুপরি নিজ কল্পজগতের বাসিন্দারাও এসেছে এখানে। বরং রাসকোলনিকভ তৈরির অন্যতম উপাদান হিসেবে ব্যবহার হয়েছে লেসেনায়ার। আর এ অবস্থায় বার্মিংহাম বইয়ের মূল কাহিনি-চিত্রের অদ্ভুত অংশ হয়ে এসেছে লেসেনায়ার। 

উপন্যাসটির প্রধান ঘটনাবলী, রাসকোলনিকভের দুই খুনকে খতিয়ে দেখার সময় বার্মিংহামের প্রকাশের সেরা ভঙ্গিমার দেখা পাই আমরা। তিনি মনকাড়াভাবেই (এবং অনেক বিশ্লেষকের উল্টোমুখে দাঁড়িয়ে) যুক্তির পসরা নিয়ে হাজির হন যে ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’ মুক্তি লাভের কোনো কাহিনি নয়। বার্মিংহাম পাঠকদের স্মরণ করিয়ে দেন যে, রাসকোলনিকভের অনুশোচনা হয়েছে কেবল তার হাতে অভিপ্রেত ব্যক্তি, একজন কুসীদজীবী, নিহত হওয়ায় জন্য। অকুস্থলে উপস্থিত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে নিজ সৎ-বোনকে খুনের জন্য তার মধ্যে বিন্দুমাত্র অনুশোচনার লক্ষণ দেখা যায়নি। ঈশ্বরকে খুঁজে পাওয়ার বদলে উপন্যাসটির পরিসমাপ্তিতে  রাসকোলনিকভকে নৈতিক বোধশোধ লুপ্ত অপরাধী হিসেবে দেখতে পাওয়া যায়। বার্মিংহামের বর্ণনা থেকে আমরা জানতে পারি, “তার(রাসকোলননিকভ) স্বীকারোক্তি পুরোই অনুভূতিশূন্য...নিহত অন্য নারী – লিজাভেতা-‘র নাম উচ্চারণের কোনো দরকার নেই।”

লেসেনায়ারের পদাঙ্ক অনুসরণ করে রাসকোলনিকোভ নিজেকে শ্রেণিযোদ্ধার পঙক্তিভুক্ত করতে চেয়েছেন। নিজ অন্তঃসারহীন অপরাধ তৎপরতার বুদ্ধিবৃত্তিক এবং নৈতিক ব্যাখ্যা দেওয়ার কোশেশ করেছে রাসকোলনিকোভ। নিজেকে সমাজের আইন-নীতির ঊর্ধ্বে একজন ‘অতিমানব’ সত্তার অধিকারী হিসেবে তুলে ধরার বা কুসীদজীবীর অর্থ হাতিয়ে নিয়ে কল্যাণ-কাজে ব্যয়ের পরিকল্পনার বুলি বিলানোর প্রয়াস ছিল তার। বার্মিংহামের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, উপন্যাসের নায়িকা সোনিয়ার কাছে যখন স্বীকারোক্তি করে কেবল তখনই রাসকোলনিকোভ পুরোপুরি সৎ থেকেছে। রাসকোলনিকোভ সে সময় সহজভাবেই বলে, “আমি শুধু সাহস দেখাতে চেয়েছি, সোনিয়া, এই হলো পুরো কারণ।” বার্মিংহাম মনে করেন, “রাসকোলনিকোভ কোনো আদর্শের তাড়নায় খুন করে না। রাসকোলনিকোভ হত্যা করে বিনা কারণে।”

‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’কে নিবিড়ভাবে পাঠ করেছেন এবং দস্তয়ভস্কির জীবনীকে উপন্যাসের নজরে দেখেছেন বার্মিংহাম। তাতেই সেরা জিনিস প্রকাশ পেয়েছে। ১৮৪৯’এর ডিসেম্বরের শেষের দিকের এক অতি ভোরে যখন লেখককে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন আমরা দেখতে পাই “রাস্তাগুলো...খালি, পিটার্সবার্গের ঘরবাড়িগুলো ছুটি উপলক্ষে আলোক উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল” এবং কীভাবে "নির্বাসনে পাঠানোর বাস্তবতা (তাকে)আঘাত করেছিল যখন তাকে বহনকারী স্লেজগাড়ি আলোকশোভিত বাড়ি অতিক্রম করেছিল যেখানে (তার ভাই) মিখাইলের স্ত্রী এবং সন্তানেরা তাদের বড়দিনের আনন্দোৎসব মেতে উঠেছিল।”

দুঃখ এখানেই যে লেসেনায়ারের কাহিনি বার্মিংহামকে দস্তয়ভস্কির নিকট থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যায়, যা তিনি খুব নিপুণ দক্ষতায় তুলে ধরেছিলেন। পাঠকরা যদি এই অধ্যায়গুলোকে বিনোদন-পথচলার বাহন মনে করেন, তাহলে ‘দ্য সিনার অ্যান্ড দ্য সেইন্ট’ হয়ে উঠবে দস্তয়ভস্কির সৃষ্টিশীলতায় পূর্ণ, সৃজনশীলতায় ভরপুর পথ পরিক্রমার সুলিখিত আলেখ্য।

[ফাইনান্সিয়াল টাইমস অবলম্বনে]

syed.musareza@gmail.com

Share if you like

Filter By Topic