‘কিছু একটা ঘটেছে ক্রেমলিনে!’


এফই অনলাইন ডেস্ক | Published: September 08, 2021 20:31:52 | Updated: September 09, 2021 12:21:48


ক্রেমলিন,মস্কো

রাশিয়ার সার খাতে পুঁজি বিনিয়োগ করেছেন জিম রজার্স। তিনিই জর্জ সোরোসকে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন কোয়ান্টাম ফান্ড নামের ব্যতিক্রমী প্রতিষ্ঠান। বিনিয়োগকারীদের নজর এড়ায় না যে দীর্ঘমেয়াদী সম্ভাবনাই জিম রজার্সকে এদিকে টেনে এনেছে। রাশিয়া এবং চীনের শেয়ার বাজারে বিনিয়োগকারী হিসেবে খ্যাতিলাভ করেছেন রজার্স। রাশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম সার উৎপাদনকারী ফোসাগ্রোর মাধ্যমে দেশটির সার এবং কৃষি খাতে বিনিয়োগ করেন তিনি। তিনি মনে করেন, এ খাতের সাফল্য মাত্র শুরু হয়েছে।

রজার্স বলেন, এখানে যা বিনিয়োগ করেছি তাতে মুনাফা হচ্ছে তবে ভবিষ্যতে যে লাভের মুখ দেখতে পাবো, এখনো সে পর্যায়ে যায়নি মুনাফা। তিনি আরো বলেন, মানচিত্রের দিকে তাকালে বোঝা যাবে, রাশিয়ার কৃষি গোটা দুনিয়ায় আধিপত্য বিস্তার করতে পারবে। বিশাল কৃষিভিত্তিক দেশ হতে হলে যা যা দরকার তার সবই আছে রাশিয়ায়। কিংবা রাশিয়া নিশ্চিত ভাবেই একটি বিশাল কৃষিভিত্তিক দেশ।

রজার্স এও বলেন যে রাশিয়ার নেতৃত্বের মনোভাবে পরিবর্তন ঘটেছে তাই তিনি বিনিয়োগ করতে এগিয়ে এসেছেন। শুধু একবারই এমন পরিবর্তন ঘটেছে তা নয়। গত এক দশকে ত্রেুমলিনে কিছু একটা ঘটেছে। এ ঘটনার সঙ্গে কেবল এক ব্যক্তিই জড়িত নন। এটি অনেক বড়সড় পরিবর্তন।

অর্থনৈতিক এবং জলবায়ু পরিবর্তনের চোট সামলাতে ধকল পোহাতে হয়েছে রাশিয়ার প্রধান প্রধান প্রতিপক্ষ কয়েকটি দেশের। কিন্তু এ দুই মুসিবত রাশিয়ার কাছে বর হয়ে দেখা দিয়েছে। ২০১৯ সালে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধ এবং কম মুনাফার যোগফল মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। আর এতে আমেরিকার শস্য উৎপাদনকারীদের প্রায় নাভিঃশ্বাস উঠেছে। শস্য বাণিজ্যে জড়িত মার্কিন অনেক কোম্পানির কাছেই অন্ধের ষষ্টির ভূমিকা পালন করেছে মার্কিন সরকারি সহায়তা। এই সহায়তা বন্ধ হওয়ার পর তারা লাটে উঠেছে। মার্কিন কৃষি দফতর বা ইউএসডিএর হিসাবে দেশটির গম উৎপাদন কমেছে। অস্ট্রেলিয়ায় দাবানলে পুড়েছে শস্য। ইউএসডিএর হিসাব বলছে, ২০২১-২০২২ মওসুমে দেশটির গম রপ্তানি কমবে ১৭ শতাংশ।

রাশিয়ার জন্য এই জলবায়ু পরিবর্তন সৃষ্টি করছে নতুন নতুন সুযোগ। দেশটির উত্তরের এতোকালের স্থায়ী বরফভূমি বা পার্মাফ্রস্ট গলে কৃষিতে ব্যবহারের উপযোগী জমি বের হয়ে আসছে। দেশটির দক্ষিণে খরায় যে ক্ষতি হয়েছে, এ ভাবে সে ক্ষতির পূরণ হচ্ছে।

রাসাগ্রোট্রান্সের রোগাচেভ বলেন, রাশিয়ায় অনেকগুলো সময়-মান মণ্ডল বা টাইম জোন আছে। ভোলগা অঞ্চল খরায় যখন পুড়ছে তখন সাইবেরিয়ার ঘটবে প্রবৃদ্ধি। দক্ষিণ অঞ্চলে ক্ষতিকর কিছু হলে ভোলগা এবং কেন্দ্রীয় অঞ্চল সে ক্ষতি পুষিয়ে দেবে। রাশিয়ার সব অঞ্চলে একযোগে বন্যা বা খরা হওয়া অসম্ভব।

এদিকে রাশিয়াও বিশুদ্ধ খাদ্য উৎপাদনের ওপর গুরুত্বারোপ করছে। রাসায়নিক সার মুক্ত এবং ভারি ধাতু পরিমাণে কম রয়েছে এমন খাদ্য উৎপাদনের দিকে নজর দিচ্ছে রাশিয়া। ক্রেতারাও খাদ্যের বিশুদ্ধতা নিয়ে আগের থেকে বেশি মাথা ঘামায়। সার উৎপাদনে জড়িত এবং বিশ্লেষকরা বলেন, অত্যন্ত পরিষ্কার শিলা থেকে সার উৎপাদন করে রাশিয়া। এতে ক্যাডিয়ামের মতো ভারি ধাতুর উপস্থিতি নেই। ফলে প্রতিযোগিতার বাজারে বাড়তি সুযোগ পাচ্ছে রাশিয়া।

কৃষিখাতে রাশিয়ার ব্যাপক সুযোগ এবং সম্ভাবনাই রজার্সের মতো বিনিয়োগকারী এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীগোষ্ঠীকে এ দিকে টেনে এনেছে। রাশিয়ার বিশাল আকার, নানা সময়-মান মণ্ডল, বিরাজমান অবকাঠামো এবং প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটিয়ে এবং সার ব্যবহার বাড়িয়ে দেশটিতে কৃষিপণ্য উৎপাদনের অভূতপূর্ব সুযোগ এবং সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

রজার্সের ভাষায়, রাশিয়ার সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা রয়েছে। রাশিয়ার রয়েছে ব্যাপক সুযোগ। তিনি বলেন, আমেরিকার পক্ষে জমি আবিষ্কার করা আর সম্ভব নয়। মার্কিন কৃষক এরই মধ্যে মাত্রার চেয়েও অনেক বেশি সার ব্যবহার করছে। আর দেশটির কৃষিকে এতোটাই যান্ত্রিকীকরণ করেছে যে নতুন করে যান্ত্রিকীকরণে আর কোনো অবকাশই নেই। কানাডা কৃষি নিয়ে নতুন করে কিছু হয়ত জানতে চায় না। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা দেশ হিসেবে তেমন বড় নয়। কিন্তু রাশিয়ার কৃষিখাতে উন্নতির এখনো বিস্তর সুযোগ রয়েছে।

কৃষিখাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা দিকে নজর দিয়েছেন রাশিয়ার ধনকুবেররা। রুশ ধনকুবেরদের অনেকেই এখন জমির মালিক এবং তারা কৃষিপণ্য রপ্তানি করছেন। রাশিয়ার অন্যতম বড় শস্য রপ্তানিকারক সংস্থা স্তেপ এগ্রোহোল্ডিং। দেশটির শস্য রফতানির বাজারের তিন শতাংশই এ সংস্থার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এতে প্রধান বিনিয়োগকারী হলো সিস্তেমার। (এএফকে সিস্তেমা পিএও রুশ একটি বিশাল কোম্পানি। ২০১৯ সালে এ কোম্পানির মোট সম্পদের পরিমাণ ছিলো সাড়ে ১৯ বিলিয়ন বা এক হাজার ৯০০ কোটি ডলার এবং নিট আয়ের পরিমাণ ছিল ৪৪ কোটি ২০ লাখ ডলার। এই কোম্পানির ৫৯.২ শতাংশ শেয়ারের মালিক ইভেনতুশেনকভ) এর মূল শেয়ারের মালিক হলেন ভ্লাদিমির ইভেনতুশেনকভ।

ওলেগ দেরিপাস্কা এককালে রাশিয়ার সবচেয়ে ধনবান ব্যক্তি ছিলেন। রাশিয়ার অন্যতম বৃহৎ কৃষি ক্ষেত্র কুবানের মালিক তিনি। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে দেরিপাস্কাকে তার প্রধান ব্যবসা অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদন থেকে সরে দাঁড়তে বাধ্য হন। তিনি দেশটির শীর্ষ অ্যালুমনিয়াম উৎপাদনকারী সংস্থা রুসালের নিয়ন্ত্রণ থেকেও সরে দাঁড়ান। মার্কিন নজরদারিতেও রয়েছেন প্রেসিডেন্ট পুতিনের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী ভ্লাদিমির ইভেনতুশেনকভ এবং তাঁর ওপরে চাপানো হতে পারে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা।

পুতিনের মিত্র হিসেবে বিবেচিত দেরিপাস্কাও রাশিয়ার কৃষিখাত নিয়ে সম্প্রতি সমালোচনা করেন। রুশ চাষীদের চড়া সুদের বিষয়ে বিশেষ করে সমালোচনার খই ফোটান তিনি। রাশিয়ার উৎপাদন দক্ষতা, অবকাঠামো এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মান উন্নত করতে হবে। কৃষিখাতের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বড়সড় বিনিয়োগের জন্য এই মান উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন বিশেষজ্ঞরা।

রাশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থ ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠান ভিটিবি দেশটির কৃষি শিল্পকে সংস্কারের তৎপরতায় নেমেছে। শস্য বাজারে বড় ধরণের ভূমিকা রাখতে চাইছে ভিটিবি। নিকট অতীতে ধারাবাহিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু অধিগ্রহণ করে ভিটিবি। তারপর শস্য ব্যবসায় লগ্নি করে ২০০ কোটি ডলার সমপরিমাণ অর্থ। অবশ্য অধিগ্রহণকরা সম্পদের অর্ধেক পরে রুশ বিনিয়োগকারীদের কাছে বেচে দেয়।

রাশিয়া দক্ষতার একেবারে তলায় অবস্থান করছে, জানান ভিটিবি ক্যাপিটলের গ্লোবাল কমোডিটিসি বিভাগের প্রধান আতানাস জুমালিয়েভ। আমেরিকার কৃষিজাত পণ্যের প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজার রয়েছে। আর্থিক বিনিয়োগকারীরাসহ আরো অনেকেই এ বাজারে জড়িত আছেন। এতে শিল্প ও প্রযুক্তি উভয়ই বিকাশলাভ করতে পারছে। কিন্তু রাশিয়াতে অমন বাজার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বছরের পর বছর কেটে যাবে।

[ফাইনান্সিয়াল টাইমস থেকে বাংলায় রূপান্তর করেছেন সৈয়দ মূসা রেজা]

আরো পড়ুন:

গম কূটনীতির বীজ বুনছে রাশিয়া

তেল এবং কালাশনিকভ নয়, খাদ্যই রুশ কূটনীতির নতুন অস্ত্র

Share if you like