Loading...

‘কাজ শেষ’, তবু অপেক্ষা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের চূড়ান্ত তালিকার

| Updated: March 27, 2022 09:02:00


ফাইল ছবি ফাইল ছবি

যাচাই বাছাইয়ে কেটে গেল পাঁচ বছর, এবারের স্বাধীনতা দিবসেও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ হচ্ছে না।

তবে আশার কথা শুনিয়েছেন মন্ত্রী মোজাম্মেল হক; বলছেন, কাজ শেষ হয়েছে, প্রকাশ হবে এপ্রিলে।

তালিকা চূড়ান্ত হলে এবার বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক ভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধার জন্য স্মার্ট কার্ডও দেবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। তালিকার পাশাপাশি প্রত্যেক মুক্তিযোদ্ধার প্রোফাইল একটি সফটওয়্যারে সংরক্ষণ করা থাকবে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী।

তিনি বলেছেন, সব মিলিয়ে এক লাখ ৭৭ হাজার ২০০ জনের নাম চূড়ান্ত তালিকায় প্রকাশ করা হবে। একে মন্ত্রণালয় বলছে, ‘সমন্বিত তালিকা’।

২০১৭ সালের ২২ জানুয়ারি সপ্তমবারের মত সারাদেশে মুক্তিযোদ্ধাদের চূড়ান্ত তালিকা প্রণয়নের জন্য যাচাই বাছাই শুরু হয়। এরপর পাঁচ বছর কেটে গেলেও চূড়ান্ত তালিকা হয়নি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর সেনানীদের।

প্রতিবছরই মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী মোজাম্মেল হক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বলে আসছেন, ২৬ মার্চের মধ্যেই তালিকা প্রণয়নের কাজ শেষ হবে।

কিন্তু পুরো প্রক্রিয়া শেষ না হওয়ায় শনিবার দেশের ৫১তম স্বাধীনতা দিবসেও চূড়ান্ত তালিকা পাওয়া যাচ্ছে না।

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “নির্ভুল তালিকা প্রণয়নের দাবি দীর্ঘদিন ধরেই আমরা করে আসছি, কিন্তু আজও হয়নি।

“আসলে সরকারি আমলাদের দায়িত্ব দেওয়ার কারণেই এটা বিলম্ব হচ্ছে। তাদের তো এর বাইরেও অনেক কাজ থাকে। আমলানির্ভর হওয়ার কারণে অতীতেও নানা বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আমরা চাই, আর বিলম্ব না করে প্রকৃত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের চূড়ান্ত তালিকা অতি দ্রুত প্রকাশ হোক।“

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, শুধু তালিকায় নাম না থাকায় অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ছাড়াই দাফন করা হচ্ছে, যা মেনে নেওয়া কঠিন।

এর আগে ২০২১ সালে পাঁচ দফায় বীর মুক্তিযোদ্ধার চূড়ান্ত তালিকার খসড়া প্রকাশ করা হয়েছিল।

সরকার দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেওয়া দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের তালিকা করার পাশাপাশি রাজাকার, আল বদর, আল শামস বাহিনীসহ স্বাধীনতাবিরোধীদের তালিকা তৈরির পদক্ষেপও নিয়েছে।

এ জন্য চলতি বছর ১৭ জানুয়ারি মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইনের সংশোধিত খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

এপ্রিলে হবে?

বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রণয়নের কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে জানিয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী মোজাম্মেল হক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা চেষ্টা করেছি ২৬ মার্চের মধ্যে তালিকা প্রকাশ করতে, কিন্তু সম্ভব হচ্ছে না।”

এবারও কেন সম্ভব হল না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “তালিকা তৈরির সব কাজ শেষ হয়েছে, কাগজপত্র সব ঠিক হয়ে আছে। যে কোনো সময় আমরা তালিকা প্রকাশ করব। প্রোফাইল তৈরির কাজ আমাদের শেষ, এমআইএস সিস্টেমে আপ করা হচ্ছে। আশা করি আগামী মাসে আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে সমন্বিত তালিকা প্রকাশ করতে পারব।

“যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, মুক্তিযোদ্ধার আবেদন যাদের যাচাই বাছাই প্রক্রিয়াধীন, তাদের মধ্যে যারা স্বীকৃতি পাবেন, তাদের নাম বীর মুক্তিযোদ্ধার চূড়ান্ত তালিকায় আসবে। এ তালিকায় থাকা প্রত্যেক মুক্তিযোদ্ধার জন্য পৃথক প্রোফাইল মন্ত্রণালয়ের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এমআইএস) নামে একটি সফটওয়্যারে যুক্ত করা হয়েছে।”

তিনি বলেন, “আমরা তালিকা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বীর মুক্তিযোদ্ধার মাসিক ভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধার জন্য স্মার্ট কার্ডও দিয়ে দেব।”

মুক্তিযোদ্ধাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ও রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের স্বীকৃতি দিতে ২০০২ সালে গঠিত হয় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের চূড়ান্ত তালিকা প্রণয়ন করতে না পারায় এখন মন্ত্রণালয়ের প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে, গেজেটপ্রাপ্ত অ-মুক্তিযোদ্ধাদের বাদ দিয়ে তালিকা চূড়ান্ত করা।

এ জন্য সরকারিভাবে গঠন করা হয়েছে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা)। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর প্রধান উপদেষ্টা। আর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী পদাধিকার বলে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন।

সময়ে সময়ে তালিকা প্রকাশ

মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সরকারের আমলে এ পর্যন্ত ছয়বার তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রথম তালিকা করা হয় ১৯৮৬ সালে। তখন জাতীয় কমিটির তৈরি এক লাখ দুই হাজার ৪৫৮ জন বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম পাঁচটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশ করা হয়। তবে ওই তালিকা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়নি।

১৯৮৮ সালে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট্রের করা তালিকায় এ সংখ্যা ছিল ৭০ হাজার ৮৯২। এর মধ্যে বেসামরিক বীর মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ৫১ হাজার ৫২৬ এবং বিশেষ তালিকায় ছিলেন ১৯ হাজার ৩৬৬ জন। পরে ১৯৯৪ সালে বিএনপি সরকারের সময় ৮৬ হাজার বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত হন।

এরপর ১৯৯৮ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ এক লাখ ৮৬ হাজার ৭৯০ জনের নামের তালিকা প্রকাশ করে; যা মুক্তিবার্তা (সবুজ) নামে পরিচিত।

তালিকা প্রকাশের ধারাবাহিকতায় ওই তালিকা যাচাই-বাছাই করে মুক্তিযোদ্ধা কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল থেকে প্রকাশিত মুক্তিবার্তায় এক লাখ ৫৮ হাজার ৪৫২ জনের আরেকটি তালিকা (লাল মুক্তি বার্তা নামে পরিচিত) প্রকাশ করা হয়। এরমধ্যে তৎকালীণ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৪৭ হাজার সনদে সই করেন।

২০০১ থেকে ২০০৬ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার দুই লাখ ১০ হাজার ৫৮১ জনকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে এবং পরে এক লাখ ৯৮ হাজার ৮৮৯ জনের নাম গেজেট আকারে প্রকাশ করে।

২০১১ সালে ওই তালিকা সংশোধনসহ নতুন করে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্বীকৃতি দিতে আবেদন গ্রহণ করে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার। এর আলোকে ২০১৪ সালের ৩১ অক্টোবরের মধ্যে অনলাইন ও সরাসরি প্রায় এক লাখ ৩৯ হাজার আবেদন জমা নেওয়া হয়।

নতুন স্বীকৃতি, সনদ বাতিল

পাঁচ বছর ধরে এসব আবেদন যাচাই বাছাই চলছে। অনেক উপজেলায় যাচাই বাছাই প্রক্রিয়া নিয়ে আইনি জটিলতা থাকায় উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ রয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় প্রায় ৯ হাজার বীর মুক্তিযোদ্ধা এখন পর্যন্ত স্বীকৃতি পেয়েছেন। বাদ পড়াদের মধ্যে প্রায় ৪০ হাজার ব্যক্তির আপিল বর্তমানে জামুকায় শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।

এ বিষয়ে মন্ত্রী মোজাম্মেল জানান, গেজেটভুক্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা যাচাই বাছাইয়ের কার্যক্রমের মধ্যে পাঁচটি ক্যাটাগরিতে শহীদ, যুদ্ধাহত, সামরিক ও বেসামরিক, বীরঙ্গানা, শব্দসৈনিক, মুজিবনগর কর্মচারীসহ ৩২ শ্রেণির স্বীকৃতিপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধার তথ্যাদি যাচাই বাছাই করার কাজ চলছে। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের। 

 “অ-মুক্তিযোদ্ধা চিহ্নিত করার কার্যক্রম চলছে। বিএনপির আমল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত গেজেটভুক্ত ১০ হাজার অ-মুক্তিযোদ্ধার সনদ বাতিল হয়েছে।”

মিথ্যা তথ্য দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা সনদ নেওয়ায় ২০১৪ সালের জুন ও জুলাইয়ের বিভিন্ন সময়ে সাবেক স্বাস্থ্য সচিব নিয়াজ উদ্দিন মিয়া, সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) সাবেক সচিব এ কে এম আমির হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব মোল্লা ওয়াহিদুজ্জামানসহ ৪০ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং প্রায় দেড়শ অ-মুক্তিযোদ্ধার সনদ বাতিল করে মন্ত্রণালয়।

আলোচিত এ ঘটনা প্রকাশ্যে এলে স্বাস্থ্য সচিব নিয়াজ উদ্দিন মিয়া, সাবেক সচিব এ কে এম আমির হোসেন ও মোল্লা ওয়াহিদুজ্জামানকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায় সরকার।

বীর মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা বাড়ার বিষয়ে মোজাম্মেলন হক এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে বীর মুক্তিযোদ্ধার তালিকা হলেও গেজেটভুক্তদের জন্য ভাতা চালু করা হয়নি। ১৯৯৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর মাসিক ৩০০ টাকা ভাতা চালু করা হয়। পরে ভাতার সঙ্গে সরকারি চাকরিতে নিয়োগসহ নানা সুযোগ সুবিধা যুক্ত করে সরকার। এরপর থেকেই মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা বাড়তে শুরু করে।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সুযোগ সুবিধা কয়েকগুণ বাড়ানো হয়। তখন থেকে নানা উপায়ে গেজেটভুক্ত হওয়ার তৎপরতা চলতে থাকে। ভাতা ছাড়াও রাজনৈতিক ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে এ স্বীকৃতি পেতে আগ্রহী হয়েছেন অনেকে।

বর্তমানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবসরের বয়স ৫৯ বছর। তবে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষেত্রে তা ৬০ বছর।

মুক্তিযোদ্ধারা ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত মাসিক সম্মানী ভাতা, দুই ঈদে ১০ হাজার টাকা করে ২০ হাজার টাকা উৎসব ভাতা, পাঁচ হাজার টাকা বিজয় দিবসের ভাতা এবং দুই হাজার টাকা বাংলা নববর্ষ ভাতা এবং চিকিৎসাসহ সন্তানদের জন্য নির্ধারিত অন্যান্য আর্থিক সুবিধা পেয়ে থাকেন।

অন্যদিকে শহীদ, যুদ্ধাহত ও খেতাবপ্রাপ্ত ১২ হাজার ৬৭৪ বীর মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণিভেদে ২০ হাজার থেকে ৪৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাতা পাচ্ছেন। ভাতার পাশাপাশি তারাও নির্ধারিত অন্যান্য আর্থিক সুবিধা পেয়ে থাকেন।

 

Share if you like

Filter By Topic