সাত দশক আগে রাষ্ট্রভাষার আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশের অর্ধশতকে বাংলার জন্য, বাংলাভাষার জন্য অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম কতটা নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন, সেই স্মৃতি উঠে এল এক স্মরণসভায়। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।
প্রয়াত এই জাতীয় অধ্যাপকের স্মরণে শনিবার এক ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব)।
সেই আলোচনায় অংশ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের জাগরণ ও রফিকুল ইসলাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জাগরণ, শিক্ষার বিকাশের সঙ্গে তিনি এমনভাবে সম্পৃক্ত এবং এত দীর্ঘকাল ধরে যুক্ত যে, এটা অল্পে প্রকাশ করা মুশকিল। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মূল্যবান চিত্র তিনি ধারণ করেছেন এবং সেটি সংরক্ষণ করেছেন, আমাদের সামনে মেলে ধরেছেন। সেটা ইতিহাসের বিশাল অধ্যায়কে ব্যাপক মানুষের কাছে পরিচিত করে তুলেছে।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতবছর ৩০ নভেম্বর চিরবিদায় নেন ভাষাবিজ্ঞানী, লেখক, নজরুল গবেষক রফিকুল ইসলাম। স্বাধীনতা ও একুশে পদকপ্রাপ্ত এই শিক্ষকের বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর।
ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশ নেওয়া রফিকুল ইসলাম সেই সময়ের দুর্লভ আলোকচিত্র ধারণ করেছেন নিজের ক্যামেরায়। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর হাতে হয়েছেন নির্যাতিত। বাঙালির মুক্তির সংগ্রামের এই প্রত্যক্ষ সাক্ষী সেইসব ইতিহাস গ্রন্থিত করে গেছেন তার লেখায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে লেখাপড়া শেষে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষাতত্ত্বে উচ্চশিক্ষা নেন। পরে ১৯৬৩ সালে শিক্ষকতা শুরুর পর বাংলা বিভাগে ভাষা ও সংস্কৃতি সপ্তাহের আয়োজন করেছিলেন।
সেই উদ্যোগের কথা স্মরণ করে মফিদুল হক বলেন, সেখানেই কিন্তু হাজার বছরের বাংলা ভাষা- কথাটি প্রথম এবং বড়ভাবে নিয়ে আসা হয় এবং চর্যাপদ থেকে পুরনো গানের উপস্থাপনা- এক অসাধারণ পরিকল্পনার সাথে যুক্ত ছিলেন তিনি।
পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে তিনি অগ্রগণ্য ছিলেন। তিনি সেখানে শিক্ষার্থীদের বিপুলভাবে সম্পৃক্ত করেছিলেন, যারা এই ধারবাহিকতা বহাল রাখল। ফলে বাংলাদেশের জাগরণ ও রফিকুল ইসলাম ওতপ্রোতভাবে যুক্ত।
অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বিদেশিদের বাংলাভাষা শিখিয়েছেন জানিয়ে মফিদুল হক বলেন, পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক আইন প্রশাসক লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাহেবজাদা ইয়াকুব খানকে তিনি বাংলা শেখাতেন।
সেই সূত্রে ইয়াকুব খানকে তিনি বাঙালি সংস্কৃতির সাথেও পরিচিত করেছিলেন। তার ফলেই আমরা দেখি, যখন ইয়াহিয়া খান ১৯৭১ সালে পার্লামেন্ট স্থগিত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন, তখন কিন্তু ইয়াকুব খান তার বিরোধিতা করেছিলেন এবং পদত্যাগ করেছিলেন। এই কাজটার পেছনে অধ্যাপক রফিকুল ইসলামকে খুঁজে পাই।
ভার্চুয়াল এই স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠানে অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে নিজের কাজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন এমিরেটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম। একই সময়ে তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন, পরে শিক্ষকতা করেছেন।
পাকিস্তান লেখক সংঘের পূর্বাঞ্চল শাখার দায়িত্বে আমরা ছিলাম। সেখানে পরিক্রম নামে একটি মাসিক পত্রিকা আমরা বের করতাম। এই পত্রিকাটি আমরা দুজন মিলে সম্পাদনা করতাম। সেটা আমাদের জন্য খুব আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা ছিল।
সাহিত্য-সংস্কৃতিতে অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের গভীর মনোযোগ ছিল। নজরুল ইসলাম সম্বন্ধে তিনি গবেষণা করেছেন। নজরুল ইনস্টিটিউটের সভাপতি ছিলেন অনেক বছর। সেই প্রতিষ্ঠানে তার চাইতে ভাল সভাপতি আমি ভাবতে পারি না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রথম নজরুল অধ্যাপক এবং নজরুল গবেষণা কেন্দ্রের প্রথম পরিচালকও ছিলেন অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম। বিদ্রোহী কবির প্রথম পূর্ণাঙ্গ জীবনীও লিখেছেন তিনি।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাংলা কীভাবে যুক্ত করা যায়, সে বিষয়টি নিয়ে অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বিশেষভাবে চিন্তা করেছেন বলে জানান সিরাজুল ইসলাম।
তিনি ইউল্যাবে একাধিকবার বইমেলা করেছেন। আমি একবার উদ্বোধনও করেছিলাম।
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য রফিকুল ইসলাম ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টসেরও উপাচার্য ছিলেন। ২০১৮ সালে সরকার তাকে জাতীয় অধ্যাপক করে নেয়।
ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের দীর্ঘ পথ পরিক্রমার সাক্ষী রফিকুল ইসলাম জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি ছিলেন।
এই কমিটির প্রধান সমন্বয়ক কামাল আব্দুল নাসের চৌধুরী অনুষ্ঠানে বলেন, আমরা রফিক স্যারের নেতৃত্বে কাজ করেছি। তার সৃজনশীলতা এবং মননশীলতা আমাদের কাজের ক্ষেত্রে সহায়তা করেছে।
আমাদের প্রতিটি সভায় তিনি উপস্থিত থাকতেন এবং তার যে সময়জ্ঞান- সেটি দেখে আমি মাঝে মাঝে অবাক হতাম যে, এই বয়সেও তিনি আমাদের এভাবে সময় দিতেন।
স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠানে সহধর্মিনী জাহানারা ইসলাম জানান, রফিকুল ইসলামের পরিমিতিবোধটাই ছিল তার বিচারে সবচাইতে আকর্ষণীয়।
নিভৃতচারী মানুষটি নিভৃতেই সাহিত্যকর্ম সম্পাদন করতেন। শিল্প-সংস্কৃতিতেও তার নির্দেশনা অসাধারণ। যে কোনো অনুষ্ঠান পরিচালনায় তিনি পারদর্শী ছিলেন।
সাংসারিক জীবনেও তার পরিচালনা ছিল বিস্ময়কর। কখন কোথায় কোন জিনিসটির প্রয়োজন, সে বিষয়টিও তিনি সমাধান করে দিতেন। কোনোদিন রাগারাগি ঝগড়াঝাটি করতেন না। আমার মতে, তিনি পরিমিত, পরিচ্ছন্ন ও পরিশীলিত ব্যক্তি।
তাদের সন্তান বর্ষণ ইসলামও অংশ নেন আলোচনায়। তার ভাষায়, বাবা ছিলেন তার বন্ধুর মত।
বর্তমানে দেশের পরিস্থিতি, রাজনৈতিক আলোচনা ও সমালোচনা সবকিছুই আব্বার সাথে আলোচনা করতাম। আব্বার মাথাটা ছিল এনসাইক্লোপিডিয়া। আব্বার ব্রেন অনেক শার্প ছিল। তিনি সবকিছু মনে রাখতে পারতেন। আমরা আমাদের মতোই বড় হয়েছি। কোনো কিছুতে কখনও চাপ দেননি আমাদের। তিনি চলে যাওয়ায় জাতির অনেক বড় ক্ষতি হয়ে গেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০০ বছর পূর্তি বইটির কাজ অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম শেষ করে গেছেন বলে জানান তার ছেলে।
সংগীতশিল্পী অধ্যাপক নাশিদ কামাল চৌধুরী বলেন, নজরুলের গানে আমাদের আকৃষ্ট করে একটা বন্ধনের মধ্যে গেঁথে রেখেছিলেন অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম। আমরা সবাই যদি তার কাজ কিছুটা করে করি, তাহলেই হয়ত উনি শান্তি পাবেন।
সংসদ সদস্য ও অভিনেতা আসাদুজ্জামান নূর বলেন, তিনি একজন গভীর জ্ঞানের অধিকারী মানুষ। অন্যদিকে অত্যন্ত সহজ-সরল, আন্তরিক একজন মানুষ। তাকে অনুসরণ-অনুকরণ করে আমরা সমৃদ্ধ হয়েছি।
তিনি চলে গেছেন, তার শূন্যতা কখনোই পূরণের নয়। কিন্তু তিনি যা রেখে গেলেন, তা নিয়ে আমরা বহুকাল পথ চলতে পারব বলে আমার বিশ্বাস।
অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম স্মরণে একটি কবিতা আবৃত্তি করেন আসাদুজ্জামান নূর। অনুষ্ঠানে নজরুল সংগীত পরিবেশন করেন ড. নাশিদ কামাল চৌধুরী ও খাইরুল আনাম শাকিল।
স্মরণে জাতীয় অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম- ও আলোর পথযাত্রী শীর্ষক এ অনুষ্ঠানে অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের জীবন ও কর্মের ওপর ভার্চুয়াল প্রদর্শনীর উদ্বোধন করা হয়।
অন্যদের মধ্যে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মো. নূরুল হুদা, লেখক মুনতাসির মামুন, অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনিসুর রহমান, সংবাদ উপস্থাপক ও কণ্ঠ অভিনেতা ইকবাল বাহার চৌধুরী, ইউল্যাবের উপাচার্য অধ্যাপক ইমরান রহমান, ইউল্যাবের বোর্ড অব ট্রাস্টির চেয়ারম্যান কাজী শাহেদ আহমেদ, ভাইস প্রেসিডেন্ট কাজী আনিস আহমেদ এবং অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের বোন মাসুমা খাতুন ও নাতনী সারা শবনম অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন।