১৯১৫ সাল। আইরিশ - ব্রিটিশ অভিযাত্রী স্যার আরনেস্ট শ্যাকলটন ২৮ জন ক্রু নিয়ে ৪৪ মিটার দীর্ঘ একটি কাঠের জাহাজ ভাসান বরফাচ্ছন্ন এন্টার্কটিকা মহাসাগরে। তার লক্ষ্য ওয়েডেল সাগর থেকে রওনা হয়ে ‘সাউথ পোল’ অর্থাৎ কুমেরু অতিক্রম করে রোশ সাগরে পৌঁছানো।
এনডিউরেন্স নামের ওই জাহাজে চেপে এন্টার্কটিকা পাড়ি দিয়ে ইতিহাস গড়তে চেয়েছিলেন শ্যাকলটন।
তবে লক্ষ্য পৌঁছানোর ১০০ মাইল আগেই ওয়েডেল সাগরের পুরু বরফের আস্তরণে জাহাজটি আটকে যায়। ১০ মাস ধরে এটি বরফের মাঝে ভাসতে থাকে। বসন্তের শুরুতে বরফ কিছুটা গলতে শুরু করলে ভাসমান বরফের বিশাল বিশাল চাঁইয়ের ধাক্কায় একপর্যায়ে ডুবে যায় এনডিউরেন্স।
জাহাজটি যখন অকেজো হয়ে যায় তখন শ্যাকলটন তার ক্রুদের নিয়ে বরফের ওপর ক্যাম্প করেন। জাহাজডুবির পাঁচ মাস পর্যন্ত তারা সেখানেই ছিলেন।
অবাক করার মতো হলেও সত্যি শ্যাকলটনসহ সব ক্রু জীবিত ফেরত এসেছিলেন। আরও বেশি অবাক করে এনডিউরেন্স উদ্ধারের কাহিনী। ১০৭ বছর পর প্রায় অক্ষত অবস্থায় একে সাগরের তল থেকে উদ্ধার করা আনা হয়েছে।
সম্প্রতি ওয়েডেল সাগরের প্রায় ৩,০০৮ মিটার গভীর থেকে এই জাহাজটি উদ্ধার করা হয়েছে। ১৯১৫ সালে যে জায়গায় জাহাজডুবি হয়েছিল সেখান থেকে প্রায় ৬ কিমি দূরে জাহাজটি খুঁজে পাওয়া যায়।
এনডিউরেন্স উদ্ধার অভিযান পরিচালনার দায়িত্বে ছিল ফকল্যান্ড মেরিটাইম হেরিটেজ ট্রাস্ট। অনুসন্ধান পরিচালকের ভূমিকায় ছিলেন মেনসুন বাউন্ড নামের একজন ব্রিটিশ সামুদ্রিক প্রত্নতত্ত্ববিদ এবং অভিযানের নেতৃত্বদানের ভূমিকায় ছিলেন একজন মেরু ভূগোলবিদ ও পরিবেশ বিজ্ঞানী, জন শেয়ারস।
চলতি বছরের ২ ফেব্রুয়ারি জাহাজটি খুঁজে বের করার অদম্য সাহস নিয়ে একটি সাউথ আফ্রিকান আইসব্রেকার এবং এক অদম্য উৎসাহী এবং অনুসন্ধিৎসু টিম নিয়ে কেপটাউন থেকে যাত্রা শুরু করেন।
ওয়েডেল সাগরের যে জায়গা থেকে জাহাজটি উদ্ধার করা হয়েছে বলা হয়ে থাকে, এটি বিশ্বের সবচেয়ে বরফে ঢাকা জায়গা। কোনো জাহাজ বা নৌকা চলাচলের জন্য এটি মোটেও উপযুক্ত নয়।
এনডিউরেন্স খুঁজে বের করার জন্য অনুসন্ধানকারীরা আন্ডারওয়াটার ড্রোন ব্যবহার করেছিলেন। ড্রোনের মাধমে পাওয়া যায় প্রায় ৪৪ মিটার দীর্ঘ জাহাজটির একদম পরিষ্কার ছবি। ক্যামেরার পর্দায় জাহাজের সামনের কাঠামোতে এনডিউরেন্স নামটা বেশ স্পষ্টভাবেই বোঝা যায়।
আল জাজিরায় প্রকাশিত বক্তব্য অনুযায়ী, অভিযানের নেতৃত্বদানকারী বর্ষীয়ান মেরু ভূগোলবিদ জন শেয়ারস বলেন, “ড্রোন যখন জাহাজের নামের সামনে গেল তখন সবার মুখ হা হয়ে গিয়েছিল। এই জাহাজ খুঁজে পাওয়া এক অনন্য সাফল্য।”
তিনি আরও বলেন, “ক্রমাগত বরফ, তুষারঝড়, -১৮ ডিগ্রি তাপমাত্রার সঙ্গে লড়াই করে আমরা সফলভাবে বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন জাহাজডুবির অনুসন্ধান শেষ করেছি। অনেকে যা অসম্ভব বলে দাবি করেছিল তা আমরা করে দেখিয়েছি।”
এই উদ্ধার অভিযানকে ‘মেরুর ইতিহাসের একটি মাইলফলক’ হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে।
যদিও এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ৩ কিলোমিটার পানির নিচে এটি পড়েছিল কিন্তু দেখলে মনে হয় যেন সেদিনই এটি ডুবেছে। যেমন ছিল তেমনই আছে। জাহাজের কাঠের পাটাতনগুলো কিছুটা ক্ষয়ে গেলেও এখনও যথেষ্ট মজবুত আছে।
এত বছর ধরে অসাড়ভাবে পরে থাকা জাহাজের গায়ে নানা রকম সামুদ্রিক উদ্ভিদ, স্পঞ্জ ও অন্যান্য ছোট ছোট সামুদ্রিক জীব বাসা বাঁধলেও জাহাজটির কাঠামোর কোনো রকম ক্ষতি হয়নি।
এনডিউরেন্স উদ্ধার প্রসঙ্গে অনুসন্ধান পরিচালনাকারী মেনসুন বাউন্ড গণমাধ্যমকে বলেন, “এটি আমার দেখা অন্যতম সুন্দর একটি কাঠের জাহাজ। এত বছর সাগরের বুকে নিমজ্জিত থাকার পরেও এটি প্রায় অক্ষত রয়েছে এবং সংরক্ষণের জন্য একদম উপযুক্ত অবস্থায় রয়েছ। জাহাজের স্টিয়ারিং হুইল এবং গিয়ার এমন অবস্থায় আছে যে দেখলে মনে হয়,‘শ্যাকলটনের’ নাবিকেরা কিছু আগেই এখান থেকে বেরিয়ে গেছে।”
দ্য সানে প্রকাশিত বিবৃতি অনুযায়ী ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ ড্যান স্নোর ভাষ্যে, ওয়েডেল সাগরের ঠান্ডা তাপমাত্রা সম্ভবত জাহাজটির এতটা অক্ষত থাকার কারণ। এখানে পানির তাপমাত্রা খুবই কম, প্রায় শূন্যের নিচে। তাই কাঠ নষ্ট করতে পারে এমন কোনো মাইক্রোবস বা মাইক্রো অর্গানিজম পানিতে ছিল না।
শবনম জাবীন চৌধুরী ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের ফার্মেসি বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন।
zabin860@gmail.com
