'তোমাদের মাঝে কি কেউ আছে বন্ধু আমার, তোমাদের মাঝে কি কেউ আছে পথভোলা? তবে বন্ধু নৌকা ভেড়াও, মুছিয়ে দেবো দুঃখ সবার।'
জনপ্রিয় রকস্টার জেমসের এই গানটার মতই আমাদের আরো অনেক গানে-কথায়-কবিতায় এসেছে নৌকার কথা।
নদীমাতৃক আমাদের এই দেশের অন্যতম পরিচিত এক বাহন নৌকা। ব্যবসা-বাণিজ্যের কাজ থেকে শুরু করে ভ্রমণ- পারিবারিক আয়োজনসহ আরো বহু ক্ষেত্রেই ব্যবহার হয়ে আসছে নানা ধরনের নৌকা। সময়ের সাথে সাথে সেসবের অনেকগুলোই হয় হারিয়ে গিয়েছে বা হারিয়ে যাওয়ার পথে।
একসময় এমন সব রকমারি নৌকার সমাহার ছিল এই বাংলা জুড়ে। এমন কিছু বাহারি নৌকার সাথে পরিচিত হয়ে আসা যাক তবে।
ডিঙ্গি
নৌকার নাম শুনলে প্রথমেই চোখে ভেসে ওঠে ছোট আকারের চাপা পাতার মতো সরু এই নৌকার ছবি।
নদীর তীর বা হাওড়-বাঁওড়ের বাসিন্দারা নদী পারাপার, মাছ শিকার ও নানাবিধ কাজে এই নৌকা ব্যবহার করেন । এতে মাঝে মাঝে পালও লাগানো হয়। এখনো গ্রাম এলাকায় বা বিলগুলোতে ডিঙ্গি নৌকার দেখা পাওয়া যায়।
ডোঙা
এটি 'তালের নাও-কোন্দা' নামে পরিচিত। কারণ তালগাছের কাণ্ড কুঁদে এটি তৈরি করা হয়। ডোঙ্গা বেশ মজবুত ধরণের নৌকা। তাল গাছের কাণ্ড সহজে পঁচে না বলে ডোঙা বেশ কয়েক বছর টেকে। মূলত অল্প মালামাল পারাপারের কাজে এটি ব্যবহৃত হয় বেশি।
বজরা
জমিদার বা রাজা-রাজড়াদের যেকোনো কাহিনী পড়তে গেলে প্রায়ই সেখানে বজরা নৌকার উল্লেখ থাকে। এই নৌকাগুলো আকারে হতো বিশাল। একেকটা নৌকায় ৪০-৫০ জন মানুষ অনায়াসে চড়তে পারতো, ৪-৫ জন মাঝি থাকতেন।
খাওয়া-ঘুমানো, আমোদ-প্রমোদের ব্যবস্থাও থাকতো বজরায়। তবে জমিদারি ব্যবস্থার বিলুপ্তির সাথে সাথে বজরাও বিলুপ্ত।
ময়ূরপঙ্খী
এটিও রাজা-বাদশাদের প্রমোদ ভ্রমণের জন্য নির্মিত নৌকা। এর সামনের দিকটা ময়ূরের মত নকশার হওয়ায় এই নামকরণ৷ এর সুযোগ-সুবিধা অনেকটা বজরার মতই। এই নৌকাতেও ৪ জন মাঝি থাকতেন। সাথে দুই দিকে সংযুক্ত থাকতো দুটো পাল। ১৯৫০ এর দশকের পর থেকে এটিও কার্যত বিলুপ্ত।
পানসী
'বেলা বয়ে যায়/ ছোট্ট মোদের পানসী তরী- সঙ্গে কে কে যাবি আয়...' - দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের গানে দেখা মেলে পানসী নৌকার। একসময় দূরের যাত্রায় সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ধরা হতো পালতোলা পানসীকে।
সম্রাট আকবরের আমল থেকে এই নৌকায় করে জমিদাররা বিভিন্ন দেশে বাণিজ্য করতে যেতেন। বিশেষত বাংলাদেশের বাখেরগঞ্জ (বরিশাল) অঞ্চলে এটি প্রচুর দেখা যেত।
সওদাগরী
সওদা বা বাণিজ্যের কাজে ব্যবহৃত নৌকা ছিলো এটি, নাম থেকেই যা বুঝে নেওয়া যায় কিছুটা। সওদাগরেরা এই নৌকায় করে দেশ-দেশান্তরে বেড়াতেন। এসব নৌকার বহু লোক ধারণ করার ক্ষমতা ছিল। এতেও পাল লাগানো হতো। এখন আর এই নৌকার দেখা মেলে না বহু বছর।
ঘাষী
বড় আকারের এই নৌকা মূলত মালামাল পরিবহনের কাজেই ব্যবহৃত হতো। নদীপথে জেলা থেকে জেলায় যাওয়া যেত এই নৌকায়।
বাচারি
প্রায় ৪০ টন ভারবহন করতে সক্ষম এই নৌকাও মূলত ব্যবসায়িক কাজেই ব্যবহৃত হতো। বর্তমানে এরও তেমন প্রচলন নেই।
সাম্পান
'ওরে সাম্পানওয়ালা তুই আমারে করলি দিওয়ানা' - চট্টগ্রাম অঞ্চলের জনপ্রিয় এই লোকগীতিতে আমরা উল্লেখ পাই সাম্পান নৌকার।
সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ে ভেসে বেড়াত এটি। চট্টগ্রাম ও কুতুবদিয়া এলাকায় সবচেয়ে বেশি দেখা যেত। এর সামনের দিকটা উঁচু ও বাঁকানো, পেছন দিকটা সোজা। একজন মাঝি দিয়ে চলত এই নৌকা, ব্যবহৃত হতো মালামাল পরিবহন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের কাজে।
প্রকাণ্ড আকারের সাম্পানগুলোতে ৭জন মাঝিও থাকত, আর থাকত ত্রিভুজাকার ৩ টি পাল। তবে বর্তমানে শ্যালো নৌকার ব্যাপক প্রচলনের ফলে সাম্পান প্রায় হারিয়ে গেছে।
পাতাম
এটি একধরনের যুগল নৌকা। দুটো নৌকাকে পাশাপাশি রেখে লোহার কাঠা দিয়ে যুক্ত করে এ যুগল নৌকা তৈরি করা হয়। এই লোহার কাঠাকেই বলা হয় 'পাতাম।' একে 'জোড়া নাও বলেও ডাকা হয়।
এতে মাঝি ছাড়া ৪ জন দাঁড় টানা লোক ও একটি পাল থাকে । মূলত মালামাল পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত এই নৌকা মূলত বৃহত্তর সিলেট অঞ্চল ও কিশোরগঞ্জে বেশি দেখা যেত।
বালার
এটি কুষ্টিয়া অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী ব্যবসায়িক নৌকা। নৌকাগুলো আকারে বেশ দীর্ঘ হতো। ফলে বৈঠা বাওয়ার কাজে প্রায় ১০-১২ জন মাঝির প্রয়োজন হতো। এ নৌকায় দুটো পাল থাকতো। বর্তমানে এর প্রচলন নেই বললেই চলে।
মলার
পাবনার দিকে একসময় বেশ চলতো মলার নৌকা। এটিও মূলত ছিল মালবাহী নৌকা। ১২ টন থেকে শুরু করে ৫৬ টন ওজনের মাল বহনে সক্ষম ছিল এটি। বিশাল এই নৌকার পাল থাকতো দুটো, দাঁড় থাকতো ছয়টি। বর্তমানে এটি প্রায় বিলুপ্ত।
কোষা
এই নৌকা গ্রামে-গঞ্জে খালে-বিলে চলতে দেখা যায়। ছোট আকারের এই নৌকায় গলুইয়ের কাঠ খুব বেশি বড় থাকেনা। বর্তমানে এর প্রচলন বেশ কমে গেছে, তবে কিছু কিছু এলাকায় এখনো কালেভদ্রে এই নৌকা চোখে পড়ে।
একমালাই
ছইযুক্ত এই নৌকা মূলত দূরের যাত্রায় ব্যবহৃত হতো। বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলে ছিল এর প্রচলন। এ অঞ্চলের মানুষ দূর-দূরান্তে যেতেন এই নৌকায় করে।
গয়না নৌকা
মূলত যাত্রী পারাপারের কাজেই ব্যবহৃত হতো এই নৌকা । এর ওপর বাঁশ দিয়ে তৈরি মাচার ছাদ থাকতো। একসঙ্গে প্রায় ২৫-৩০ জন যাত্রী বহন করার ক্ষমতা ছিল এই নৌকার। পাশাপাশি যেত বিভিন্ন ব্যবসায়িক দ্রব্য ও গবাদিপশুও৷
পদি
এই নৌকার আরেক নাম 'বাতনাই।' মূলত দক্ষিণাঞ্চলে চলত এই নৌকাগুলো৷ এগুলো যথেষ্ট লম্বা হতো, যা চালাতে ১৭-২০ জনের মত মাঝির প্রয়োজন হতো। ১২০-১৬০ টন পর্যন্ত মালামাল এর মাধ্যমে নিয়ে যাওয়া যেত।
নাইয়োরী
নববধূদের নাইওর নেয়ার জন্য আসতো এই নৌকাগুলো। এখানে বাঁশের মাচার ছাদ থাকত। সবমিলিয়ে ৩-৪ জন বসতে পারতেন ছোট আকারের এই নৌকায়।
ইলশা
নাম থেকেই অনুমান করা যায় এই নৌকার সম্পর্ক ইলিশ মাছের সাথে। ইলিশ ধরার জন্য উপকূলীয় বা সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলে চল আছে এই নৌকার। একেকটা নৌকায় সবমিলিয়ে ৪-৫ জন জেলে থাকেন। নৌকাগুলো মাঝারি আকৃতির ও মোটামুটি ঘাতসহ হয়।
বাইচ-নৌকা
পঙ্খীরাজ, দ্বীপরাজ, সোনার তরী- এমন নানারকম বাহারি নামে ডাকা হতো এই নৌকাগুলোকে। নৌকাবাইচ এখনো আমাদের দেশে বেশ জনপ্রিয় খেলা। বর্ষাকালে বিভিন্ন বিলে (যেমন- চলনবিল, হাঁসাইগাড়ি বিল) নৌকাবাইচের আয়োজন হতে দেখা যায়।
এগুলো একেকটি নৌকা দৈর্ঘ্যে ১০০-২০০ ফুট পর্যন্ত হয়। আকার ভেদে ৩০-১০০ জন পর্যন্ত মাঝি থাকতে পারে।
মাহমুদ নেওয়াজ জয় বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষে অধ্যয়নরত।
mahmudnewaz939@gmail.com