মোঃ শওকত আলী তার পুরানো ডায়েরিটি নাড়াচাড়া করে দেখালেন তার লেখা কিছু পুরোনো কবিতা, সাথে কয়েকটি টীকা।
প্রতিটি লেখার বয়স কমপক্ষে ৩০ থেকে ৪০ বছর। তার ধারনা বর্তমানে ডায়েরি লেখার চল অনেকটা উঠে গেছে। শওকত বর্তমানে তার পরিবারের সাথে পুরান ঢাকার নারিন্দায় বসবাস করছেন।
নিত্য দিনের অংশ হয়েই থাকতো ছোট খাটো শখ। বর্তমানে কিছু শখ হারিয়ে গেছে আবার নতুন শখও জায়গা করে নিয়েছে আমাদের জীবনে।
১. ডায়েরি লেখা:
দেশ-কাল ভেদে সাধারণ একটি শখ ডায়েরি লেখা। মানুষ তার দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোনো কিছু পাওয়ার আক্ষেপ কিংবা না-পাওয়ার আনন্দ অনেক কিছু লিখে রাখতো এই ডায়েরিতেই।
শওকত বলছিলেন যে, তার পায়ে একটি বড় পেড়েক ঢুকেছিল ফকিরাপুলের গাছ-পালা ঘেরা মাঠের ভিতর দিয়ে। এই ঘটনাটি তিনি ডায়েরিতে লিখেছিলেন।
তিনি বলেন, "শীত কালে পাতাগুলো মাটিতে পড়ে থাকতো। আমি হাঁটছিলাম। খেয়াল না থাকায় মাটিতে পড়ে থাকা পেরেকে পা পড়ে। সারাদিন কাওকে এটি জানাই নি, তবে ডায়েরিতে লিখেছিলাম
পাকিস্তান আমল। ফুটবলই ছিল প্রধান খেলা। বড় দল গুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল মোহামেডান, ওয়ান্ডার্স ও ব্রাদার্স ক্লাব। শওকত মোহামেডানের পক্ষে খেলতো আর তার ভাই ওয়ান্ডার্সের হয়ে। ম্যাচের মধ্যে বিভিন্ন ঘটনা তার ডায়েরিতে আছে।
"খেলা চলা কালে একবার বল সজোরে পেটে লাগে। আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছিলাম না, পরে জ্ঞান হারাই। জ্ঞান ফেরার পর মাঠে ফিরে দুটি গোল করি।"
২. বাগান করা
ডায়েরি লেখার মতো আরেকটি শখ হলো বাগান করা। অনেকেই শখের বসেই করে, কেউ করে শৌখিনতায়।
"আগে বাড়ির পাশে উঠান থাকার ফলে গাছ লাগানো ও পরিচর্যা করার যথেষ্ট সুযোগ ছিল। এখন সব ফ্ল্যাট বাড়ি হওয়ায় খালি জায়গা একেবারেই কমে গিয়েছে। তাই আগের মতো বাগান করা যায় না।" কথা গুলো বলছিলেন আফরোজা খাতুন তিনি উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের একাদশ শ্রেণীর ছাত্রী।
জায়গার অভাব ছাড়াও এখন গাছের পরিচর্যার জন্যে তেমন সময়ও পাওয়া যায় না। জীবনের গতি বদলেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ ও ইনফোরম্যাটিক্স বিভাগের ছাত্র রাকিব হোসাইন এ প্রসঙ্গে বলছিলেন।
তিনি বলেন, "গত ১৫/২০ বছরে জনসংখ্যা ও রাস্তার যান-বাহনের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। আগে ট্রাফিক জ্যাম পেড়িয়ে ৩০ মিনিটে কোথাও যাওয়া যেত এখন লাগে দুই-তিন ঘণ্টা।"
বায়ু দূষণ, পাবলিক ট্রান্সপোর্টের অবস্থাকে তিনি কিছুটা দায়ী মনে করেন।
তিনি আরো বলেন, "পাবলিক ট্রান্সপোর্টের ভিতরের অবস্থা ভালো নয়, সাথে যোগ হয় রাস্তা ঘাটের ধুলা। তাই বাসায় ফিরে ক্লান্ত হয়ে পড়ি। স্কুলে থাকতে এই ধকল পোহাতে হতো না। বাড়ি ফিরে গাছের যত্ন করতাম, একটু বই পড়তাম।প্রতিদিন এতো ধকল পেড়িয়ে বাগান করা খুব কঠিন।"
৩. স্ট্যাম্প সংগ্রহ করা
আমাদের অনেক শখই পরিস্থিতির স্বীকারে হারিয়ে গেছে। এরকমই একটি হলো স্ট্যাম্প সংগ্রহ করা। চিঠির সাথে স্ট্যাম্প পাওয়া যেত। এখন চিঠির চল উঠে যাওয়ার সাথে স্ট্যাম্প সংগ্রহ করার শখটিও উঠে গেছে।
এটিও বেশি দিন আগের কথা নয়। বদল ঘটেছে বছর বিশ ধরে। নব্বইয়ের দশকে ফুটবল বিশ্বকাপকে ঘিরে ছাড়া হয়েছিল কিছু স্ট্যাম্প। সেগুলো অনেকেই সংগ্রহে রেখেছে।
৪. সুগন্ধি সংগ্রহ করা
সুগন্ধি সংগ্রহও কোনো সময় আমাদের শখের অংশ ছিল। যদিও মধ্যবিত্ত পরিবারে এই শখ তেমন দেখা যেত না। উচ্চবিত্তদের ঘরে শোভা পেত নামিদামি ব্র্যান্ডের সুগন্ধি।
মধ্যবিত্ত পরিবারে আতর সংগ্রহ করা হতো। সুন্দর কারুকার্য খচিত আতরের শিশিগুলো জমা রাখার মধ্যেই ছিল শখের বহিঃপ্রকাশ। সময় ও রুচি পরিবর্তনের জন্য অনেকে সুগন্ধি সংগ্রহ করে না।
পুরনো শখগুলোকে প্রতিস্থাপন করলো যেসব:
১. ডিভিডি সংগ্রহ করা
কিছু শখ হারিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে নতুন কিছু শখ প্রতিস্থাপনও করেছে। এর মধ্যে একটি হলো ডিভিডি সংগ্রহ করা। ডাউনলোড করে সিনেমা দেখা এখন গোপন নয়। তাছাড়া ওটিটি প্ল্যাটফর্মের সময় সিনেমা স্ট্রিম করেও দেখা যায়। গানের জন্য রয়েছে ইউটিউব। তাই ডিভিডি অথবা ক্যাসেট কেউ কিনে না। তাই এসব সংগ্রহ করা হয়ে দাঁড়িয়েছে নতুন একটি শখ।
বাইতুল মোকাররমে এখনো টিকে আছে দুই-একটি ডিভিডির দোকান। সময়ের সাথে এই শখটি দেখা যাচ্ছে অল্প কিছু মানুষের মধ্যে। তবে এখনো এটি সাধারণ হয়ে ওঠে নি।
২. পোস্টার সংগ্রহ
পোস্টার সংগ্রহ করা আগেকার শখ হলেও মাঝে এটি কমে গিয়েছিল। এর অন্যতম কারণ ছিল বাড়িওয়ালারা তাদের ভাড়াটিয়াদের পোস্টার লাগাতে নিষেধ করা। তবে এখন ভিন্ন ধরনের কিছু পোস্টার বাজারে পাওয়া যায় যা দেয়ালের রঙ ক্ষতি করে না। তাই অনলাইনে পোস্টার বাণিজ্য ভালোই করছে। মানুষও তার আগের শখে ফিরে যাচ্ছে।
ইস্ট-ওয়েস্ট থেকে বিবিএ সম্পন্ন করা সুদয় যিনি পোস্টার সংগ্রহ করতেন তিনি বলেন, "আমি আগে কিছু পোস্টার লাগিয়ে ছিলাম কিন্তু ঘরের দেয়াল নষ্ট হয় বিধায় আর সংগ্রহ করি নি। এখন নতুন কিছু পোস্টার এসেছে। এগুলো আবার সংগ্রহ করবো।"
৩. ইনডোর-গাছ
বাগান করার জায়গা আর সময় না থাকলেও ঘরের ভিতর ইনডোর-গাছ লাগানো ও যত্ন নেয়া তুলনামূলক সহজ। তাই অনেকেই এখন এটি বর্তমানে শখ হিসেবে নিয়েছে।
আমরা বড় হয়েছি চিঠি লেখা থেকে ম্যাসেঞ্জারে ক্ষুদে বার্তা পাঠানো পর্যন্ত এবং ডায়েরি লেখা থেকে ফেইসবুক পোস্ট ও মেমোরি দেখা পর্যন্ত।
পরিস্থিতির পরিবর্তনের সাথে যাপিত জীবনের এই পরিবর্তন গুলোর মধ্যেই মিশে আছে আমাদের পুরানো দিনের শখ।
মোঃ ইমরান, বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ এবং সাংবাদিকতা বিভাগের মাস্টার্সে অধ্যায়নরত।
