Loading...
The Financial Express

হাওরের জীবন, হাওরের সংস্কৃতি

| Updated: July 24, 2021 11:58:28


হাওরের জীবন, হাওরের সংস্কৃতি

আমি বর্তমানে শহরের অধিবাসী হলেও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটা সময় পর্যন্ত অর্থাৎ শৈশব আর কৈশোরটা হাওর অঞ্চলেই কাটিয়েছি। হাওরের কাদা-মাটি মেখেই বড় হয়েছি। হাওর পারের একেবারেই সাদামাটা ছোট একটা গ্রামে কাটানো শৈশব আর কৈশোরটা যে কতটা সুন্দর ছিল, তা তখন কতটা বুঝতে পারিনি, যতটা এখন পারি। সেই দিগন্তবিস্তৃত মাঠ, অবারিত সবুজের প্রান্ত ছোঁয়া আকাশ, দূর-বহুদূরে হারিয়ে যাওয়া মেঠো পথ, আঁকাবাঁকা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে গুনটানা নৌকা দেখা, ভরা বর্ষায় প্রমত্তযৌবনা হাওরে ঝড়ো বাতাস, ঢেউ আর বৃষ্টির মিতালির অপূর্ব দৃশ্য দেখা সবকিছু কেন জানি এখন চোখের সামনে বারবার ভেসে ওঠে।

এসব মন উদাস করা স্মৃতির সাথে আজ শৈশব-কৈশোরের আমাদের এলাকার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মনমাতানো স্মৃতি মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। ভুলতে চাইলেই যেন আরও বেশি করে মনে পড়ে সেসব সোনালী দিনের কথা। আজকের এ লেখায় হাওরজীবনের সাথে মিশে থাকা সংস্কৃতির বিভিন্ন অংশ নিয়েই কথা হবে।

পালাগান আর মঞ্চ

বৈশাখের ফসলটাই হাওরবাসীদের আসল সম্বল। বহুবার খরায় বৈশাখের সম্পুর্ণ ফসল নষ্ট হয়ে যেতে দেখেছি। তবে সব বছরেই হাওরের ফসল নষ্ট হয়ে যেত না। যে বছর কৃষকের ভালো ফসল হতো, সে বছর তাদের আনন্দের আর সীমা থাকতো না। বৈশাখের ফসল ঘরে তুলেই তাঁরা শুরু করতেন আনন্দ উদযাপন।

প্রায় প্রতি গ্রামেই পালাগান মঞ্চায়নের আয়োজন শুরু হয়ে যেতো। সারা গ্রামের মানুষ দরবার (মিটিং) করে সিদ্ধান্ত নিতো, কোন পালা মঞ্চায়িত হবে আর এতে কার কী ভূমিকা থাকবে। একজনকে ম্যানেজারের আর একজনকে দলের সেক্রেটারির দায়িত্ব দেয়া হতো। এই দু'জনই মোটামুটি ভালো অংকের চাঁদাও দিতেন।

পালাগান মঞ্চায়নের জন্য বেশ খরচের প্রয়োজন হতো। দায়িত্বপ্রাপ্ত দু'জন ছাড়াও গ্রামের সবাই মিলে এই খরচ বহন করতেন। পালার জন্য প্রায় মাসাধিক সময় ধরে রিহার্সাল হতো। গ্রামের পড়াশোনা না জানা সব মানুষ। কেউ রাজা, কেউ সেনাপতি, কেউ উজির, কেউ রাজকুমার, কেউ রানী, কেউবা রাজকুমারী। নারী চরিত্রের ভূমিকায় পুরুষরাই অভিনয় করতেন। শুদ্ধ বাংলায় ডায়লগগুলো মুখস্থ করা বা বলা তাঁদের জন্য বেশ কষ্টসাধ্য ছিল। এরপরও দেখা যেতো, মাস দেড়েক প্রাণান্তকর চেষ্টার ফলে ডায়লগগুলো মোটামুটি ভালোভাবেই আয়ত্ত করে ফেলতেন।

অবশেষে শুরু হতো মঞ্চায়নের চূড়ান্ত আয়োজন। সেখানে তো নাট্যমঞ্চ ছিলো না। বিভিন্ন বাড়ি থেকে ছয় থেকে আটটি চৌকিখাট এনে মঞ্চ প্রস্তুত হতো। মঞ্চের উপর শামিয়ানা টাঙানো হতো। এর জন্য বাঁশে দরকার হতো। হ্যাজাক লাইটেরও ব্যবস্থা হতো। এ ছিল এক এলাহী কাণ্ড।

যাঁরা রাতে রাজা বা সেনাপতির অভিনয় করবেন, তাঁদেরকেই দেখা যেতো দিনের বেলায় এগুলো কাঁধে করে আনছেন। পালাগান মঞ্চায়নের কয়েকদিন আগে থেকেই বেশ কয়েকটা গ্রামের মানুষের মধ্যেই এটা উপভোগ করার জন্য টানটান উত্তেজনা বিরাজ করতো। অবশেষে এক রাতে আসতো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।

প্রথমে শুরু হতো হারমোনিয়াম, তবল, বাঁশী, ঢোলক, সানাই ইত্যাদির সম্মিলিত যন্ত্রসঙ্গীত। সবার মনে তখন এক অদ্ভুত শিহরণ! এরই মধ্যে হঠাৎ করে এই সুরটা পরিবর্তিত হতো। সবাই বুঝে যেতো, বন্দনা শুরু হয়ে যাবে। সবাই তখন একেবারে নিশ্চুপ। এমন সময় মঞ্চে উঠে আসতেন একদল শিল্পী। শুরু হতো বন্দনা। তখনই ভালোভাবে আসর জমে যেতো। বন্দনার পরই মূল পালা গান।

নাটকের মঞ্চ

পালাগানের পাশাপাশি চিত্তবিনোদনের আর একটা বিষয় ছিলো নাটক মঞ্চস্থ করা। নাটক সাধারণত মঞ্চস্থ হতো শীতকালে কোনো ক্লাব বা কোনো এলাকার ছাত্রদের অথবা ছাত্র ও বয়স্কদের সম্মিলিত উদ্যোগে। মোটামুটি শিক্ষিতদের অংশগ্রহণ থাকতো এতে। নাটকের নারী চরিত্রে অভিনয় করার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে নারী শিল্পী নিয়ে আসা হতো।

এসব নাটকও খুব উপভোগ্য হতো। তবে রিহার্সাল থেকে শুরু করে মঞ্চস্থ করা পর্যন্ত বিষয়টা একেবারে সহজ কাজ ছিল না। একটি ক্লাবের সাথে যুক্ত থাকায় প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা হয়েছে। একদিকে টাকা-পয়সা যোগাড় করা, অন্যদিকে মঞ্চ বানানো, আলোর ব্যবস্থা, অতিথিদের জন্য আসনের ব্যবস্থা ইত্যাদি করার সময় প্রতিবারই আমরা বলতাম যে, “আমরা আর নাটক করব না”। কিন্তু পরের বছর আবার আমরা নাটক করতাম। নাটক মঞ্চস্থ হওয়ার পর এলাকায় অনেকদিন পর্যন্ত ক্লাবের প্রশংসা শুনে মনটা আনন্দে ভরে উঠতো।

যাত্রার মঞ্চ

যাত্রাগান এ অঞ্চলের মানুষের বিনোদনের একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল। সাধারণত শীতকালে যাত্রাপালা হতো। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে যাত্রা দল আনা হতো। এলাকায় আগেই খবর ছড়িয়ে পড়তো। প্যান্ডেলের কাজ শুরু হতো।

সবার মাঝে তখন কী যে আগ্রহ! যাত্রা দল কোথা থেকে আসবে? কী কী পালা হবে? দলে ভালো অভিনেতা/অভিনেত্রী আছে-তো? আয়োজকদেরও কত ব্যস্ততা! তাঁদের মুখ থেকে কথা বের করাই ছিল কঠিন।

‘মা-মাটি-মানুষ’, ‘দেবী সুলতানা’, ‘মোঘল-এ-আজম’, ‘গঙ্গা থেকে বুড়িগঙ্গা’, ‘বর্গী এলো দেশে’, ‘রক্তস্নাত ৭১’, ‘নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা’ ইত্যাদি দারুণ সব পালা দেখা যেত। অভিনয়ও ছিল চমৎকার। যাত্রা দলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল দিপালী অপেরা, বুলবুল অপেরা, গণেশ অপেরা, নবরঞ্জন অপেরা, বাসন্তী অপেরা, বাবুল অপেরা, বলাকা অপেরা, চারণিক নাট্যগোষ্ঠী, ফাল্গুনী অপেরা ইত্যাদি। কুশীলবদের মধ্যে নয়ন দত্ত, অমলেন্দু বিশ্বাস, আলিম, মুসলিম, নয়ন মিয়া, আশরাফ আলী, মঞ্জুশ্রী, জ্যোৎস্না বিশ্বাস, রিনা সুলতানা, চন্দ্রা ব্যানার্জী, শবরী দাশ গুপ্তা প্রমুখ ছিলেন উল্লেখযোগ্য।

যাত্রা চলাকালীন দর্শকরা একেবারে বিমোহিত হয়ে যেতেন। পালার সুখ-দুঃখের কাহিনীর সাথে একাত্ম হয়ে হাসিতে ফেটে পড়তেন অথবা কান্নায় সবার চোখ ভিজে যেতো।

মন মাতানো বাউলগান

হাওরবাসীদের চিত্তবিনোদনের আরেকটা জনপ্রিয় বিষয় ছিলো বাউলগান। আগে প্রতি বছর বোরোধান ঘরে তোলার পর প্রতি গ্রামেই বাউলগানের আসর বসতো। আসরগুলোতে হাজার হাজার মানুষ আসতো গান উপভোগ করার জন্য। এক আসরে কমপক্ষে দু’জন শিল্পী থাকতেন। তাঁরা একে অপরের প্রতিপক্ষ হয়ে প্রতিযোগিতা করতেন। একেকজন একেকটা বিষয় বেছে নিতেন। গানের ফাঁকে ফাঁকে একে অপরকে প্রশ্ন করতেন।

গান আর প্রশ্নবাণের মায়াবী জালে দর্শক-শ্রোতাদেরকে একেবারে সম্মোহিত করে ফেলতেন শিল্পীরা। এমন হতো যে একনাগাড়ে সারাদিন আর সারারাত ধরে চলতো এই গান। নেত্রকোণার কেন্দুয়া উপজেলার বাউল শিল্পী জালাল উদ্দিন খাঁ ছিলেন এমনই এক বাউল শিল্পী। তাঁর লেখা গানগুলোর মধ্যে ‘থাকতে যদি না পাই দেখা চাই না মরিলে’, ‘ও আমার দরদী আগে জানলে তোর ভাঙা নৌকায় চড়তাম না’, ‘আরে ও ভাইট্যাল গাঙের নাইয়া’, ‘সেই পারে তোর বসত বাড়ি’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের অনেক নামকরা শিল্পী এই গানগুলো গেয়ে অসাধারণ জনপ্রিয়তা পেয়েছেন।

নেত্রকোণার মোহনগঞ্জের বাউল শিল্পী উকিল মুন্সি বাউলগানের জন্য অসাধারণ জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন। প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক ও নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদের সিনেমায় তাঁর গানগুলো স্থান পাওয়ার ফলে এগুলো এখন সারা দেশের মানুষের মুখে মুখে ফেরে। তাঁর বহু গানের মধ্যে ‘শোয়াচান পাখি’, ‘আষাঢ় মাইস্যা ভাসা পানি রে’, ‘সোনা বন্ধুয়া রে এতো দুঃখ দিলে তুই আমারে’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিম বাউলগানকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। প্রভাত সূত্রধরও অসাধারণ গান গাইতেন। এছাড়াও আরো অনেকেই ছিলেন।

কিচ্ছাগানের কিচ্ছা

বাউলগানের পাশাপাশি পালা বা লম্বা কিচ্ছাগানও এ অঞ্চলের মানুষের কাছে খুব জনপ্রিয় ছিল। ছোট বেলায় আমাদের এলাকার আব্দুল কদ্দুছ বয়াতির গান অনেকবার শুনেছি। এখন তো তাঁর বিশ্বজোড়া খ্যাতি। কিচ্ছা গানকে এই শিল্পী তাঁর দক্ষতা আর যোগ্যতা দিয়ে অনন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছেন। তিনি ছাড়াও আরও কয়েকজন বয়াতিকে খুব চমৎকারভাবে এই কিচ্ছা গাইতে দেখেছি।

মৌসুমী খেলাধুলা

বোরোধান তোলার পরই ফুটবল খেলার ধুম পড়ে যেতো। আমরা ছোট বেলায় জাম্বুরাকে ফুটবল বানিয়ে খেলতাম। অনেক সময়ে খড়কে গোলাকৃতি করে বেঁধে ফুটবল বানিয়েও খেলতাম। বর্তমান সময়ের শিক্ষার্থীদের মতো আমাদের স্কুলের বাইরে প্রাইভেট টিউটরের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন হতো না। তাই, বন্ধের দিন ছাড়াও স্কুলের পরে প্রতি বিকালেই খেলাধুলার জন্য অনেক সময় পেতাম।

অনেক গ্রামেরই বেশ বড় বড় মাঠ ছিল। সেখানে নিয়মিত ফুটবল টুর্নামেন্ট হতো। প্রতি গ্রামের দলই এসব টুর্নামেন্টে অংশ নিতো। তবে ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে মাঝেমধ্যেই ঝগড়াঝাঁটিও হয়ে যেতো। বিশেষ করে বড় গ্রামগুলো হারটাকে সহজভাবে মেনে নিতে পারতো না। এরপরও টুর্নামেন্টগুলো শেষ হতো। হাজার হাজার দর্শক এসব খেলা দেখতে ভিড় জমাতো। শীতকালে বিভিন্ন গ্রামের মধ্যে ভলিবল টুর্নামেন্টেরও আয়োজন হতো। বিভিন্ন গ্রামে বেশ কিছু ভালো খেলোয়াড়ও তৈরি হতো।

ষাঁড়ের লড়াই

হাওরাঞ্চলে ষাঁড়ের লড়াই আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিনোদন। প্রায় প্রতি গ্রামেই এক বা একাধিক বড় ষাঁড় থাকতো, যাদের শুধু লড়াইয়ের জন্যই রাখা হতো। ষাঁড়ের লড়াইয়ের মেলা বা আসরকে 'আরাং' বলা হতো। আরাংয়ে অনেক ষাঁড় নিয়ে আসা হতো। তবে সবচেয়ে বড় ষাঁড়ের লড়াইটা হতো সবার শেষে। যে দুই গ্রামের ষাঁড়ের মধ্যে লড়াই হতো, সেসব গ্রামের মানুষের মধ্যে বিরাজ করতো সর্বাধিক উত্তেজনা। দু'পক্ষের মানুষেরাই এটাকে ‘ইজ্জতের বিষয়’ মনে করতেন। এই উত্তেজনার জন্যই মাঝে মধ্যে ঝগড়াঝাঁটিও হয়ে যেতো।

নৌকাবাইচের বৈঠাবাজি

ভরা বর্ষায় নৌকাবাইচ হতো। বিভিন্ন গ্রাম তাদের নৌকা নিয়ে বাইচে অংশগ্রহণ করতো। অনেক লম্বা নৌকায় একজন হাল ধরতেন আর অন্যরা বৈঠা বাইতেন। হালের বৈঠাটা থাকত অনেক লম্বা। আমাদের গ্রামের বাড়িতে আমার দাদার আমলের ষোলহাত লম্বা একটা বৈঠা এখনও আছে। আসলে এটা ছিল আঠারো হাত লম্বা। দুই হাত ভেঙে গিয়ে এখন ষোল হাত লম্বা আছে। বৈঠাটা এতটাই ভারি যে একার পক্ষে ওঠানোই কঠিন। তবে বাইচের সময় এটা দিয়েই শক্ত হাতে হাল ধরে একজন নৌকাটা সামলাতেন।

প্রতিটি নৌকায় বাদ্যযন্ত্র থাকতো। এই বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে সবাই সুর করে গান ধরতেন আর সর্বশক্তি দিয়ে বৈঠা চালাতেন। হাওরের এই প্রতিযোগিতা দেখার জন্য ছোট ছোট নৌকা নিয়ে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হতো।

হাওরের বিয়ের সানাই

হাওরাঞ্চলের বিয়েকে ঘিরে অনেক মজার ঘটনা ঘটতো। বিয়ের কয়েকদিন আগে থেকেই আয়োজন শুরু হয়ে যেতো। প্রতিবেশী নারীরা মিলে কোনো বাজনা আর রিহার্সাল ছাড়াই সহজ-সরল ‘গীত’ গাইতেন। তাঁদের পেছনে তেমন কোনো খরচ করতে হতো না। শুধু পান-সুপারি খাওয়ালেই তাঁরা খুশি হতেন।

বর্তমান সময়ের মতো তখন এমন ডেকোরেশনের ব্যবস্থা ছিল না। দু-চারটে কলাগাছ কেটে সেগুলোকে বিয়ে বাড়িতে ঢুকবার রাস্তার দুপাশে পিলারের মতো পুঁতে দেওয়া হতো। দু’পাশের কলাগাছগুলোর সাথে বাঁশের ছটি বেঁধে গেট বানানো হতো। কলাগাছগুলোকে রঙিন কাগজ দিয়ে মুড়িয়ে দেওয়া হতো। আর উপরে অর্ধচন্দ্রাকারে বাঁধা ছটিগুলোতে রঙিন কাগজ দিয়ে বানানো ফুল লাগিয়ে দেওয়া হতো।

এখানে একটা টেবিল আর কিছু চেয়ার সাজিয়ে বরকে অভ্যর্থনা জানানো হতো। বরকে শরবত খাইয়ে মালা পড়িয়ে কিছু টাকা-পয়সাও আদায় করা হতো। এখানে বর ও কনে পক্ষের লোকদের মধ্যে কিছু সহজ-সরল ছড়া ও শ্লোক বিনিময় হতো।

বরপক্ষ কলের গান আর মাইক নিয়ে আসতো। সারাদিন মাইকে গান বাজতো। পল্লীগীতি, ভাওয়াইয়া বা বাংলা সিনেমার গান। অনেক বিয়েতে লাঠিখেলারও ব্যবস্থা করা হতো। লাঠিখেলার দলের লোকেরা লাঠির কসরত দেখাতেন।

বরের সাথে যত লোক আসতেন, তারা বরযাত্রী হয়ে সবাই কনে পক্ষের বাড়িতে একরাত থাকতেন। পরদিন কনে নিয়ে বরপক্ষ বাড়ি যেতেন। সঙ্গে কনেপক্ষের লোকেরাও যেতেন আর বরপক্ষের বাড়িতে একদিন থাকতেন। হাওরাঞ্চলের অধিকাংশ বিয়ে বর্ষাকালেই হতো। বরের বাড়ির ঘাটে নৌকা ভেড়ানোর পর বরের বাড়ির মহিলারা ধান-দুর্বা দিয়ে কনেবরণ করে নিতেন। এরপর তাকে কোলে করে বাড়িতে নেওয়া হতো। প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও কনেকে সারাদিন ঘোমটা মাথায় বসে থাকতে হতো। সবাই দল বেঁধে কনে দেখতে আসতেন।

বিয়ের পরদিন বরকনের গোসলের পরে শুরু হতো কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি খেলা। যে যেমন পারতেন একে অপরের গায়ে কাদা মাখাতেন। কেউ এর হাত থেকে রক্ষা পেতেন না। বয়স্ক লোকেরা অনেক সময় বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তেন।

হাওর অঞ্চলে জৈষ্ঠ্যমাসে কুস্তি খেলার আয়োজন করা হতো। হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে শক্তিশালী মানুষদের শারীরিক এই প্রতিযোগিতাও বেশ জমজমাট ছিল। এছাড়াও কিছু খেলাধুলা যেমন হাডুডু, দাড়িয়াবান্ধা, ডাঙ্গুলি আর ছোটদের বৌচি ইত্যাদিও বিনোদনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিলো। অবসর কাটানোর জন্য লুডু, বাঘবন্দি আর তাসখেলারও ব্যাপক প্রচলন ছিলো। এছাড়া ছোটবেলায় বায়োস্কোপ দেখেও আমরা খুব আনন্দ পেতাম।

বর্তমানে হাওর-সংস্কৃতি

বর্তমানে আকাশ সংস্কৃতির প্রভাব, কিশোর ও যুবক সমাজের অ্যান্ড্রয়েড ফোনের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি এবং এক শ্রেণির কুচক্রী মহলের আমদানিকৃত মাদকের ভয়াল থাবা, বিভিন্ন গ্রামের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের অবনতি ইত্যাদি কারণে এ সংস্কৃতি অনেকটাই হুমকির মুখে।

আশার কথা হলো, হাওরের সংস্কৃতি সংরক্ষণ ও গবেষণার লক্ষ্যে প্রাতিষ্ঠানিক কিছু কাজ ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক জ্যেষ্ঠ সচিব ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বর্তমান চেয়ারম্যান জনাব সাজ্জাদুল হাসানের বিশেষ প্রচেষ্টায় মোহনগঞ্জের কংশ নদীর তীরবর্তী বাহাম (রবীন্দ্র সঙ্গীতাচার্য শৈলজারঞ্জন মজুমদারের জন্মভূমি) গ্রামে ‘শৈলজারঞ্জন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র’ ও একই উপজেলার জৈনপুর গ্রামে ‘উকিল মুন্সি স্মৃতি কেন্দ্র’ স্থাপনের জন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রকল্প গ্রহন করা হয়েছে এবং দুটো প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজ এগিয়ে চলেছে। দু’টি প্রকল্পই বাস্তবায়ন করছে গণপূর্ত বিভাগ।

প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে ভাটি-বাংলার সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণার সুযোগ-সুবিধা যে বেড়ে যাবে, এমনটা জোর দিয়েই বলা যায়। এছাড়াও হাওরাঞ্চলের মানুষের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উপহার ‘শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয়’ও হাওর অঞ্চলের মানুষের জীবন ধারা ও সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। এটা করতে পারলে হাওর অঞ্চলের মানুষেরাই যে শুধু উপকৃত হবেন, তাই নয় বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার ভাণ্ডারও সমৃদ্ধ হবে। তাই সংশ্লিষ্ট সবাই এ কাজে এগিয়ে আসবেন এ প্রত্যাশা আমরা করতেই পারি।

মো. মোতাহার হোসেন নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ পাইলট সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক।

Share if you like

Filter By Topic