ছোটবেলায় সবাই কমবেশি রহস্যময় বহু দ্বীপের গল্প শুনেছেন। সেরকমই রূপকথার মতো এক রহস্যময় দ্বীপ স্যাবল আইল্যান্ড।
কানাডার নোভা স্কশিয়ার উপকূলে এ আইল্যান্ড বা দ্বীপটির অবস্থান। এখানকার অধিবাসী শুধুই বন্য ঘোড়া! দ্বীপটি বর্তমানে প্রায় ৫০০র বেশি বন্য ঘোড়ার দখলে রয়েছে। ঠিক যেন আমরা সবাই ঘোড়া আমাদেরই ঘোড়ার রাজত্বে!
এ অঞ্চলের তীব্র ঠান্ডা সহ্য করে দীর্ঘকাল ধরে ঘোড়াগুলো স্যাবল দ্বীপে টিকে রয়েছে। সর্বপ্রথম কোথা থেকে স্যাবল দ্বীপে ঘোড়ার আবির্ভাব হয়েছিল সে বিষয়ে সঠিক কোনো তথ্য বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে অধিকাংশ মানুষের ধারণা অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি প্রথম ঘোড়াগুলোকে এ দ্বীপে ছেড়ে দেওয়া হয়।
মূলত ব্রিটিশরা অ্যাকিডিয়ান্সদের নোভা স্কশিয়ার মূল ভূখন্ড থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার সময় তাদের ঘোড়াগুলোকে জব্দ করে নেয়। পরবর্তীতে থমাস হ্যাঙ্কক নামে বস্টনের এক ব্যবসায়ীকে ঘোড়াগুলোকে অন্যত্র পাঠানোর জন্য অর্থ দেওয়া হয়।
হ্যাঙ্কক তখন ঘোড়াগুলোকে স্যাবল আইল্যান্ডে রেখে আসেন। তারপর থেকেই ধীরে ধীরে এদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। প্রথম দিককার ঘোড়াগুলো ছিল ছোট আকারের। উচ্চতায় কম হওয়ার পাশাপাশি সেগুলোর রঙ ছিল কালো।
কানাডার ডালহৌসি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বিল ফ্রিডম্যান সিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ঘোড়াগুলোকে স্যাবল আইল্যান্ডে রেখে আসার সময় হয়তো চিন্তা করা হয়েছিল যে ঘোড়াগুলো নিজেরাই নিজেদের খেয়াল রাখতে পারবে এবং ধীরে ধীরে তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি হবে। পরবর্তীতে ঘোড়াগুলোকে কৃষিকাজে ব্যবহারের পাশাপাশি বিক্রি করার মাধ্যমেও লাভবান হওয়া যাবে।
ফ্রিডম্যানের মতে, ঘোড়ার পাশাপাশি আরো কিছু গবাদি পশু স্যাবল দ্বীপে রেখে আসা হলেও শেষ পর্যন্ত ঘোড়াগুলোই কেবল বেঁচে থাকতে সক্ষম হয়েছিল।
মূলত অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষদিক থেকেই অনেকে ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য এখান থেকে ঘোড়া নিয়ে যেতো। এছাড়া অনেকে আবার মাংসের জন্য এসব ঘোড়া জবাই করা শুরু করে। একারণে ১৯৫০ এর দশকের দিকে স্যাবল আইল্যান্ড থেকে ঘোড়াগুলো বিলুপ্ত হতে শুরু করে। অথচ এই দ্বীপের নৈসর্গিক সৌন্দর্যের অন্যতম আকর্ষণই এই বুনো ঘোড়াগুলো।
পরবর্তীতে ঘোড়ার প্রজনন বৃদ্ধি করার জন্য অন্য প্রজাতির আরো বেশ কিছু ঘোড়া এখানে রেখে আসা হয়। ১৯৫৯ সালে তীব্র শীতের কবল থেকে ঘোড়াগুলোকে বাঁচাতে তৎকালীন কানাডার প্রধানমন্ত্রী জন ডিফেনবেকার ঘোড়াগুলোকে দ্বীপ থেকে স্থায়ীভাবে সরিয়ে ফেলার আদেশ দেন।
এ আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে কানাডার স্কুলছাত্ররা প্রধানমন্ত্রী ডিফেনবেকারের কাছে ঘোড়াগুলোকে স্যাবল দ্বীপ থেকে না সরানোর অনুরোধ করে চিঠি লেখার একটি প্রচারণা শুরু করে।
পল নামে এক স্কুলছাত্রের প্রধানমন্ত্রী ডিফেনবেকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে লেখা চিঠি। ছবি: সিবিসি
ফলে কানাডারশিপিং এক্ট আইন দ্বারা স্যাবল দ্বীপের ঘোড়া, দ্বীপ থেকে যেকোনো কারণে অপসারণ করা আইনত নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এই সিদ্ধান্তে স্কুলছাত্ররা অত্যন্ত আনন্দিত হয় এবং প্রধানমন্ত্রী ডিফেনবেকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে চিঠি লেখে।
প্রাকৃতিকভাবেই স্যাবল দ্বীপে মানুষের পক্ষে বসবাস করা সম্ভব নয়। এখানে শীতকালে তুষারঝড়ের কারণে সুপেয় পানির প্রচন্ড অভাব দেখা দেয়। একারণেও অনেক ঘোড়া শীতকালে মারা যায়।
সাসকাচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান বিষয়ের অধ্যাপক ফিলিপ ম্যাকলাফলিন তার প্রবন্ধ মিস্টেরিয়াস স্যাবলে বলেন, শীতকালে প্রচন্ড তুষারঝড়ের কবলে পড়ে অনেক ঘোড়া মারা যায়। বিশেষ করে শারীরিকভাবে দুর্বল ঘোড়াগুলো প্রচন্ড শীত উপেক্ষা করে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারে না। তাছাড়া ঘোড়াগুলোকে পানি পান করার জন্য দ্বীপের পূর্বদিকে বালি খুঁড়ে কুয়া বানাতে হয়। সেখান থেকেই তারা সাধারণত শীতকালে পানি পান করে।
স্যাবল আইল্যান্ডের আকৃতিও খুব অদ্ভুত। ওপর থেকে দেখতে দ্বীপটিকে বাঁকা চাঁদের মতো দেখায়। স্যাবল আইল্যান্ডকে আটলান্টিকের কবরস্থান বলা হয়। কারণ এই দ্বীপে প্রচুর জাহাজের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের এ অংশ সারাবছরই বেশ উত্তাল থাকে।
এখানকার সাগরে ঘনকুয়াশা একটি নিয়মিত ব্যাপার। এরকম নানা কারণে এদিকে দিয়ে যাতায়াতকারী সমুদ্রগামী জাহাজগুলো প্রায়ই বিপদে পড়তো। এ দ্বীপের চারদিকে ৩৫টিরও বেশি জাহাজের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গিয়েছে। এখানে সর্বশেষ জাহাজ ধ্বংস হয়েছিল ১৯৯৯ সালে।
বর্তমানে উন্নত নেভিগেশন প্রযুক্তির কারণে এখানে জাহাজ ধ্বংসের খবর খুব একটা পাওয়া যায় না। স্যাবল দ্বীপে ধ্বংস হওয়া জাহাজগুলোকেই এ দ্বীপের ঘোড়ার উৎস বলে মনে করেন অনেকেই। যেসব জাহাজ এখানে এসে ধ্বংস হয়েছে, সেসব ধ্বংসপ্রাপ্ত কোনো জাহাজ থেকে পালিয়ে হয়তো প্রাণে বাঁচতেই ঘোড়াগুলো এ দ্বীপে আশ্রয় নিয়েছিল।
অসাধারণ সুন্দর এ দ্বীপটি কানাডার ৪৩তম জাতীয় উদ্যান হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। শীতকালে এই দ্বীপটি দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ থাকে। শুধুমাত্র ২০১৪ সালের শীতকালে একবার এ উদ্যান ভ্রমণপিপাসুদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছিল।
এ দ্বীপটি ঘোড়ার পাশাপাশি অন্যান্য জীববৈচিত্র্যেও ভরপুর। স্যাবল দ্বীপ পাখিপ্রেমীদের জন্য স্বর্গের মতো। এ দ্বীপে প্রায় ৩৫০ প্রজাতির পাখি দেখা যায়। এছাড়া এ দ্বীপ সবচেয়ে বেশী ধূসর সীলের প্রজনন কেন্দ্র।
স্যাবল দ্বীপের ঘোড়াগুলো কোনো যত্ন কিংবা রোগপ্রতিরোধী এন্টিবায়োটিক না পেয়েও কীভাবে এত বছর ধরে টিকে আছে তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের আগ্রহের কমতি নেই। স্যাবল দ্বীপে থাকা অসংখ্য প্রজাতির পাখি নাকি অন্য কিছু ঘোড়াগুলোর দেহে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরিতে সাহায্য করছে তা নিয়ে রয়েছে নানান জল্পনা-কল্পনা। তবে রহস্য যাই হোক না কেন, স্যাবল আইল্যান্ডের ঘোড়াগুলো যেন বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পায় তাই কাম্য।
মোঃ ওমর ফারুক তপু বর্তমানে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে যন্ত্রকৌশল বিভাগে পড়াশোনা করছেন।
jafinhasan03@gmail.com