Loading...

স্বাস্থ্যসেবা খাত জয়ের যুদ্ধে নেমেছে মার্কিন প্রযুক্তি দানবরা

| Updated: September 23, 2021 17:49:44


স্বাস্থ্যসেবা খাত জয়ের যুদ্ধে নেমেছে মার্কিন প্রযুক্তি দানবরা

আটপৌরে কাজে স্বর-সেবক বা ভয়েস অ্যাসিসটেন্সের ব্যবহার নিত্যদিনের ছক হয়ে উঠেছে। ‘গানটা বাজাও,’ বা ‘পাস্তা রান্নার জন্য ১১ মিনিট সময় বেঁধে দাও’ এর – মতো লাখো লাখো মানুষের হুকুম তামিল করছে স্বর-সেবক। হিউস্টন মেথোডিস্ট হাসপাতালও নিচ্ছে স্বর-সেবকের সেবা। ছক বাঁধা হুকুম দিচ্ছে না। বরং বলা হচ্ছে: “এবারে অস্ত্রোপচার শুরু করুন।”

অ্যালেক্সাতে যে প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, এখানেও একই প্রযুক্তির আশ্রয় নিয়েছে অ্যামাজন। এ সংস্থার ক্লাউড বিভাগ অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসের সহায়তায় গত বছর ধরে আট হাসপাতালের মধ্যে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে। স্বর-চালিত বা ভয়েস অ্যাকটিভেটেড ব্যবস্থার মাধ্যমে এ সব হাসপাতালে পরীক্ষামূলক অস্ত্রোপচার কক্ষ বা অপারেশন থিয়েটার গড়ে তোলে অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিস নেটওয়ার্ক। “এবারে অস্ত্রোপচার শুরু করুন”- নির্দেশ দেওয়ার ফলে শল্য-চিকিৎসক বা সার্জন অস্ত্রোপচারের জন্য অত্যাবশ্যকীয় কাজ করা, যেমন রোগীকে অজ্ঞান করার জন্য ওষুধ দেওয়া হচ্ছে কিনা তা মৌখিক ভাবে জানানো।

“এ রকম অত্যাবশ্যকীয় কাজ করার জন্য আমার স্বরকে ব্যবহার করা হচ্ছে। কাজেই অস্ত্রোপচারের জন্য অত্যাবশ্যকীয় কোনো পর্ব বা ধাপ বাদ পড়ার আর কোনো আশঙ্কাই নেই।”

হিউস্টন মেথডিস্ট হাসপাতালের গোড়ালি এবং পা সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ শল্য-চিকিৎসক এবং প্রধান তথ্য কর্তা ডা. নিকোলাস দেশাই এরকমটাই বললেন। তিনি আরো বলেন, “কাজ শেষ হলে তা ইলেকট্রনিক ডিজিটাল রেকর্ডে সম্পন্ন করা হয়েছে বলে লিখে রাখে সেবক। কাজেই কোনো কিছু বাদ পড়লে বা কোনো সমস্যা দেখা দিলে সাথে সাথেই জানিয়ে দেওয়া যায়।”

হাসপাতালের পরামর্শ কক্ষে চিকিৎসক ও রোগীর মধ্যে আলাপ শুনতে কান পেতে রাখে অ্যামাজনের এ প্রযুক্তি। অবশ্যই এ জন্য আগে থেকেই রোগীর কাছ থেকে যথাযথ অনুমোদন নেওয়া হয়। চিকিৎসক-রোগী আলাপচারিতা থেকে স্বাস্থ্য-রেকর্ডে যোগ করার মতো তথ্য পাওয়া যায় কিনা তা খতিয়ে দেখা হয়। এর ভিত্তিতেই রোগীর চিকিৎসায় আর কী কী করা যাবে তাও বিশ্লেষণ করা হবে। ডা. দেশাই বলেন, “আমার ডিজিটাল স্বর-সেবক রোগীর সঙ্গে আলাপচারিতা শোনে, প্রয়োজনে অংশ নেয়। রোগী-সেবার তৎপরতার ব্যবস্থাপনা করে।” তিনি একে “দ্বিতীয় আরেক জোড়া কান” হিসেবে উল্লেখ করেন। চিকিৎসককে কম্পিউটারের বোতাম চেপে তথ্য ঢোকানোর বদলে আলাপে সময় দেওয়ায় রোগীর সামগ্রিক যত্ন আরো ভালো হয় বলেও জানান তিনি।

বিপণন জগতের অন্যান্য ক্ষেত্রকে একচ্ছত্র আধিপত্যের ছাতার তলায় এনেছে অ্যামাজন। সমানভাবেই স্বাস্থ্যসেবা খাতকেও নিজ আধিপত্যের আওতায় নেওয়ার নীল-নকশাই এ ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে। স্বাস্থ্য সেবাখাতে আরো আধুনিকায়নের ভিত্তি হিসেবে তৈরি হচ্ছে এ সব  সরঞ্জাম এবং মঞ্চ। অ্যামাজন ভোক্তার জন্য ডালা ভরে আনছে স্বাস্থ্যসেবার নানা উপায়-উপকরণ। ধীরে ধীরে এ সব প্রকাশ করা হচ্ছে এবং এর মধ্যে রয়েছে অনলাইন ফার্মেসি এবং টেলিহেলথের মতো সেবা। পাশাপাশি অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসের সহায়তায় স্বাস্থ্যসেবা খাতে নিজ সক্ষমতা দিনে দিনে বাড়িয়ে চলেছে অ্যামাজন। নতুন একটি অপারেটিং সিস্টেম তৈরির লক্ষ্য সামনে রেখে এ ক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবার রেকর্ড সংরক্ষণের সাথেই এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করে আরো কিছু করতে চাইছে। এর মধ্যে কোনো ব্যক্তি বা অ্যামাজনের ভোক্তা কখন অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন তারও পূর্বাভাস  দেওয়ার চেষ্টাও রয়েছে। এ কাজেও নিশ্চিতভাবেই এআই-র সহায়তা নেওয়া হবে।

অ্যামাজনের স্বাস্থ্যসেবা খাতকে অনেককাল ধরেই ঘুমন্ত দৈত্য হিসেবে মনে করা হতো। এখন এ দৈত্যের ঘুম ভাঙছে। বিস্ময়করভাবে বিপুল সংখ্যক ভোক্তার কথা মাথায় রেখে নেমেছে অ্যামাজন। সরাসরি ভোক্তার কাছে স্বাস্থ্যসেবা বিক্রি করছে। স্বাস্থ্যসেবা বিক্রি করছে খরচের চাপে দিশেহারা, হতাশ কর্মীদের কাছে। অ্যামাজনের বিক্রির তালিকায় রয়েছে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার সাথে সরাসরি জড়িত স্বাস্থ্য নেটওয়ার্ক এবং হাসপাতাল।

ভোক্তা সরাসরি চিকিৎসকের কাছে বা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে যাচ্ছেন এবং ভরসার সাথে সেখান থেকে সেবা ব্যবহার করছেন। এর বদলে ভোক্তাকে অনলাইন সেবায় উদ্বুদ্ধ করে তোলা এবং সে সেবা নিতে টেনে আনাই হবে অ্যামাজনের কৌশল।

তবে, আর যাই থাক চিকিৎসা-বাণিজ্যের এ জগতে প্রতিযোগীর ঘাটতি নেই। গুগোল, মাইক্রোসফটের মতো প্রযুক্তি জগতের দানবরা রয়েছে। রয়েছে তাদের ক্লাউড এবং এআই-দের লোভনীয় প্রস্তাব। এছাড়া, ওয়ালমার্টের মতো পরিচিত শত্রুও রয়েছে। খুচরা বিক্রিতে সিদ্ধহস্ত এবং বিশাল বাজার নিয়ন্ত্রণকারী এই প্রতিষ্ঠান স্বাস্থ্যসেবা খাতে প্রায় কাছা বেঁধেই নেমেছে। গোটা আমেরিকা জুড়ে জরুরি সেবা, পরীক্ষাগার, এক্স-রে এবং রোগ নির্ণয়, পরামর্শ কেন্দ্র, দাঁতের চিকিৎসা, চোখ ও কানের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র খুলেছে ওয়ালমার্ট।

ওয়ালমার্টের একটি স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্র

রাজনৈতিক দিগন্তে অ্যামাজনের শক্তি নিয়ে ভীতি ক্রমেই বাড়ছে। এ ছাড়া, প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজস সরে দাঁড়ানোর পর অ্যামাজনের প্রধান নির্বাহীর পদে নিয়ে আসা হয়েছে অ্যান্ডি জ্যাসিকে। প্রতিযোগিতার  তীব্র স্রোত কেটে অ্যামাজন যদি সঠিকভাবে এগিয়ে যেতে পারে তা হলে স্বাস্থ্যসেবা খাতের বিশাল সুযোগের নাগাল পাবে।

জেফরি গ্রুপের অন্যতম বিশ্লেষক ব্রেন্ট থিল বলেন, রাতারাতিই সাফল্য পাওয়ার দরকার হয়তো নেই কিন্তু যদি ঠিক মতো এগোতে পারে তবে স্বাস্থ্যসেবা খাতে অন্যদের তীব্র প্রতিযোগিতায় ফেলতে পারবে অ্যামাজন।

বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানির প্রাণান্ত প্রচেষ্টা: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্বাস্থ্যসেবার খরচ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। মার্কিন সেন্টারস ফর মেডিকেয়ার অ্যান্ড মেডিকেইড সার্ভিসেস (সিএসএম) এর পূর্বাভাসে বলা হয়েছে ২০২১ সালে স্বাস্থ্যসেবা খাতে দেশটির ব্যয় ৪.২ ট্রিলিয়ন ডলার বা চার লাখ কোটি ডলার স্পর্শ করবে। অর্থাৎ দেশটির জিডিপির ১৮ শতাংশই হবে এ খাতের ব্যয়। ২০২৫ সালের মধ্যে এ ব্যয় পাঁচ লাখ কোটি ডলারে গিয়ে ঠেকবে। স্বাস্থ্য ব্যয়ের বোঝার বেশির ভাগই নিয়োগ দাতাদের বহন করতে হয়। কায়সার ফ্যামিলি ফাউন্ডেশনের এক জরিপে নির্বাহীদের সিংহভাগ, ৮৭ শতাংশ, স্বাস্থ্যসেবা খাতের ব্যয় নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তাঁরা বলেন, আগামী পাঁচ থেকে ১০ বছরের মধ্যে এ ব্যয় সামাল দেওয়া যাবে না।

আশার কথা হলো, একই সাথে প্রযুক্তিতে নয়া প্রবণতার উন্মেষ ঘটছে। মার্কিন স্বাস্থ্যের ওপর নজরদারিতে নিয়োজিত যন্ত্রপাতি আরো চৌকস হয়ে উঠছে। বাড়ছে এগুলোর ব্যবহারও। সস্তা এবং উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কল্যাণে দূর থেকে স্বাস্থ্যসেবা বা দূর-সেবা সম্ভব হয়ে উঠছে। কেবল তাই না, এ ধরণের সেবাকে অগ্রাধিকারও দেওয়া হচ্ছে।  বিপুল পরিমাণে উপাত্ত নিয়ে কাজ করতে সক্ষম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নতুন নতুন চিকিৎসা এবং সেবা সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় পরিকল্পনার পথ খুলে দিচ্ছে।

বিগ টেক বা প্রকাণ্ড প্রযুক্তি নামে পরিচিত গুগোল, মাইক্রোসফট, অ্যাপেল, ফেসবুক, অ্যামাজনের মতো কোম্পানিগুলো মনে করে বিস্ময়কর এক নতুন প্রবণতার সন্ধিক্ষণে বসে আছে তারা। বাণিজ্য বিশ্লেষণের ব্যবসায় জড়িত বেসরকারি কোম্পানি সিবি ইনসাইটস জানায়, স্বাস্থ্যসেবা খাতে ২০২০ সালে ফেসবুক, অ্যামাজন, মাইক্রোসফট, গুগোল এবং অ্যাপেলের মোট বিনিয়োগ ৩৭০ কোটি ডলার। চলতি বছরের মাঝামাঝি আরো ৩১০ কোটি ডলার এ খাতে ঢালা হবে।

অন্যান্যদের সাথে অ্যামাজনের পার্থক্য রেখাও খুবই স্পষ্ট। আর এ দিকটাই নজর টেনেছে ডা. দেশাইয়ের মতো ব্যক্তিদের। তিনি বলেন, “অ্যামাজন প্রায় নিজস্ব স্বাস্থ্যসেবা চালু করতে যাচ্ছে। এ লক্ষ অর্জনে নিজের বর্তমান অবকাঠামো ব্যবহার করবে অ্যামাজন যা মোটেও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। গোটা অ্যামেরিকা জুড়ে রয়েছে অ্যামাজনের গুদাম। রয়েছে মালামাল ভোক্তার ঘরে পৌঁছে দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত জনশক্তি। পাশাপাশি অনলাইন বিপণনের ক্ষেত্রে যা করেছে একই ঘটনাও স্বাস্থ্যসেবা খাতে ঘটাতে চাচ্ছে অ্যামাজন।”

উঁচু-প্রযুক্তির সেবা ব্যবস্থাকে কীভাবে কাজে খাটানো যাবে সে কথা তুলে ধরেন ডা. দেশাই। তিনি বলেন, “ওষুধ পৌঁছে দেওয়ার মতো বিতরণ ব্যবস্থায় সমৃদ্ধ আমাজন। অ্যামাজনের হাতে রয়েছে প্রাইম এবং এর মাধ্যমে অনতিবিলম্বে ওষুধ সরবরাহ করা যাবে। অ্যালেক্সার স্বর-চালিত বা ভয়েস ড্রাইভেন পদ্ধতিতে রোগীর সাথে দেখা-সাক্ষাতের সময় ঠিক করা যাবে। রোগীকে ডাক্তারের সাথে সরাসরি, মৌখিক বা ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে সাক্ষাত করিয়ে দেওয়া যাবে।”

[ফাইনান্সিয়াল টাইমস থেকে বাংলা রূপান্তর সৈয়দ মূসা রেজা]

Share if you like

Filter By Topic