স্বাস্থ্যসেবা খাতে অ্যামাজনের উত্থান


এফই অনলাইন ডেস্ক | Published: September 23, 2021 11:40:01 | Updated: September 26, 2021 16:46:44


স্বাস্থ্যসেবা খাতে অ্যামাজনের উত্থান

মার্কিন স্বাস্থ্যসেবা খাত বিপুল সম্ভাবনাময়। তারপরও এ খাতে নামতে যেয়ে কয়েক দফা ব্যর্থ হয়েছে অ্যামাজন। এ বাবদ সংবাদ শিরোনাম হওয়ার মতো এক পরিস্থিতির উদয় হয়েছিল ২০১৮ সালে। জেপি মর্গ্যান এবং বার্কশায়ার হিথওয়ের সাথে একযোগে স্বাস্থ্যসেবার সূচনা করে। হেইভেন (নিরাপদাবাস) নামের এ স্বাস্থ্যসেবার উদ্দেশ্য ছিল এই তিন সংস্থার কর্মীদের স্বাস্থ্য-খরচ কমানো এবং সেবার মান বাড়ানো।

ঘোষণা দেওয়ার পরপরই প্রতিদ্বন্দ্বী স্বাস্থ্যসেবা সংস্থাগুলো শেয়ার দর নামতে থাকে। ওয়ালগ্রিনস বুটস অ্যালিয়েন্সের মতো কোম্পানিগুলোর শেয়ার দর পতনে শত শত কোটি ডলার উবে যায়। তবে এটি সময়োচিত ছিল না। যথেষ্ট ভেবে চিন্তে এ কাজে অগ্রসর হয়নি। ফলে হেইভেন সঠিক ভাবে পাখা মেলতে পারল না। শুরু হওয়ার তিন বছর বাদে জানুয়ারি মাসে হেইভেন-কে বন্ধ করে দেওয়া হলো। তিন কোম্পানি জানাল, কর্মীদের স্বাস্থ্যসেবা খাতে অগ্রগতি হয়েছে। আর এ বিষয়ে তাদের অনানুষ্ঠানিক আলাপ-আলোচনা অব্যাহত থাকবে।

বহিরাগতরা এ ঘটনা ময়না তদন্ত শেষে সিদ্ধান্তে পৌঁছালো যে, তিন কোম্পানির যৌথ প্রয়াস সত্ত্বেও মার্কিন মুল্লুকের প্রতিষ্ঠিত স্বাস্থ্যসেবা খাতকে টলানো যায়নি। সস্তায় স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার পথে তাদের টেনে আনা সম্ভব হয়নি।

ভিন্ন আরেক ইঙ্গিতও দিলো হেইভেন-য়ের অকাল সমাপ্তি। অ্যামাজন এককভাবেই নিজ কর্মীদের স্বাস্থ্যসেবা খরচ কমানোর লক্ষ্য হাসিলে প্রস্তুত এবং সক্ষম। শুধু আমেরিকাতেই অ্যামাজনের রয়েছে ১০ লাখ কর্মী। তাই খোদ অ্যামাজনেরই এ খাতে বড় ধরণের পদক্ষেপ নেওয়ার বিস্তর সুযোগ রয়েছে। এ ধরণের একটি হলো, ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক ক্রসওভার হেলথের সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ে অংশিদারিত্ব। এর আওতায় অ্যামাজনের কর্মী, তাদের জীবন সঙ্গী ও তাদের সন্তানদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হলো। বর্তমানে মাত্র পাঁচ অঞ্চলে এই সেবা পাওয়া যাচ্ছে তবে দ্রুতই আরো অঞ্চলে এটি পাওয়ার ঘোষণা দেওয়া হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

২০১৮ সালে বাজারে আরেক দফা ঝড় তুলেছিল অ্যামাজন। সেবার, নিউ হ্যাম্পশায়ারের পিলপ্যাককে নিয়ে নেয় অ্যামাজন। পিলপ্যাক হলো ডাকযোগে ব্যবস্থাপত্রের ওষুধ সরবরাহের ব্যবসায় নিয়োজিত। কিন্তু পিলপ্যাককে নিয়ে কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করল না অ্যামাজন। বরং প্রায় পুরোই স্বতন্ত্র ভাবে ব্যবসা করতে দিলে একে। তবে, গত বছরের শেষার্ধে সবার প্রত্যাশিত পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত নিলো অ্যামাজন। শুরু করল অ্যামাজন ফার্মেসি। প্রচলিত পদ্ধতিতে ওষুধ বিতরণ এবং মূল্যছাড় দেওয়ার পুরাদস্তুর ব্যবসায় নামল এ সংস্থা।

চলতি বছরের জুলাইয়ে অ্যামাজন চালু করে অ্যামাজন ডিএক্স। ঘরে বসে কোভিড-১৯ পরীক্ষার সেবা এর মাধ্যমে দেওয়া হয়। অ্যামাজন ডট কম থেকে পরীক্ষার কিট বা সরঞ্জাম কিনে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয় এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই পরীক্ষার ফল জানিয়ে দেওয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে একটি নতুন সেবার সূচনা করা হলো।

অ্যামাজনের একটি চাকরির বিজ্ঞপ্তির সূত্র ধরে অনুমান করা হচ্ছে যে আগামী দিনগুলোতে আরো নানা পরীক্ষার প্রক্রিয়া চালুর অভিলাষ রয়েছে অ্যামাজনের। সম্প্রতি অ্যামাজনের এক চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছ, প্রার্থীর নিদানিক রোগনির্ণয় বা ক্লিনিক্যাল ডায়াগনোস্টিকসের ক্ষেত্রে স্থানীয়, রাজ্য বা জাতীয় পর্যায়ে দ্ব্যর্থক বা নতুন নতুন কার্যদিগন্তে কাজ করার দক্ষতা এবং জ্ঞান থাকতে হবে।

অ্যামাজনের এ তৎপরতার মধ্যে পরিচিত ছককেই দেখতে পাচ্ছেন বিশ্লেষকরা। তাঁরা বলেন, গুদাম-কর্মীদের কোভিড-পরীক্ষা করার সমস্যাগুলো সামাল দেওয়ার মতো সমাধান প্রথমে বের করছে অ্যামাজন। তারপর একই প্রক্রিয়া অন্যদের বেলায়ও খাটানো হবে। অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিস (এডব্লিউএস)এর ক্ষেত্রেও ঠিক এই ঘটেছে। এডব্লিউএসের যাত্রা শুরু হয়েছিল অ্যামাজনের অবকাঠামোকে কম্পিউটার শক্তি যোগানোর অভ্যন্তরীণ লক্ষ্য নিয়ে। একই ভাবে অ্যামাজন পরিচালিত স্বাস্থ্যসেবা ধীরে ধীরে সবার জন্য খুলে দেওয়া হবে।

সিবি ইনসাইটসের স্বাস্থ্যসেবা খাতের প্রধান বিশ্লেষক জেফ বেকার বলেন, অনেক বড় বড় নিয়োগকারী চিকিৎসা ব্যয় উল্লেখযোগ্য ভাবে কমিয়ে আনতে উদগ্রীব হয়ে আছে। এই নিয়োগকারীরা স্ব-অর্থায়নে চলছে। তিনি আরো বলেন, অ্যামাজন যদি ঠিক রাস্তায় এগোতে পারে তাহলে লোভনীয় অনেক ব্যবসা তাদের হাতে এসে যাবে। হালে অ্যামাজন দ্রুত সে পথ ধরেই চলছে।

মার্চ মাসে অ্যামাজন ঘোষণা দেয় যে তাদের টেলিহেলথ বা দূর-সেবার পণ্য অ্যামাজন কেয়ার গোটা আমেরিকার কোম্পানিরা ব্যবহার করতে পারবে। এই সেবার মাধ্যমে দিনরাত ২৪ ঘণ্টাই চিকিৎসক বা নার্সের সাথে ভিডিওতে কথা বলা যাবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোথাও কোথাও এ সেবার আওতায় রোগী সরাসরি ডাক্তারের সঙ্গে দেখা সাক্ষাতও করতে পারবে। পাইলট প্রকল্পের আওতায় ২০১৯ সাল থেকে অ্যামাজনের সিয়াটল সদর দফতরের কর্মীরা এ সেবা ব্যবহার করতে পারেন। কেয়ার মেডিক্যাল নামের তৃতীয় পক্ষীয় ঠিকাদারের মাধ্যমে এই সেবা ব্যবস্থা চালানো হয়।

অ্যামাজন কেয়ার ব্যবহারের জন্য একাধিক কোম্পানি চুক্তি সই করেছে বলে অ্যামাজন জানায়। বিজনেস ইনসাইডারের জুলাইয়ের খবরে বলা হয়েছে, আরো কোটি কোটি রোগীর সুবিধা করে দিতে বড় বড় বিমা কোম্পানির সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করছে অ্যামাজন। কিন্তু অ্যামাজন বলছে, তাদের পরিকল্পনা নিয়ে যে জল্পনা-কল্পনা চলছে সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করবে না।

মার্কিন স্বাস্থ্য খাতে অ্যামাজনের অভিলাষ নিয়ে জুনে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সঙ্গে কথা বলেন এ সংস্থার নির্বাহী বাবাক পারভিজ। তিনি বলেন, আমরা বিনয়ের সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলতে চাই। সত্যি বলতে কি, এখনো আমরা অনেক কিছুই জানি না। তবে আমরা আশাবাদীও। কারণ আমরা ভালো কিছু করতে চাচ্ছি।

স্বা্স্থ্যসেবা খাতে নামার জন্য এটাই আদর্শ সময়। পরামর্শক সংস্থা ম্যাককিনসে বলছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে, বিশ্বমারি-পূর্ব সময়ের তুলনায় দূর-সেবা ৩৮ গুণ বেশি ব্যবহার করা হয়েছে। এ ছাড়া ইন্টারনেট সংযোগের মাধ্যমে কি কি ধরণের স্বাস্থ্যসেবা নেয়া যাবে সে সংক্রান্ত বিধি-বিধানও শিথিল করা হয়েছে।

ফোররিস্টারের প্রধান বিশ্লেষক আরিলি রাজসিনস্কি বলেন, স্বাস্থ্যসেবা শিল্পকে ঘাবড়ে দেবে অ্যামাজন। ভোক্তাদের সঙ্গে যখন-তখন এবং তাদের প্রয়োজন মেটানোর জন্য মিলিত হওয়ার মতো নমনীয়তা অ্যামাজনের আছে।

এদিকে শিকাগোভিত্তিক স্বাস্থ্য প্রযুক্তি কোম্পানি ট্রান্সকারেন্টের প্রধান নির্বাহী গ্লিন টুলম্যান বলেন, মার্কিন স্বাস্থ্যসেবা খাতের জটিলতায় দেশটির মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে। এ খাতকে যদি অ্যামাজনীকরণ করা হয় তবে তাকে স্বাগত জানাবে জনগণ। এর আগে টুলম্যান স্বাস্থ্যসেবার কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি নির্মাণের কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। স্বর-চালিত রক্তচাপ নজরদারির যন্ত্রসহ অনেক কিছুই এ কোম্পানি তৈরি করেছে। তাদের এ সব কাজের অংশিদার হয়েছে অ্যামাজন।

তিনি বলেন, গত ২০ বছর ধরে মার্কিন জনগণকে স্বাস্থ্য শিল্প বলছে যে স্বাস্থ্যসেবা খাতের সংশয় কমিয়ে আনা হবে, জটিলতা কমিয়ে আনা হবে, কমিয়ে আনা হবে খরচও কিন্তু তার কিছুই হয়নি।

অ্যামাজনের নিজের কোনো হাসপাতাল নেই। নেই কোনো স্বাস্থ্যসেবার কাঠামো- এ কারণে স্বাস্থ্যসেবা খাতে তারা নয়া পদক্ষেপ নিতে পারবে। তারা বলতে পারবে, আপনার জন্য যা ভালো আমরা তাই করবোএ ছাড়া, মুনাফা করার মতো স্বাস্থ্যখাতে বিপুল অর্থও রয়েছে।

[ফাইনান্সিয়াল টাইমস থেকে বাংলা রূপান্তর করেছেন সৈয়দ মূসা রেজা]

আরো পড়ুন: স্বাস্থ্যসেবা খাত জয়ের যুদ্ধে নেমেছে মার্কিন প্রযুক্তি দানবরা

Share if you like