Loading...
The Financial Express

সুইজারল্যান্ডে স্বেচ্ছামৃত্যুর যন্ত্র আইনি অনুমোদন পেল

| Updated: December 09, 2021 21:23:16


সুইজারল্যান্ডে স্বেচ্ছামৃত্যুর যন্ত্র আইনি অনুমোদন পেল

মানবজীবনের শেষ গন্তব্য মৃত্যু। আর এই মৃত্যু নিয়ে মানুষের জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই কোনো। বহু বছর আগে ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলীতে রবি ঠাকুর বলে গেছে, “মরণ রে তুহু মম শ্যাম সমান।” মৃত্যু নিয়ে ভয়ের পাশাপাশি রয়েছে এমন আবেগীয় আতিশয্যের দৃষ্টান্তও। কখনো ‘অকালমৃত্যু’র মতো শব্দ এসে জীবনকে মাঝপথেই থামিয়ে দেয়, তো কখনো পথ ফুরোলেও চলতেই থাকে জীবনের গাড়ি। কখন পথ ফুরিয়েছে, আর কখন ফুরায়নি- এটি অবশ্য সবসময়ই ব্যক্তি ও পরিস্থিতিভেদে ভিন্ন। তবে যদি কোনো ব্যক্তির যদি নিশ্চিতভাবে সে পথ ফুরিয়ে থাকে, তখনও মৃত্যু না এলে কী করার থাকে?

এই অদ্ভুত প্রশ্নটির উত্তর হয়েই এসেছে একটি শব্দ- ইউথেনেসিয়া বা স্বেচ্ছামৃত্যু।

প্রচলিত অর্থে ‘আত্মহত্যা’শব্দটির সাথে স্বেচ্ছামৃত্যুকে গুলিয়ে ফেলা খুবই স্বাভাবিক। তবে দুটোর মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক। স্বেচ্ছামৃত্যু বা ইউথেনেসিয়া এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ বা নিজের যত্ন নিতে অক্ষম ব্যক্তিকে যন্ত্রনাহীন মৃত্যুতে সাহায্য করা হয়।

কানুনের নজরে

বলিউডের ‘গুজারিশ’সিনেমাটির মূল উপজীব্য বিষয় ছিল এটি। সিনেমার মূল চরিত্র ছিলেন এমন একজন ব্যক্তি, যিনি দীর্ঘদিন ধরে অবশ অবস্থায় হুইলচেয়ারে আছেন। তাকে বারবার আদালতে যেতে দেখা যায় এই স্বেচ্ছামৃত্যুর অনুমোদনের জন্য, তবে প্রতিবারই তিনি ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসেন। সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডে একটি যন্ত্রকে আইনি অনুমোদন দেয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে এ ধরনের ব্যক্তিদের যন্ত্রণাহীন মৃত্যুর পথে যেতে সাহায্য করা হবে। যন্ত্রটির নাম ‘সার্কো’।

সার্কো সম্পর্কে

‘ডক্টর ডেথ’নামে খ্যাত গবেষক ফিলিপ নিটশকে ২০১৭ সালে এই যন্ত্রটি তৈরি করেন। তিনি একজন ইউথেনেসিয়া ক্যাম্পেইনার। তার মতে, ভীতি বা দমবন্ধ হয়ে যাবার মতো কষ্টকর কোনো অনুভূতিই পাবেন এই যন্ত্রের ব্যবহারকারী- এতটাই ‘আরামদায়ক’মৃত্যু দেবে সার্কো।

ইংরেজি শব্দ ‘‘সার্কোফ্যাগাস’-এর সংক্ষিপ্ত রূপ ‘সার্কো’এর বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘শবাধার’। নামের সাথে মিল রেখে এই যন্ত্রটি নকশাতেও বেশ মনোযোগ দেয়া হয়েছে। দেখতে কফিনের মতো এই যন্ত্রে চোখের পলকেই শেষ যাত্রা সম্ভব হবে দীর্ঘদিন ধরে মৃত্যুর দিকে চেয়ে থাকা শারীরিকভাবে অসুস্থ বা অক্ষম ব্যক্তিদের। মৃত্যুতে সময় লাগবে এক মিনিটেরও কম।

যন্ত্রটির সাহায্যে মূলত হাইপোক্সিয়া এবং হাইপোক্যাপনিয়া নামক দুটো প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করা হয়। মানবদেহের টিস্যুতে অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি ও রক্তের মধ্যে কার্বন ডাইঅক্সাইডের মাত্রা অতিরিক্ত কমিয়ে দেয়া হয়।

বিতর্কের শোরগোল

এই লেখার শুরুতে যে প্রশ্নের জন্ম হয়েছিল, তাতে ঘুরপাক খাচ্ছেন অনেকেই। কারো জীবনের পথ ফুরিয়েছে কি ফুরায়নি, তা নির্ধারণের মাপকাঠি কী? অনেকে বলছেন, এ যেন আত্মহত্যাকেই অনেক বেশি মহান বানানো হচ্ছে। ভ্রু কুঁচকানো চলমান আছে যন্ত্রটির কার্যপদ্ধতি নিয়েও। যন্ত্রটিতে থাকা ক্যাপসুলে অক্সিজেন সরিয়ে দিয়ে জায়গা করে নেয় নাইট্রোজেন গ্যাস। এর মাধ্যমেই ব্যক্তির মৃত্যু হয়। কেউ কেউ একে তাই ‘গ্যাস চেম্বার’-এর সাথে তুলনা করেছেন। তবে এত কথার পরও অনেক দেশেই আইনিভাবে এ পদ্ধতি অনুমোদন পেয়েছে। চিকিৎসক বা রোগী- উভয় পক্ষের অনুরোধে সেসব দেশে স্বেচ্ছামৃত্যুকে সীমিত পরিসরে সমাধান হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

ভালো-মন্দ বা ঠিক-ভুলকে যতই আমরা সাদাকালোয় মাপতে চাই না কেন, জীবনের বাস্তবিকতায় হোঁচট খেয়ে এই সংজ্ঞাগুলো প্রায়ই ধূসর সীমানায় আশ্রয় খোঁজে। ইউথেনেসিয়া বা স্বেচ্ছামৃত্যুও তেমনই এক ধূসর ভাবনার জন্ম দেয়। কারো কাছে ভীষণ প্রয়োজন এই পদ্ধতিটি অন্য কারো কাছে হতে পারে অন্যায়ের উদাহরণ। কেউ একে দেখতে পারেন অন্যতম সমাধান হিসেবে, তো কারো কাছে এটিই বিশাল এক সমস্যা। তবে বিভিন্ন স্থানে আইনি অনুমোদন পাবার পর এই যন্ত্র বা ইউথেনেসিয়ার পুরো ধারণাটিই কতদূর এগিয়ে যায়, তা উসকে দেয় বহু ভাবনা।

অনিন্দিতা চৌধুরী বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী।

anindetamonti3@gmai.com

Share if you like

Filter By Topic