সিলেট থেকে ফিরে


নাফিসা ইসলাম মেঘা | Published: March 22, 2022 13:40:07 | Updated: March 22, 2022 19:14:43


- লালাখালে লেখকের নৌকা ভ্রমণের একটি ছবি

এই লেখাটি যখন শুরু করছি তার কিছুক্ষণ আগেই সিলেট থেকে ট্রেনে উঠেছি ঢাকায় বাড়ি ফেরার উদ্দেশ্যে। লাউয়াছড়ার ঘন বনের মধ্যে দিয়ে ট্রেন চলছে ঝুমঝুম শব্দ করে। কী অসাধারণ অনুভূতি। জানালা দিয়ে গহীন বন-জঙ্গল দেখছি কিছু সময়, আবার মন দিচ্ছি লেখায়।

ঢাকা থেকে রাতের বাসে চড়ে বৃহস্পতিবার সকালে গিয়ে পৌছাই সিলেটে। সকালে নাশতা করেই বেরিয়ে পড়ি সিলেটের অন্যতম আকর্ষণ লালাখাল এর উদ্দেশ্যে।

প্রথম যখন পাড় হতে লালাখালের জলধারা দেখা, তখন কোনো নদীর পানি এতো নীল হতে পারে ভাবনাতেই আসেনি। একটা ইঞ্জিনচালিত নৌকা ভাড়া করা হয় লালাখাল পুরোটা নৌকায় ঘোরার জন্য। দুইদিকে উঁচু টিলার মাঝ খান দিয়ে চলে গেছে জলধারা, আর সেই জলধারায় শুরু হলো নৌকা ভ্রমণ।

লালাখাল নামে খাল হলেও এটি আসলে নদীর অংশ। মেঘালয়ের উমগত নদীর সাথে যুক্ত সারি - গোয়াইন নদীর পানি লালাখালের মাধ্যমে সুরমা নদীতে মিলিত হয়েছে। কথিত আছে, এই সারি - গোয়াইন নদীপথেই বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা এদেশে এসেছিলেন।

আর সবচেয়ে বেশি অবাক করে লালাখাল এর স্বচ্ছ নীল পানি। জানা যায়, চেরাপুঞ্জির পাহাড় হতে গড়িয়ে আসা জলের সাথে ভেসে আসা খনিজ বিভিন্ন পদার্থ আর বালির কারণে পানি এমন নীল রং ধারণ করেছে।

তবে বর্ষাকালে নীল রং বোঝা যায়না, বসন্তকালে যাওয়ায় আসল নীল রং দেখার সৌভাগ্য হয়। ধারে উঁচু ধূসর পাড়, সব মিলিয়ে জায়গাটা ছবির মতো সুন্দর আর নৌকা ভ্রমণটাও তাই হয়ে ওঠে বেশ উপভোগ্য।

বসেছিলাম নৌকার পাটাতনে। নীল পানি এতোটাই স্বচ্ছ যে পানির নিচের বালি - পাথরও পরিষ্কার দেখা যায়। মন চাইবে এক্ষুনি পানিতে নেমে একটু সাঁতার কেটে আসতে।

পানির দুইধারে গোসলে নেমেছে স্থানীয় কিছু ছেলেমেয়ে। কিছু নৌকা চোখে পড়ে, লোকেরা নৌকায় করে খাল থেকে বালি আর পাথর আনানেওয়ায় ব্যস্ত। দেখলাম নারীরা কলস নিয়ে এসেছে পানি নিতে, খালের কাছেই তাদের ছোট কিছু ঘরবাড়ি।

লালাখালে পাথর,বালি আহরণের দৃশ্য

এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে এত পয়সা খরচ করে পর্যটকরা আসেন দূর-দূরান্ত থেকে, নীল ঝলমলে পানিতে পা ভিজিয়ে মুগ্ধ হন কতজন। অথচ এই স্থানীয়রা প্রতিদিনই এই সৌন্দর্য দেখতে দেখতে অভ্যস্ত। এই পানিতে তারা প্রতিদিনই গোসল করতে পারে। মনে হতে থাকে এমন একটা সহজ সরল জীবন পেলে খুব একটা মন্দ হতো না।

লালাখালের একটা জায়গায় এসে নৌকা থামলো। আমরা ভাবলাম ভ্রমণ হয়তো শেষ, কিন্তু তখনই সামনে আসে অসাধারণ এক দৃশ্য। নদীর নীল পানি শেষ, আর সেখানে শুরু হয়েছে সবুজাভ বাদামী পানি। পানির গভীরতা সেখানে কম।

লালাখাল জিরো পয়েন্টে পানির রং এর দৃশ্যমান পরিবর্তন

জায়গাটির নাম জিরো পয়েন্ট, সেখানে খালের বিপরীত দিক থেকে ভারতের সীমান্ত। তাই খালের মধ্যে থেকে চোখে পড়ে দূরে বিজিবির লোকজন। বেশি দূর যাওয়ার অনুমতিও নেই। ফোনের লোকেশন অন করে দেখলাম দেখলাম আমরা আছি তখন বাংলাদেশের একদম সীমান্তে।

জিরো পয়েন্টে গিয়ে দেখা গুগল ম্যাপে আমাদের অবস্থান

নৌকা থেকে যেখানে নামানো হয়, সেখানে পানি বেশ ঠান্ডা। হাঁটুর চেয়ে একটু কম উচ্চতা পর্যন্ত পানি। স্বচ্ছ পানির তলদেশে চকচক করছে বাদামী বালি আর পাথর। পানির মধ্যে সেই বালি আর পাথরে হেঁটে বেড়ালাম আমরা, ছবি তুললাম। অন্য অনেক পর্যটকের দেখা পেলাম সেখানে। তারাও নেমেছে পানিতে।

লালাখাল জিরো পয়েন্ট হতে দূরে তাকালে দেখা মেলে ভারতের চেরাপুঞ্জির পাহাড়সমূহ

লালাখাল হতে সেদিন ফিরে দুপুরের খাবার সেরে আবার যাত্রা শুরু করলাম জাফলংয়ের পথে। ভারতের মেঘালয় সীমান্ত ঘেঁষে খাসিয়া - জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত, পাহাড় আর নদীর অপূর্ব সম্মিলনের দেখা মেলে জাফলংয়ে। পাহাড়ের পাদদেশে পিয়াইন নদীর তীরে স্তরে স্তরে সাজানো প্রাকৃতিক পাথর আর ঝলমলে পানির জলধারাই জাফলং এর অন্যতম সৌন্দর্য।

জাফলংয়ে গিয়ে দেখি নামতে হবে অনেক উঁচু টিলা হতে অনেক। নামতে হয়তো কষ্ট হবে না, কিন্তু ওঠার সময় যে কষ্ট হবে তা বিবেচনা করে অনেক বয়স্ক পর্যটককে এখান থেকে ফিরে যেতে দেখা গেল।

লম্বা পথ ধরে উচু টিলা হতে অনেক সময় নিয়ে নামলাম আমরা। কিন্তু দেখি আরো দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া বাকি। সামনে ছোট বড় পাথরে আচ্ছাদিত দীর্ঘ এক ভূমি। এইসব পাথরের উপর দিয়ে হেঁটে পাড়ি দিতে হবে বহু পথ।


জাফলং এর পাথরে আচ্ছাদিত ভূমি

পাথরের উপর দিয়ে চলতে শুরু করলাম আমরা। ছোট-বড় পাথরে ভারসাম্য ধরে রাখা বেশ কষ্ট আর শ্রমসাধ্যও বটে। প্রায় আধা ঘন্টা হেঁটে অবশেষে গিয়ে পৌছালাম জাফলংয়ের জিরো পয়েন্টে। সেখানে দেখা মিললো সবুজ সব বড় বড় পাহাড়ের পাদদেশে বয়ে চলা জলধারার দৃশ্য। জলের নিচে ছোট বড় অজস্র নুড়ি আর পাথর।

শুরুতে একটু খারাপ লাগলো, ক্ষোভ হলো মানুষের প্রতি। জলের মধ্যে ভেসে বেড়াচ্ছে চিপসের প্যাকেট। জাফলং আসার পুরো পথ জুড়ে বসানো দোকান। আর পানিতে পর্যটকের উপচে পড়া ভীড়। সব মিলিয়ে প্রকৃতির সৌন্দর্যকে নিবিড়ভাবে উপভোগের সুযোগ নেই এখানে।

শুষ্ক মৌসুম হওয়ায় পানির গভীরতাও কম । নদীর ওপার হতে এপার হেঁটেই পার হওয়া যায় এমন অবস্থা। নদীর দুইধারের অনেকটা এলাকা জুড়ে ভারতের ডাউকি অঞ্চলের অবস্থান। বাংলাদেশের সীমান্ত নদীর মাঝেই শেষ, এরপর থেকে শুরু ভারতের সীমান্ত। এজন্য এই জায়গায় অনেক ভারতীয় পর্যটকরাও এসেছে। তারাও পানিতে নামছেন, নৌকা চালাচ্ছেন।

জাফলং জিরো পয়েন্ট

সীমান্তরক্ষী সেনা কর্মকর্তারা দুই দেশীয়দের মাঝে তৈরি করে দিয়েছে অদৃশ্য দেয়াল। কেউ সীমান্তের কাছে গেলেই হলেই শুনতে হচ্ছে সতর্কবাণী। তবুও দেখলাম অনেকেই সীমান্তের কাছে দৌড়ে গিয়ে ছবি তুলে ফিরছে, সেনা কর্মকর্তাদের শত নিষেধাজ্ঞার পরেও। নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি মানুষের চিরন্তন আকর্ষণ বোধহয় একেই বলে।

সীমান্তের ওপারে ভারতীয় পর্যটকদের আনাগোনা চোখে পড়ে

পানিতে নামবো কি নামবো না সেটা নিয়ে বেশ দ্বিধায় ছিলাম। দীর্ঘ কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে দুই পায়ে প্রচন্ড ব্যথা আর ক্লান্ত শরীর। এমন সময় মনে হলো এতো কষ্ট করে এখানে এসে যদি পানিতে না নামি, তাহলে জাফলং ভ্রমণ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। তাই সাবধানে পাথর ধরে ধরে নেমে গেলাম পানিতে।

পানিতে নেমেই টের পেলাম পানি ভীষণ ঠান্ডা, যেন বরফ ভেজানো। ডুব দিয়ে যে সে কী প্রশান্তি! নিমিষেই রাস্তার সমস্ত ক্লান্তি দূর হয়ে গেল।

জাফলং এর উঁচু টিলা হতে দৃশ্যমান ভারতের ডাউকি

পানির মধ্যে গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে দূরের ডাউকি শহর, সবুজ সব পাহাড়, সেতুগুলো দেখছিলাম। বরফ শীতল পানিতে ডুব দিয়ে বেশ শান্তি লাগছিল। মনে হচ্ছিল পানিতে না নামলে ভ্রমণের আনন্দটা অপূর্ণ থেকে যেতো, হয়তো শুধু ক্লান্তি আর দূষিত পরিবেশের স্মৃতি নিয়েই ফিরতে হতো।

সিলেট ভ্রমণের দ্বিতীয় দিন সকাল সকাল যাত্রা শুরু, এবার গন্তব্য শ্রীমঙ্গল; সিলেট শহর হতে দুই ঘন্টার পথ গাড়িতে। শ্রীমঙ্গল গাড়িতে আসার সময় দেখা মিলল চা বাগানের। রাস্তার দুই ধারে পাহাড় এর পর পাহাড় আর পাহাড়ের বুকে বিস্তৃত চা বাগান।

সবার প্রথমে যাওয়া হয় বাংলাদেশ চা গবেষণা ইন্সটিটিউটে। সেখানে গিয়ে একটা চা বাগান দেখলাম যেই বাগানের গাছগুলোর রোপণকাল ১৯৯৫ সালে! সেখানকার এক কর্মকর্তা জানালেন, চা গাছ গুলো থেকে চা তোলা হয় কিছুদিন পর পর নতুন কুড়ি আসলে। গাছ গুলো বেঁচে থাকে প্রায় ২০ থেকে ৫০ বছর অবধি।

এই বাগানে চা-গাছগুলো রোপণ করা হয় ১৯৯৫ সালে

সবসময় একটা ধারণা ছিল চা পাতায় হয়তো চায়ের (পানীয়) মতো সুঘ্রাণ থাকবে। একটা পাতা ছিড়ে গন্ধ নিলাম, আশাভঙ্গ হলো কিছুটা। সতেজ চা পাতায় চায়ের কোনো ঘ্রাণই যে নেই!

পাশের এক ভদ্রমহিলাকে দেখলাম লুকিয়ে লুকিয়ে অনেকগুলো পাতা ছিড়ে ব্যাগের ভেতর জমাতে ব্যস্ত। জিজ্ঞেস করতেই উনি বললেন এই পাতাগুলো পানিতে জ্বাল দিয়ে তিনি দেখতে চান চা বানানো যায় কিনা। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই চা বাগানের এক রক্ষণাবেক্ষণকারীর নজরে পড়ে যাওয়ায় তাকে বাগানে আর থাকার অনুমতি দেয়া হয়নি। তার চায়ের এক্সপেরিমেন্ট সফল হলো না ভেবে একটু খারাপই লাগলো যেন।

শ্রীমঙ্গলে আমার দেখা প্রথম চা-বাগান

শ্রীমঙ্গল ভ্রমণ শেষে সন্ধ্যায় ফিরে এলাম হোটেলে। পরদিন সকালের ট্রেনে সিলেট থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। ট্রেনে চড়ে পুরো সিলেট এর সবুজ প্রকৃতি, বন, চা-বাগান দেখতে দেখতে সময়টা ভালোই কাটছিলো।

রেললাইনের একটা অংশ যায় গহীন লাউয়াছড়া বনের ভিতর দিয়ে। এই বনের মধ্যে এই রেললাইনেই ১৯৫৬ সালের দুনিয়া কাঁপানো হলিউড সিনেমা এরাউন্ড দা ওয়ার্ল্ড ইন এইটি ডেইজ-এর একটি ট্রেন যাত্রার দৃশ্যের শ্যুটিং হয়।

লাউয়াছড়ার বনের মধ্য দিয়ে চলেছে রেললাইন। ছবি - উইকিমিডিয়া

ট্রেন ঢাকায় পৌঁছুতে পৌঁছুতেই লেখা শেষ হলো। দুই দিনের সিলেট ভ্রমণ যেন চোখের পলকে কেটে গেল। তবে এই অল্প সময়ের একটি মূহুর্তও বৃথা গেছে বলে মনে হয়নি। বরং এই অল্প সময়েই তৈরি করা গেছে অনেক অনেক সুন্দর কিছু স্মৃতি। যান্ত্রিক ঢাকায় ফিরে আসার পর সহজেই অনুধাবন করা যায় প্রকৃতির কাছে যাওয়ার আনন্দ।

নাফিসা ইসলাম মেঘা বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষে পড়াশোনা করছেন।

nfsmegha@gmail.com

Share if you like