Loading...

সাভারের গোলাপ গ্রামে একদিন

| Updated: March 30, 2022 22:35:18


গোলাপগ্রাম, শ্যামপুর, বিরুলিয়া, সাভার। গোলাপগ্রাম, শ্যামপুর, বিরুলিয়া, সাভার।

‘লাইফ ইজ নট আ বেড অব রোজেস’ - বহুল প্রচলিত ইংরেজি প্রবাদখানার কথা সবারই কমবেশি জানা। উক্তিটিতে জীবনে পরিশ্রমের গুরুত্ব বোঝাতে গোলাপকে কটাক্ষ করা হয়েছে কি না, এ নিয়ে গোলাপপ্রেমীদের মাঝে আক্ষেপ থাকতে পারে.

তবে 'গোলাপের বিছানা' নয়, আস্ত একখানা গোলাপের স্বর্গের সন্ধান দেয়া যেতে পারে ঢাকার অদূরে সাভারের গোলাপগ্রামে, একবার তবে ঘুরে আসা যাক! 

নগরজীবনের হাজারখানেক ব্যস্ততার ফাঁস এড়িয়ে চলে যাওয়া যায় সাভারের গোলাপগ্রামে। এখানে একবার গেলে বাহারী রং-গন্ধ-বর্ণের গোলাপ, ঝাঁপি মাথায় গোলাপচাষী আর দিগন্ত বিস্তৃত গোলাপ বাগান দর্শন শেষে মন জুড়ানো নবোদ্যমকে পুঁজি করার অভিজ্ঞতা অন্তরে জমে থাকবে অনেকদিন। ঢাকার আশেপাশে অল্প সময়ে স্বল্প খরচে প্রকৃতির সান্নিধ্যে থেকে নিজেকে উজ্জীবিত করার এর চেয়ে ভাল গন্তব্য খুব একটা নেই।

গোলাপের ঝাঁপি মাথায় জনৈক গোলাপচাষী

বিরুলিয়ার গোলাপগ্রাম

সাভারের বিরুলিয়া ইউনিয়নের সাদুল্লাপুর গ্রাম। এখন আর এই নামে কেউ চেনে না, বরং গোলাপগ্রাম নামেই পরিচিতি পেয়েছে। তুরাগ নদীর তীরে আঁকাবাঁকা মেঠোপথ। সরু পথ ঘেষে দু’পাশে অসংখ্য লালরঙা গোলাপ ফুলের বাগান। মাঝে মাঝে অন্য জাতের গোলাপ, গ্লাডিওলাস, জারবেরা বা সূর্যমুখীর বাগানও দেখা যাচ্ছে।

গোলাপের মোহনীয় সৌরভ আর চোখ জুড়ানো বাগানসজ্জায় চমৎকার সেজেছে পুরো গ্রাম। সৌন্দর্য বা ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য যা-ই হোক না কেন, ফুলচাষ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে পার্শ্ববর্তী শ্যামপুর, কল্যাণপুর, বাগ্মীবাড়ি গ্রামের বাসিন্দাদের মাঝেও। গোলাপের রাজ্যে ঘুরতে আসা পর্যটকদের চোখ জুড়াচ্ছে এসব গোলাপবাগান।

সূর্যমুখী ও গ্লাডিওলাসের বাগানও দেখা যায় গোলাপগ্রামে

কী দেখছেন দর্শনার্থীরা?

রাজনীতিবিদ মোঃ আকবর হোসেন সপরিবারে ঘুরতে এসেছেন ঢাকার বাসাবো থেকে। টিভিতে গোলাপ গ্রামের সৌন্দর্য দেখে এখানে বেড়াতে আসার পরিকল্পনা করেন তারা।

তার স্ত্রী সাজিয়া আকবর বললেন, “গোলাপ গ্রাম সম্পর্কে টিভিতে যতটা দেখেছি, বাস্তবে তার চেয়েও বেশি সুন্দর। শুধু গোলাপই নয় - গ্লাডিওলাস, জারবেরা, ক্যান্ডেলিনা, সূর্যমুখী আর চন্দ্রমল্লিকা দেখে বিমোহিত হয়েছি। ঢাকার পাশেই এতো সুন্দর একটি গ্রাম আছে তা আগে জানা ছিল না। শহরের সকল ক্লান্তি যেন নিমিষেই শেষ হয়ে গেল।”

আকবর হোসেন ও তার পরিবার এসেছেন গোলাপগ্রাম দেখতে

গোলাপ গ্রাম ঘোরার সময় সেলফি তুলতে দেখা গেল এক কিশোরীকে। কথা বলে জানা গেল তার নাম আলিজা আমরিন। পাশের গ্রাম আইচা নদ্দা থেকে এসছেন। বাসার বেশ কাছে হওয়ায় প্রায়ই মন খারাপ থাকলে গোলাপ গ্রামে আসেন তিনি। তার বাসার পাশে এরকম নয়নাভিরাম দর্শনীয় স্থান থাকায় বন্ধুমহলে আলাদা করে পরিচিতি ও পান তিনি।

ফুলের সৌরভে মন জুড়াতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাহাত চৌধুরী এসেছেন গোলাপগ্রামে

কথা হলো জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রাহাত চৌধুরীর সাথে। রাহাত জানালেন প্রতিটি বাগান মালিক চমৎকার করে দর্শনার্থীদের জন্য ব্যবস্থা করে রেখেছেন। বাগানের সামনে দর্শনার্থীদের প্রবেশের জায়গা রেখেছেন, বাঁশ দিয়ে নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন বাগানে প্রবেশের সীমা, যাতে পুরো বাগানের ফুল নষ্ট না হয়। 

এছাড়া কেউ কেউ ফুল ক্রয়ের বিনিময়ে বাগানের ঢোকার বা প্রবেশাধিকারকে সংরক্ষিত রেখেছেন। দর্শনার্থী হিসেবে সাধারণের কাছে একটাই চাওয়া - কেউ যেন অন্যের বাগানে এসে ছবি তোলার স্বার্থে অথবা অন্য যেকোনো ভাবে খামখেয়ালি আচরণের দ্বারা তাদের বাগানের কোনোরকম ক্ষতি না করে।

কীভাবে শুরু হলো এ অঞ্চলে গোলাপের চাষ?

স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেল, নব্বইয়ের দশকে জনৈক সাবেদ আলি সর্বপ্রথম এই এলাকায় গোলাপের চাষ শুরু করেন। তিনি পেশায় ছিলেন একজন মালি। গোলাপ ফুলের চাষ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভের পর তিনি শখের বসে এই অঞ্চলে গোলাপের বাগান করেন। পরবর্তীতে গোলাপের ব্যাপক চাহিদার যোগান দিতে তা বানিজ্যিক আকার ধারণ করে। একে একে এই অঞ্চলের অনেকেই গোলাপ চাষের সাথে যুক্ত হন।

মূলত সারাবছর গোলাপ ফোঁটায় এবং সবসময়ই কমবেশি চাহিদা থাকায় শাক-সবজি চাষিরাও একসময় এই লাভজনক চাষাবাদের দিকে ঝুঁকেন। এভাবেই একজন একজন করে, গ্রাম থেকে গ্রামে ছড়িয়ে পরে এই গোলাপের চাষ। 

ফুল সংগ্রহ করছেন জনৈক ফুলচাষী

কেমন আছেন গোলাপ চাষীরা?

শ্যামপুরের গোলাপ চাষী মোহাম্মদ আব্দুল খালেকের সাথে কথা বলে জানা গেল বেশ সচ্ছল জীবনযাপন করছেন তারা। ২২ বছর আগে ছোট পরিসরে গোলাপচাষ শুরু করা আব্দুল খালেকের এখন ৬০ শতকের দুইটি গোলাপ বাগান রয়েছে। গত ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে ফুলপ্রতি ৩০-৩৫ টাকা আয়ের কথাও বললেন তিনি।

সবজি চাষের রীতি ভেঙে ফুল চাষে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন কীভাবে জানতে চাইলে খালেক জানান - এ অঞ্চলে শাক সবজি চাষি থেকে দুই - একজন করে ফুল চাষের দিকে ঝুঁকে পড়া শুরু হয় প্রায় ৩৫ বছর আগে। লাভজনক হওয়ায় ধীরে ধীরে পুরো এলাকায় শুরু হলো গোলাপের চাষ।

শুরুতে প্রতিদিন তুরাগ পার হয়ে শাহবাগে ফুল সরবরাহ করার উদ্দেশ্যে যেতে হতো। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি আর স্থানীয় বাজার তৈরি হওয়ায় এখন সেই কষ্ট লাঘব হয়েছে বলেও জানান তিনি।

নিজের গোলাপবাগানে ফুলচাষী মোহাম্মদ আব্দুল খালেক

শ্যামপুরের আরেক গোলাপ বাগানের কর্মচারী ফরহাদ আলী প্রতিদিনের মতো আজও ফুল তুলছেন। তার সাথে কথা বলে জানা গেল, প্রতিদিন বিকেলে ফুল তোলেন চাষীরা।

প্রতিদিনের মত বিকেলে ফুল তুলছেন চাষী ফরহাদ মিয়া

গরমে কখনো কখনো দুইবারও ফুল তোলেন। বাগান থেকে ফুল তুলে পানিভর্তি মাটির বড় পাত্রে রাখা হয় ফুলগুলো। এরপর স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে বেশ লাভবান তারা।

ফুল তোলার পর তাজা রাখার জন্য এই পানি ভর্তি পাত্রে রাখা হয়

গোলাপের হাট

এ অঞ্চলে প্রতিদিন গোলাপের হাট বসে। প্রতিদিন রাত ৮-৯ টায় শ্যামপুরের কাশেম মার্কেটের সামনে ফুল ব্যবসায়ীদের আনাগোনায় সরব হয়ে উঠে গোলাপের বাজার। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের পাইকারী ব্যবসায়ীরা ভিড় করেন সেখানে।

গভীর রাত পর্যন্ত চলে ফুল বেচাকেনা।

সারাবছরই কমবেশি গোলাপের চাহিদা থাকায় সবসময়ই ব্যস্ত থাকে এই বাজার। উৎসব বা বিশেষ দিন উপলক্ষে ফুলের চাহিদা ও ব্যবসায়ীদের উপস্থিতি বেড়ে যায় কয়েকগুণ। শাহবাগে এই ফুল চলে যায় রাতের তিনটায়। গাদা এবং রজনীগন্ধা বাদে চন্দ্রমল্লিকা থেকে শুরু করে ৮-১০ জাতের গোলাপ, জারবেরা, গ্লাডিওলাস, মামফুল, ক্যান্ডেলিনা, সূর্যমুখী বিক্রি হয় এই বাজারে।

বিভিন্ন ধরনের ফুল নিয়ে হাজির বিক্রেতারা

দর্শনার্থীতে কি বিরক্ত গোলাপচাষীরা?

শাহবাগের ফুলের একমাত্র সরবরাহকারী হিসেবে গোলাপগ্রামের পরিচিতি আগে এতটা ছিল না। কিন্তু পর্যটক আর প্রকৃতিপ্রেমীদের উৎসাহে সাভারের গোলাপগ্রামের পরিচিতি এখন দেশজুড়ে। সপ্তাহান্তে দর্শনার্থীর চাপ সামলাতে বেশ বেগ পেতে হয় এখন তাদের।

ফুলচাষী আব্দুল খালেক জানালেন দর্শণার্থীদের সম্পর্কে মিশ্র অভিজ্ঞতার কথা। তিনি বললেন, অনেকে গোলাপগ্রামে বেড়াতে এসে হুটহাট বাগানে ঢুকে যান। কেউ কেউ বাগানের ফুল ছিড়তেও কুণ্ঠাবোধ করেন না। এজন্য অনেক সময় অনেকের সাথে বাগবিতণ্ডায়ও জড়াতে হয় বাধ্য হয়ে তাদের। 

এ থেকে পরিত্রাণের উপায়ও তৈরি করেছেন তিনি। বাগানের সামনে একটি ছোট্ট চালাঘর তুলে ফুলের মুকুট ও তোড়া বিক্রি করছেন তিনি। যারা তার এই টঙয়ের দোকান থেকে ফুলনির্মিত এসব সামগ্রী কিনছেন, তাদেরকেই শুধু বাগানে ঢোকার অনুমতি দেন তিনি। এছাড়া বাগানের একটি নির্দিষ্ট অংশ দর্শনার্থীদের জন্য বরাদ্দ রেখেছেন। সেখানে তারা ছবি তুলতে পারেন। বাকি পুরো বাগানকে সংরক্ষিত রেখেছেন তিনি।

দর্শণার্থীদের জন্য ফুল বিক্রি করছেন বাগান মালিকরা

তাদের উদ্দেশ্যেই ছোটখাটো বাজারের সৃষ্টি হয়েছে এখানে। প্রতিদিন নানা ধরনের ফুলেল পণ্য নিয়ে হাজির হন তারা যা বাড়তি আয়ের উৎস হিসেবেও কাজ করছে। 

কীভাবে যাবেন গোলাপগ্রামে?

সাভার বাসস্ট্যান্ডে নেমে ওভারব্রীজে রাস্তা পার হয়ে রিক্সা বা অটোরিক্সায় খুব সহজে গলাপগ্রাম যাওয়া যায়। অটোরিক্সায় জনপ্রতি ২০-৩০ টাকা, এবং ব্যাটারিচালিত রিক্সাপ্রতি ৬০-৮০ টাকা ভাড়া নেয়। দেশের যেকোনো স্থান থেকে এই রুটে গোলাপগ্রামে পৌছানো যায়।

এছাড়া টঙ্গী থেকে আসতে চাইলে কামারপাড়া থেকে রিজার্ভ সিএনজিতে বিরুলিয়া ব্রিজ (২০০ টাকা), বিরুলিয়া থেকে অটোরিক্সায় আকরান/আরকান বাজার (জনপ্রতি ১০ টাকা), সেখান থেকে আরো ১০ টাকা খরচ করে চলে যান সাদুল্লাপুরের গোলাপগ্রামে।

উত্তরা থেকে আসতে চাইলে দিয়াবাড়ি হয়ে বিরুলিয়া ব্রিজ এবং পূর্বের মত গোলাপগ্রামে চলে যেতে পারেন।

নৌপথেও গোলাপগ্রাম যাওয়া যায়। এজন্য রাজধানীর যেকোন প্রান্ত থেকে দিয়াবাড়ী বটতলা ঘাটে যেতে হবে। ১০ মিনিট পরপর ছেড়ে যাওয়া শ্যালো ইঞ্জিনের নৌকায় চেপে সাদুল্লাপুরে যাওয়া যায়।

পুরো সাদুল্লাপুর তথা গোলাপগ্রাম হেঁটে হেঁটেই দেখা যায়। তবে কালো পিচের রাস্তায় রিকশা নিয়ে ঘুরলেও মন্দ হবে না।

উল্লেখ্য, এই গ্রামটি কোনো পরিকল্পিত পর্যটন স্থান নয়। তাই ভালো কোনো রেস্টুরেন্ট বা টয়লেটের অপ্রতুলতা থাকতে পারে পুরো ভ্রমণে। কিছু নামমাত্র খাবারঘর, মুদির দোকানে চা - নাস্তার ব্যবস্থা ছাড়া তেমন কিছু পাওয়ার সম্ভাবনা কম। তাই ভ্রমণের আগেই সেরে নিতে পারেন খাওয়াদাওয়া।

দর্শনার্থীদের কাছে ফুলচাষী ও স্থানীয়দের একটাই অনুরোধ - অনুমতি ব্যতীত বাগানে ঢুকবেন না, ফুল ছিঁড়বেন না। ফুলচাষীদের ক্ষতি হয় এমন কোনো কাজ করবেন না।

হাসান সজীব বর্তমানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও বিচার বিভাগে তৃতীয় বর্ষে পড়াশোনা করছেন।

sojib.mhs@gmail.com

Share if you like

Filter By Topic