কোভিড-১৯ অতিমারী মানুষের স্বাস্থ্যক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন আনার সাথে সাথে মানুষের সম্পর্কেও দিয়েছে নতুন রূপ। কারো সাথে নৈকট্য, আবার কারো সাথে দূরত্বে, সম্পর্ক পেয়েছে নতুন মাত্রা। এ সময়ে স্বাস্থ্যবিধির সীমানা আমাদের বন্ধুবান্ধব বা আরো বৃহত্তর সম্প্রদায় থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন করে দিলেও, লকডাউনে পরিবারকে করেছে আরো ঘনিষ্ঠ।
একটা বয়সে প্রজন্ম পার্থক্য, বোঝাপড়ার ফারাক থেকে শুরু করে নানা কারণে সন্তানের সাথে মা-বাবার মতের অমিল দেখা দেয়, অনেকসময় যা গড়ায় মনোমালিন্যে। তবে করোনা লকডাউনে একসাথে অনেকটা সময় থাকতে পারায় সন্তানেরা আরো বেশি দেখতে পাচ্ছেন তাদের মা-বাবার জায়গা, তাদের পরিশ্রম আর অবদানগুলো; আবার মা-বাবাও আরো বেশি সজাগ হতে পারছেন সন্তানের পছন্দ অপছন্দ, মনোজগৎ নিয়ে।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ শিক্ষার্থী তাসনিম জারিন জানান, করোনাকালে পরিবার নিয়ে তার উপলব্ধির গল্প। "নিজের পরিবারকে যে আমি কত কম চিনি, এই লকডাউনে সেটা আমি বুঝতে পেরেছি। আগে যে সময়টুকু আমি বন্ধু-বান্ধবকে দিতাম, সেই সময়টা এখন পরিবারকে দিচ্ছি। এর কারণে মাঝে মাঝে মতামতের পার্থক্যের কারণে মনোমালিন্য হলেও মা-বাবার জীবন নিয়ে অনেককিছু জানতে পেরেছি। বাসার বাইরে থাকার কারণে মায়ের যে স্ট্রাগলগুলো আগে দেখা হতো না, সেগুলা প্রত্যক্ষ করার কারণে মায়ের প্রতি আমার শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা আরও বেড়েছে। সবসময় কাজে ব্যস্ত থাকা বাবা বেশি বাসায় থাকার কারণে তার সাথেও বেশি গল্প করার সুযোগ হয়েছে।
আমার ছোট ভাই ক্লাস এইটে পড়ে। কোভিডের কারণে স্কুল-কোচিং বন্ধ থাকার কারণে বড় বোন হিসেবে আমার কাছেই সে পড়াশোনার ছোট-বড় সমস্যা নিয়ে আসে। মাঝে মাঝে বিরক্ত লাগলেও, তাকে সাহায্য করতে করতে বেশ ভালো লাগে। অনেক গল্পও হয়। হাসি-ঠাট্টার সাথে পড়াশোনা হয়, পছন্দের মুভি-সিরিজ নিয়ে কথা বলতে বলতে তাকে ইংরেজি শেখাই, বেশ ভালোই লাগে। স্কুল-কলেজ আবার খুলে গেলে এই সময়গুলো আমরা আর পাব না ভেবে আফসোস হচ্ছে।"
করোনাতে লকডাউনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় অনেক শিক্ষার্থী শহর ছেড়ে ফিরে গেছেন নিজের শেকড়ে৷ অভিভাবকেরা কাছে পাচ্ছেন তাদের সন্তানদের।
এ নিয়ে যশোর থেকে ৬১ বছর বয়সী মোঃ আবুল খায়ের ব্যক্ত করেন তার নিজের অনুভূতি। "লকডাউনের আগে দুই সন্তানই পড়ালেখার জন্য ঢাকাতে অবস্থান করতো। নানা ব্যস্ততার কারণে যশোর থেকে আমার ঢাকায় যাওয়া হতো কম, পড়ালেখার চাপে সন্তানেরাও বাড়ি আসতে পারতো না। দেখা-সাক্ষাৎ হতো খুবই কম। কিন্তু এই লকডাউনের কারণে শহর ছেড়ে ওরা বাড়িতে চলে আসায় সবাই একসাথে থাকতে পারছি। সন্তানদের কাছে পাচ্ছি, একে অপরের যত্ন নিতে পারছি ভালোভাবে, সম্পর্ক-বোঝাপড়া আগের চেয়ে অনেক ভালো হচ্ছে।"
তিনি আরো বলেন, "অনেক আগে একসময় যৌথ পরিবারে থাকা হত। কিন্তু ভাইদের, সন্তানদের কাজকর্ম, পড়ালেখার কারণে তারা শহরমূখী হলে সেই পরিবার ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। কিন্তু লকডাউনের কারণে সবাই আবার বাড়ি ফিরে আসলে সেই পুরনোকালের যৌথ পরিবারের আমেজ ফিরে পাচ্ছি। সবাই একসাথে থাকা, খাওয়া, কাজ, গল্পগুজব মিলিয়ে পরিবারে ভালো সময় কাটছে।"
এদিকে শিক্ষার্থী সাদিয়া শর্মী জানান, "মা-বাবার সাথে সম্পর্কে বেশ কিছু ইতিবাচক কিছু পরিবর্তন এসেছে। এখন একসাথে খেতে বসা হয়, একসাথে অনেক সময় কাটানো হয়, গল্প করা হয়। আমার পড়ালেখা বা মা-বাবার কাজের জন্য বাইরে যাওয়ার ফলে যা আগে এভাবে সম্ভব ছিল না। মাঝে মাঝে একসাথে টিভি দেখা, আড্ডা, সবমিলিয়ে আরো ভালো সময় কাটছে পরিবারের সাথে। একসাথে থাকতে থাকতে নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়াটাও বাড়ছে দিনদিন।"
তিনি আরও বলেন, "আগে দেখা যেত, সবাই যার যার কাজে বাইরে ব্যস্ত। এমনকি বাইরের ক্লান্তিতে ঘরেও নিজের মতো বিশ্রাম নেয়ার একটা প্রবণতায় থাকতো। মাকে বাসায় বেশি সময়ও দিতে পারতাম না, এখন যেটা সম্ভব। বাসায় একসাথে থাকা, সবাই মিলে রান্না করা, রোজার সময়ে আম্মুকে সাহায্য করা, সবাই মিলে তারাবি পড়া, সময়গুলো সবমিলিয়ে ভালোই লাগছে।"
তবে সম্পর্কে উষ্ণতার পারদ চড়তে থাকলেও কিছু জায়গায় হয়তো বইতে থাকে হিম হাওয়া। ক্যাপিটা গ্রুপের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ এইচ এম তানজিম জানান তার এমনই কাহিনী। তিনি বলেন, "পরিবারের সাথে আমার সম্পর্ক বরাবরের মতোই ভালো। তবে আমার পরিবার এখানে থাকে না। ঢাকায় এক বড় ভাইয়ের সাথে থাকি আমি। অনেক ইচ্ছা থাকলেও করোনার সময়ে লকডাউনের জন্য বাড়ি যেতে পারিনি। আবার লকডাউন ছাড়লে অফিস বাদ দিয়ে ঢাকার বাইরে যাওয়া যায় না। এভাবে দীর্ঘদিন দেখা নেই পরিবারের সাথে। অনেকদিন বাড়ি না যাওয়ায় সবাই আমাকে অনেক মিস করছে। আমিও মিস করছি অনেক। করোনাশেষে সব স্বাভাবিক হলে ওদের সময় দেয়ার আশায় আছি।"
দুঃখজনক হলেও সত্যি, লকডাউনে সারা বিশ্ব জুড়েই বৈবাহিক বিচ্ছেদ, নারী নির্যাতনের মতো বিষয়গুলো বেড়েছে। তবে এ সময় অনেক মা-বাবা, ভাই-বোন, সন্তানদের সাথে সম্পর্ক পেয়েছে নতুন মাত্রা। সবার প্রত্যাশা, করোনা পরবর্তী দিনগুলোতেও সম্পর্কের এমন উষ্ণতা বজায় থাকুক এবং সেইসাথে দূর হোক সকল ধরণের নির্যাতন, ঘরে-বাইরে উভয় স্থানেই।
ফারিয়া ফাতিমা বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করছেন।
fariasneho@gmail.com
