সফলতা আসলে কী, নির্দিষ্ট করে বলার চেষ্টা না করাই ভালো। আবার সোজাসাপটা কায়দায় বলা চলে, চাওয়া পূরণ। অর্থাৎ, মানুষ যা চায় বা যা হতে চায়। কিন্তু, মনে করুন, তথাকথিত ‘সফল’ শব্দটির সাথে আপনার দেখা হয়ে গেলো বিরাট আনন্দে আটখানা হলো দেহ-মন, তারপর কি আর কিছুই বাকি থাকে না, পাওয়ার কিংবা করার? অবশ্যই থাকে। আমাদের আজকের পর্ব মূলত সফলতার পরবর্তী ধাপগুলো নিয়ে।
বিনয়ী ও উদার হোন
মানুষের চিরাচরিত কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। যেমন, কিছু একটা পাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তার আচরণ এবং প্রাপ্তি শেষে তার আচরণ, সম্পূর্ণই যেন বিপরীত। অবশ্য এই পরিবর্তন সবসময়ই আমাদের ক্ষতি করে। তাই, নিজের অবস্থার উন্নতি ঘটলে, আমরা যেন আমাদের পূর্বের আমিটাকে না ভুলে যাই, প্রাপ্তির সংগ্রামে যারা সঙ্গে ছিলো যথাসম্ভব তাদের পাশে থাকা, সর্বোপরি অহংকারী না হয়ে মানুষের প্রতি যথেষ্ট সম্মানপ্রদর্শন ও উদার প্রকৃতির হতে পারলে, সফলতার পরপদ আরও উজ্জ্বল আরও প্রাণোবন্ত হয়।
শিখতে থাকুন
“দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত জ্ঞান অন্বেষণ করো”- এই প্রবাদটির সঙ্গে আমরা সবাই কমবেশি পরিচিত। তাই, চাওয়ার হিসেব মিলে গেলে আমরা যেন আমাদের জানার পথ বন্ধ না করি। নিজেকে আরও বেশি সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি, আরও ভালো অর্জনের চেষ্টা অব্যাহত রাখলে; প্রাপ্তির দেয়াল বরাবরই দীর্ঘায়িত হয়।
নিন্দুকদের না শোনা
আপনি যা-ই করুন না কেন, কেউ না কেউ তার মধ্যে খুঁত খুঁজে বের করবে। আসলে পৃথিবীতে এমন কোনো মানুষ নেই, যে কিনা সবাইকে খুশি করতে পারে। তাই, আপনি আপনার দুনিয়ায় সফলতা খুঁজে পেলে, নিন্দুকদের পাত্তা দেয়া বন্ধ করুন। আবার কোনো মন্তব্য যদি সত্যিই কাজের মনে হয়, অর্থাৎ, গঠনমূলক সমালোচনা হয়- তবে অবশ্যই তা গ্রহণ করা ভালো।
এক পাত্রে সব না
একটি গল্প দিয়ে শুরু করি। ধরুন আপনাকে বারোটি ডিম এবং তিনটি মাটির হাঁড়ি দেয়া হলো। এবং ডিমগুলো পাত্রে রাখতে বলা হলো। এক্ষেত্রে কেউ হয়তো তিন পাত্রে সমানভাবে ডিম রাখবে, আবার কেউ হয়তো এক পাত্রে বারোটি। এখন কোনো কারণে যদি একটি পাত্র ভেঙে যায়, তবে কার ক্ষতি সবচেয়ে বেশি হতে পারে? উত্তরটা খুব সহজ। তাই, প্রাথমিক লক্ষ্যে পৌঁছুনোর পর, এক জায়গায় সমস্ত কিছু উজাড় করে না দিয়ে, শতাংশে কমবেশি করে, নিজের পছন্দের অন্য কোনো ক্ষেত্রেও দৃষ্টি দেয়া দরকার।
অত্যধিক বিশ্বাস
বিশ্বাস থাকা ভালো, কিন্তু অতিমাত্রায় নিজের প্রতি বিশ্বাস রাখা; কখনো কখনো খারাপ বয়ে আনে। আমরা যখন কিছু একটা অর্জন করি, অনেকেই এসে ভীড় জমায়, যারা সংগ্রামের দিনগুলোতে হয়তো আপনার ধারেকাছে ছিল না। এই মানুষগুলো তখন এমনভাবে অনুপ্রেরণা দিতে থাকে, যা হয়তো পরিমাণে খুব বেশি। এমতাবস্থায় যদি আপনি অনুপ্রেরণার স্রোতে গা ভাসিয়ে নিজেকে অত্যন্ত শক্তিশালী ভাবতে শুরু করেন, তবে তা কখনোই সামনে এগোতে দেয় না।
ব্যক্তিত্ব রক্ষা
অর্থ সম্মান আনে, আবার অর্থই সম্মান হানে। কথাটি যথেষ্টই বাস্তব ও সত্য। আমরা যখন চাওয়ার সাথে পাওয়ার মেলবন্ধন ঘটাই, তখন খুব আচমকা নিজের অগোচরেই যেন, নিজের ভেতরকার আসল আমিটাকে ভুলে যাই। যা করার কথা নয়, তা-ই করি, সর্বোপরি নিজের ব্যক্তিত্বে চরমভাবে আঘাত করি। এতে একটা সময় এসে, শত কষ্টে অর্জিত অর্জন যেন; বর্জনের কাতারে চলে যায়।
সম্পর্ক রক্ষায়
অবস্থার পরিবর্তন ঘটার সঙ্গে সঙ্গে ব্যস্ততা বাড়ে। বাড়তেই পারে। কিন্তু, ভুলে গেলে চলবে না, পৃথিবীতে সম্পর্ক বলে কিছু একটা আছে। যে পরিবার আমাদের সবসময় সঙ্গ দেয়, যে ভালোবাসার মানুষটি আমাদের বিপদবেলায় আলো হয়ে আসে, যে বন্ধুটি জীবনের সমস্ত বৃষ্টিদিনে ছাতার মতো পাশে থাকে, তাদের জন্য সময় রাখতে না পারাটা, চরমতম ব্যর্থতা বললে অত্যুক্তি হবে না।
জীবন চলার পথে মনে রাখা ভালো, সফলতাই শেষ কথা নয়। বরং, সফল হয়েও নিজেকে সহজ হিসেবে ধরে রাখা, ভুলে না যাওয়া: ব্যর্থ দিনের পাণ্ডুলিপি। তবেই তো স্বস্তির বৃষ্টিতে ভিজে, সুনিশ্চিত সমাধির পথে হেসে হেসে যাওয়া যাবে, পাওয়া যাবে অমূল্য ভালোবাসার ঘ্রাণ।
সঞ্জয় দত্ত ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে পড়াশোনা করছেন। sanjoydatta0001@gmail.com
