বাবা-মায়ের যত্ন আর শিক্ষায় সন্তান বেড়ে উঠে। ভালো অভ্যাস অনুশীলনের আদলে বাবা-মা চেষ্টা করে থাকেন তাদের সন্তান যেন ‘স্বাস্থ্যকর অভ্যাসগুলোতে’ অভ্যস্ত হয়ে উঠে। তবে অনেক বাবা-মা আছেন যারা সন্তানের সম্মুখে বা অগোচরে মাঝে মাঝে বা প্রায়শ সন্তানের বিকাশের জন্য ক্ষতিকর বেশকিছু কাজ করে থাকেন, যেমন-ধূমপান। এখন প্রশ্ন হলো এই ধূমপানের প্রভাব কি ভবিষ্যতে তাদের সন্তানের অভ্যাসের উপর কোনো প্রভাব ফেলে?
একজন সন্তান বড় হয়ে যখন ধূমপানে আসক্ত হয়ে পড়ে এর পেছনে বাবা-মা ধূমপায়ী হওয়া কতটুকু দায়ী?
২০১৩ সালে পেডিয়াট্রিকসে এই সম্পর্কিত একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়। গবেষণার মূল দায়িত্বে ছিলেন পুর্দু ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মাইকেল ভ্যুলো।
১৯৮৮ সালে ২১৪ জনকে নিয়ে গবেষণাটি শুরু করা হয়। সেসময় এই ২১৪ জনই ছিলেন মাধ্যমিক স্কুলে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী। প্রায় ২৩ বছর যাবত অর্থাৎ ২০১১ সাল পর্যন্ত তাদের নিরীক্ষা করা হয়। তাদের ধূমপানের অভ্যাসের উপর বাৎসরিক জরিপ চালানো হতো। ২০১১ সালে তাদের সন্তানদের উপর একটি জরিপ চালানো হয় এবং এতে অংশ নিয়েছিল তাদের দ্বিতীয় প্রজন্মের ৩১৪ জন।
জরিপে দেখা যায়, যেসকল বাবা বা মা দীর্ঘদিনযাবত প্রচন্ড রকম ধূমপান অভ্যস্তবা ‘হেভি স্মোকার’ তাদের বড় সন্তান বাবা-মায়ের ধূমপানের অভ্যাসের দ্বারা প্রভাবিত হয়।
দ্বিতীয় প্রজন্মের এই ৩১৪ জনের মধ্যে ২৩ শতাংশ ধূমপানে আসক্ত সন্তানের বাবা-মা তাদের শৈশবে ধূমপান শুরু করেছিলেন এবং ৩৮ বছরের কাছাকাছি সময়ে তারা পুরোপুরিভাবে ধূমপান ছেড়ে দেন। ২৯ শতাংশ ধূমপানে আসক্ত সন্তানের বাবা-মা তাদের বয়স যখন ২০-এর কোঠায় সেইসময় ধূমপান শুরু করেছিলেন। এর মধ্যে ৮ শতাংশ সন্তান ধূমপানে আসক্ত হয়েছিল যাদের বাবা-মা জীবনে কখনোই একবারের জন্যও ধূমপান করে নি।
এ ব্যাপারে পুর্দু ইউনিভার্সিটিতে আয়োজিতএক প্রেস কনফারেন্সে মাইকেল ভ্যুলো বলেন, “বাবা-মায়ের ধূমপানের অভ্যাস থাকলে সেটা হতে পারে নিয়মিত বা অনিয়মিত, অল্প বা অধিক এর একটা প্রভাব সন্তানের উপর পড়ে থাকে। যে পরিবারে বাবা-মা অধূমপায়ী এমন পরিবারের সন্তানদের চেয়ে বাবা-মা ধূমপায়ী এমন পরিবারের সন্তানদের ধূমপায়ী হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ১৫ গুণ বেশি। এমন পরিস্থিতিতে ছোট সন্তানের ধূমপায়ী হওয়ার প্রবণতা থাকে প্রায় ৬ গুণ বেশি।”
ইউনিভার্সিটি অফ ওয়াশিংটনের তথ্য অনুযায়ী যাদের বাবা বা মা ধূমপান করে সেসব সন্তান ১৩ থেকে ২১ বছরের মধ্যে নিয়মিত ধূমপানে অভ্যস্ত হয়ে উঠে।
ইউনিভার্সিটি অফ ওয়াশিংটনের পরিচালক কার্ল হিল জরিপের ফলাফল বিশ্লেষণকালে বলেন, “সন্তানের প্রতি খেয়াল রাখা ও পরিবারের অনুশাসন, পরিবারিক বন্ধন বা পরিবারের সদস্যদের সাথে মানসিক সখ্যতা, সহপাঠীদের সঙ্গ-এ বিষয়গুলোর অভাবে একজন সন্তান ধূমপায়ী হয়ে উঠতে পারে।”
এছাড়াও অন্যান্য কারণ হিসেবে তিনি চিহ্নিত করেন বাবা-মায়ের করা কিছু ভুল কাজ, যেমন-এক প্যাকেট সিগারেট কিনে আনতে বলা, গাড়িতে ফেলে আসা প্যাকেটটা নিয়ে আসতে বলা বা সিগারেট ধরানোর জন্য লাইটার বা ম্যাচ দিতে বলা। এ কাজগুলোও সন্তানকে ধূমপানের প্রতি আকৃষ্ট করে তুলতে পারে। তবে বাবা-মা ধূমপান করলে সন্তানের ধূমাপায়ী হওয়ার পেছনে তা সবচেয়ে বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করে।
এবার দেখা যাক মা ধূমপায়ী হলে তা সন্তানের উপর ঠিক কতটা প্রভাব ফেলে?
এ ব্যাপারে ২০১৫ সালে আমেরিকান জার্নাল অফ পাবলিক হেলথে একটি গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছিল এবং এ ব্যাপারে বলা হয়েছিল, ‘একজন মা ধূমপায়ী হলে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে মেয়ে সন্তানের উপর। একজন অধূমপায়ী মায়ের সন্তানের চেয়ে ধূমপায়ী মায়ের সন্তানের ধূমপায়ী হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৪ গুণ বেশি’।
বেশিরভাগ সন্তান তাদের কৈশোরে এমন বিষাক্ত অভ্যাসের অনুকরণ শুরু করে এবং এতে কোনো সন্দেহের অপেক্ষা রাখে না যে এর পেছনে বাবা-মায়ের ভূমিকাই মুখ্য। সন্তানরা অনুকরণপ্রিয় হয়ে থাকে এবং তাদের সবচেয়ে কাছের মানুষ বাবা-মাকেই তারা সবচেয়ে বেশি অনুকরণ করে থাকে। তাই ধূমপানের এই বিষাক্ততা থেকে সন্তানকে নিরাপদে রাখতে হলে সর্বাগ্রে বাবা-মাকে ধূমপানের অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে। সুস্থ অভ্যাসের অনুশীলন একটি সুস্থ ও সুন্দর জীবন নিশ্চিত করে।
শবনম জাবীন চৌধুরী ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের ফার্মেসি বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন।
zabin860@gmail.com
