বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, বর্তমানে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ২২২৭ মার্কিন ডলার। প্রায় প্রতি বছরই বেড়ে চলেছে এর আকার, যা দেশের মানুষের সামগ্রিক জীবনযাত্রার মানের ইতিবাচক প্রভাব নির্দেশ করে। আর একটি দেশের মানুষের আয় যত বাড়বে, সেখানকার সঞ্চয় প্রবণতাও তত বাড়বে। তবে এই সঞ্চিত অর্থ কোথাও বিনিয়োগ না করে অলস ফেলে রাখলে তা থেকে অতিরিক্ত আয় যেমন আসে না; ঠিক তেমনি এটি দেশের অর্থনীতির উপরও বিরূপ প্রভাব ফেলে।
মূলত সঞ্চিত অর্থ যখন বিনিয়োগের প্রশ্ন আসে তখন মানুষের হাতে দুইটি বিকল্প থাকে; উৎপাদনশীল এবং সেবামূলক খাত। সামগ্রিক উন্নয়নের কথা বললে দু’টি খাতই কিন্তু একটি দেশের জন্য সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এই দুই খাতই মানুষের আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, এবং দারিদ্র্য দূরীকরণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।
ব্যাংক
মানুষ স্বাভাবিকভাবেই তাদের সঞ্চিত অর্থ যে খাতে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করে, সেটি হলো ব্যাংক। এটি সেবামূলক খাতে বিনিয়োগের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। মূলত যে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো বাহ্যিক পণ্য উৎপাদন না করে মানুষের জীবনযাত্রার মান সহজীকরণের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে, সেসব প্রতিষ্ঠান নিয়ে যে খাত গড়ে ওঠে, সেটি সেবা খাত।
এ খাতের মধ্যে ব্যাংক, বিমা, পরিবহন, শিক্ষা, এবং জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানগুলো উল্লেখযোগ্য। একজন ব্যক্তি ব্যাংকে টাকা জমা রাখার মাধ্যমে অর্থনীতিকে আরো গতিশীল করতে ভূমিকা রাখেন। কেননা ব্যক্তিপর্যায়ে সংগৃহীত এসব অর্থই ব্যাংক পরবর্তীতে ব্যবসায়, শিল্প, স্থানীয় পর্যায়ে উদ্যোক্তাদেরকে কিংবা অন্য কোনো গঠনমূলক কাজে বিনিয়োগ করে থাকে- যা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই আপনি আপনার সঞ্চিত অর্থ ব্যাংকে আমানত হিসেবে রেখে বিনিয়োগের অংশীদার হতে পারেন।
সঞ্চয়পত্র
এছাড়া আপনি যদি আপনার সঞ্চয়কে আরো বৃহত্তর স্বার্থে বিনিয়োগ করতে চান, সেক্ষেত্রে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করতে পারেন। সঞ্চয়পত্র হচ্ছে মূলত একধরনের ঋণ, যার মাধ্যমে সরকার দেশের কোনো উন্নয়ন কাজের জন্য জনগণের কাছ থেকে একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য অর্থ সংগ্রহ করে। মেয়াদ শেষে গ্রাহক তার টাকা ফেরত পান এবং সাথে নির্দিষ্ট সময় পরপর একটি সুদও পেয়ে থাকেন।
বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সব শাখা অফিস, বাণিজ্যিক ব্যাংক, জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের অধীন সঞ্চয় অফিস, এবং পোস্ট অফিসে সঞ্চয়পত্র কিনতে পাওয়া যায়। তাই অর্থকে অলসভাবে ফেলে না রেখে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করার মাধ্যমে নিজের এবং দেশের উন্নয়নে জন্য অবদান রাখতে পারেন।
নন-ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান
পাশাপাশি বর্তমানে বাংলাদেশে অনেকগুলো নন-ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান চালু রয়েছে। নন-ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান বলতে মূলত বোঝায় যেসব প্রতিষ্ঠানকে, যারা অন্যসব কাজ ব্যাংকের মতো করলেও চেক এবং প্রত্যয়নপত্র (বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য) ইস্যু করতে পারে না। আপনি চাইলে আপনার অর্থকে একটি নির্দিষ্ট সুদের বিনিময়ে সেখানে আমানত হিসেবে রাখতে পারেন।
আবার এর পাশাপাশি একজন মানুষ তার কষ্টার্জিত অর্থকে জীবন বিমা খাতে বিনিয়োগ করতে পারেন। জীবন বিমার ক্ষেত্রে আপনি প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট প্রিমিয়াম বিমা কোম্পানিকে দেবেন এবং মেয়াদান্তে সুদসহ আপনার টাকা ফেরত পাবেন। আবার মেয়াদপূর্তির পূর্বে যদি বিমাকারী ব্যক্তি মারা যান, সেক্ষেত্রেও তিনি পুরো টাকা পাবেন। তাই অনিশ্চিত ভবিষ্যতের জন্য পরিবার ও সন্তানদের কথা মাথায় রেখে আপনার সঞ্চয়কে জীবন বিমা খাতে বিনিয়োগ করতে পারেন।
শেয়ার বাজার
শেয়ার বাজারে সাধারণত তিনটি খাতে বিনিয়োগ করা যায়। এগুলো হচ্ছে স্টক, বন্ড, এবং মিউচুয়াল ফান্ড। স্টক বলতে বোঝায় কোনো কোম্পানির শেয়ার ক্রয়ের মাধ্যমে সে কোম্পানির মালিকানায় অংশ নেওয়া। ভবিষ্যত সম্ভাবনা ভালো, এমন কোম্পানির শেয়ার কিনলে আপনার শেয়ারের মূল্য বৃদ্ধির পাশাপাশি একটি নির্দিষ্ট সময় পরপর লভ্যাংশও পাওয়া যাবে। আর বন্ডের ক্ষেত্রে আপনার বিনিয়োগকৃত অর্থ মেয়াদান্তে ফেরত পাবেন এবং তার আগে একটি নির্দিষ্ট সময় পরপর সুদ পাবেন। শেয়ার বাজারের পণ্যগুলোর মধ্যে বন্ডে বিনিয়োগে ঝুঁকি সবচেয়ে কম থাকে।
অন্যদিকে, মিউচুয়াল ফান্ড হলো- কোনো কোম্পানি যখন অনেক বিনিয়োগকারীর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয়কে সংগ্রহ করে সেগুলোকে পুনরায় স্টক, বন্ড ইত্যাদিতে বিনিয়োগ করে। এক্ষেত্রেও আপনি লভ্যাংশ পাবেন এবং পরবর্তীতে বিনিয়োগকৃত অর্থও ফেরত পাবেন। মূলত যারা শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের সময় লাভ করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে কিছুটা চিন্তিত থাকেন, তারা মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করতে পারেন। কারণ, এক্ষেত্রে আপনি যে কোম্পানির মাধ্যমে স্টক বা বন্ড কিনবেন, সেই কোম্পানিটি শেয়ার বাজার সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান লাখে। তাই আপনার বিনিয়োগকৃত অর্থ বিফলে যাওয়ার সম্ভাবনাও অনেক কম থাকবে।
একক বা যৌথ বিনিয়োগ
আর আপনি যদি আপনার অর্থকে কোনো উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করতে চান, সেক্ষেত্রে এককভাবে অথবা যৌথভাবে কোথাও বিনিয়োগ করে ব্যবসায় কার্যক্রম শুরু করতে পারেন। এক্ষেত্রে আপনি নিজের আয় উপার্জনের পথ সৃষ্টির পাশাপাশি অন্য অনেকের জন্য কর্মসংস্থানেরও সৃষ্টি করতে পারবেন।
এ বিষয়ে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেডের অবসরপ্রাপ্ত ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং সাবেক শাখা প্রধান মো. নূরুল আফসার বলেন, “একটি দেশে মানুষের সঞ্চিত অর্থ যত বেশি বিনিয়োগের সংস্পর্শে আসবে, তা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য তত বেশি মঙ্গলজনক হবে। কারণ ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের অর্থকে কখনো অলস ফেলে রাখে না। বরং তা বিভিন্ন উন্নয়নমূলক খাতে বিনিয়োগ করে। আর এতে করে ব্যক্তি যেমন উপকৃত হয়, ঠিক তেমনি দেশের সামগ্রীক অর্থনীতিও আরো শিক্তিশালী হয়। আবার সঞ্চিত অর্থ যদি উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করা যায় সেটিও দেশের অর্থনৈতিক বিকাশ অত্যন্ত ফলপ্রসূ হবে।”
অর্থ এমন একটি জিনিস, যেটি আপনি যত ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারবেন, তত বেশি মুনাফা করতে পারবেন। বাংলাদেশে বর্তমানে সঞ্চিত অর্থ বিনিয়োগের জন্য অনেক ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। আর দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো হওয়াতে ক্ষেত্রগুলোতেও এখন কিছুটা স্বস্তি বিরাজ করছে। তাই একজন সাধারণ ব্যক্তি তার কষ্টার্জিত সঞ্চয়কে এসব খাতে বিনিয়োগ করে সহজেই লাভবান হতে পারেন।
তানজিম হাসান পাটোয়ারী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও ইনস্যুরেন্স বিভাগের তৃতীয় বর্ষে পড়াশোনা করছেন।
tanjimhasan001@gmail.com
