চীনা কৃষি ও চিকিৎসা বিষয়ক পৌরাণিক জনপ্রিয় চরিত্রের নাম, সম্রাট শেননং। কথিত আছে, একদিন সম্রাট দলবল নিয়ে ভ্রমণে বের হয়েছিলেন, এবং পথিমধ্যে সামান্য বিশ্রাম নেবার সময়, একরকম অজান্তেই আবিষ্কার করে ফেলেন বিশেষ গুণাবলি সম্পন্ন এক পানীয়। সম্রাটের গরম জলের কাপে আকস্মিক কয়েকটি শুকনো পাতা পড়ে যায়, এবং পাতাগুলো পড়ার সঙ্গে সঙ্গে জলরঙ ক্রমশ গাঢ় হতে থাকে। তবে গাঢ় হবার বিষয়টি মোটেও সম্রাটের দৃষ্টিগোচর হয়নি।
যখন তিনি গরম জল পান শেষ করলেন, তখন অন্যরকম এক স্বস্তি বোধ করেন। পরক্ষণে, তাঁর সঙ্গে থাকা ব্যক্তিকে পাতা দিয়ে আরও পানীয় তৈরির আদেশ দেন। সেই পরম স্বস্তি বোধ কিংবা পুনরায় আরও প্রস্তুতের ইচ্ছে জুড়ে থাকা পাতাটি আর কিছুই নয়, নাম তার গ্রিন টি। ক্যামেলিয়া সাইনেনসিস গাছের পাতা ও কুঁড়ি থেকে যার জন্ম। এবং ধারণা করা হয়, সম্রাট শেননংয়ের হাত ধরে ঠিক এভাবেই চীন দেশে প্রথম গ্রিন টি আবিষ্কৃত হয়। আবিষ্কারের পর থেকে খুব দ্রুতই এই চা বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে তার নানাবিধ গুণাবলির ডালা নিয়ে। আজকের লেখায় গ্রিন টি পানে সুফল ও এর বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করব।
শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমে যাওয়ার বিষয়টি বর্তমান সময়ে খুব বেশি আলোচিত কথা। এর ফলে মানুষ নানাভাবে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হয়। কিন্তু, নিয়মিত রুটিনে এক কাপ গ্রিন টি হাতে থাকলে এ সমস্যা থেকে খুব ভালো সমাধান পাওয়া যেতে পারে। কেননা, গ্রিন টিতে থাকা পলিফেনল, চর্বি অক্সিডেশন প্রক্রিয়াকে আরও সক্রিয় করে তুলে। ফলে, শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমতে পারে না। গবেষণা বলে, গ্রিন টি একদিনে ৭০ ক্যালোরি পর্যন্ত ধ্বংস করতে সক্ষম।
দাঁত নিয়ে আমরা সবাই কমবেশি সর্তকতা অবলম্বন করি। কিন্তু তবু, অনেকসময় দাঁত নানাভাবে আক্রান্ত হয়। এক্ষেত্রেও গ্রিন টি আমাদের সাহায্য করতে পারে। কারণ, গ্রিন টিতে থাকা ক্যাটেকাইন নামক উপাদান মুখের ভেতরের ক্ষতিকর যেকোনো কিছুকে নষ্ট করতে পারে। আবার অনেকসময় নিয়মিত ব্রাশ করা সত্ত্বেও কারো কারো মুখে দুর্গন্ধ হয়। নিয়মিত গ্রিন টি পানে এ সমস্যা থেকেও লাঘব পাওয়া সম্ভব।
হৃদরোগ বর্তমান সময়ে অনেক সাধারণ একটি অসুখ। ইদানীং, যেকোনো বয়সের মানুষই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়। কোলেস্টেরল বেড়ে যাওয়া বা রক্ত চলাচলে অস্বাভাবিকতা, রক্ত জমাট বাঁধা ইত্যাদি কারণ থেকে মূলত এ রোগের সম্ভাবনা বাড়ে। এমন দুর্যোগের দিনেও গ্রিন টি আমাদের সর্বোচ্চ সহায়তা করতে পারে। গবেষণা বলে, নিয়মিত গ্রিন টি পানে হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা শতাংশের হিসেবে অনেকটাই কমে যায়।
অবসাদ কিংবা ডিপ্রেশন, ঘুরেফিরে এ দুটোর সঙ্গে দেখা কমবেশি আমাদের সবারই ঘটে থাকে। আর এ সঙ্গ উচ্ছ্বসিত থাকা কিংবা সামনে অগ্রসর যে কাউকেই খুব মুহূর্তে পিছিয়ে দেয় অনেকটা পথ। এমতাবস্থায়, গ্রিন টি হতে পারে আমাদের রক্ষাকবচ। কারণ, গ্রিন টিতে থাকা থিয়ানিন নামক একটি উপাদান এ জাতীয় যেকোনো সমস্যাকে দূরে সরিয়ে আমাদের দিতে পারে সুন্দর সময় উপহার।
ডায়াবেটিসের মতো অসুখগুলো দিনকে দিন মহামারি পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। রক্তে গ্লূকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে না থাকাই এ অসুখের মুখ্য কারণ। এক্ষেত্রে, গ্রিন টি প্রত্যক্ষভাবে রক্তে গ্লূকোজ নিয়ন্ত্রণে কাজ করে থাকে। নিয়মিত গ্রিন টি পানে, ডায়াবেটিস থেকে মুক্ত থাকা অনেকটাই সম্ভব৷
এমনকি ক্যান্সারের মতো জটিল অসুখ থেকে দূরে থাকতে গ্রিন টি বেশ ভালো অবদান রাখে। নিয়মিত গ্রিন টি পানে, খাদ্যনালীতে ক্যান্সার হবার ঝুঁকি কমে যায়। এছাড়াও, রোদে পোড়া ত্বক, চোখের নিচে কালো দাগ- ইত্যাদি প্রশমনে গ্রিন টির ব্যাপক সুনাম রয়েছে। আবার আমাদের দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার উন্নয়নেও গ্রিন টি বেশ উপযোগী।
সমস্ত গুণাবলী জানার পর, অনেকের মনে হতে পারে— তাহলে দিনে যখন তখন এক কাপ গ্রিন টি নেয়া যেতেই পারে। কিন্তু আমাদের এও খেয়াল রাখা দরকার, পৃথিবীর সব ভালো ব্যাপারই কিন্তু নিয়ম মেনে না করতে পারলে ক্ষতিকর হতে পারে। তাই, দিনের শুরুতে এক কাপ সবুজ চা পান, আপনার গোটা দিনকে আরও বেশি আমোদময় করে তুলতে পারে। আবার, যারা ওজন কমাতে চান;তারা শরীরচর্চার একটু আগে নিতে পারেন এক কাপ।
বিশেষ সতর্কতার ব্যাপারে চিকিৎসক শরিফুল ইসলাম বলেন, একদম খালি পেটে বা ভরপেট খেয়ে ও ঘুমোনোর আগে গ্রিন টি পান না করাই উত্তম। কারণ, একদিকে গ্রিনটিতে থাকা ক্যাফেইন আপনার নিদ্রায় ব্যাঘাত ঘটাতে পারে, অন্যদিকে খালি পেটে চা পান গ্যাস্ট্রিকের সম্ভাবনা বাড়ায়। আবার ভরপেট খেয়ে সবুজ চা পান করলে হজমে সমস্যা হয়। তাই, পেট যখন মাঝামাঝি পর্যায়ে থাকে, অর্থাৎ, ‘না ভরপেট, না খালিপেট’ অবস্থাতেই এ চা পান করা ভালো।
পৃথিবীতে সমস্যার অন্ত নেই, হরহামেশাই সব প্রাণীকে মুখোমুখি হতে হয় নানাবিধ জটিল সমীকরণে। তবে, আলোর কথা হচ্ছে, সব সমস্যারই উত্তরণের কোনো না কোনো পথ কখনো কৃত্রিম, কখনোবা প্রাকৃতিক কৌশলে ধরা দেয় হাতের কাছে। এই যেমন, প্রকৃতি থেকে পাওয়া গ্রিন টি’র কথাই যদি বলি? রোজ ভোরে এক কাপ গ্রিন টি’র গল্প থাকুক, সুস্থতা আপনার সঙ্গী হোক।
সঞ্জয় দত্ত ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে পড়াশোনা করছেন।
sanjoydatta0001@gmail.com
