সংবাদপত্রের পাতায় ৫২'র ভাষা আন্দোলন


তানজিম হাসান পাটোয়ারী | Published: February 22, 2022 16:49:03 | Updated: February 22, 2022 19:38:27


সংবাদপত্রের পাতায় ৫২'র ভাষা আন্দোলন

রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত বায়ান্নর ২১শে ফেব্রুয়ারিতে সৃষ্টি হয় ইতিহাসের এক বিরলতম নজির। মাতৃভাষার জন্য জীবন উৎসর্গকরে বিশ্বব্যাপী বাংলা ভাষার মান, শান ও মহিমা বাড়িয়ে তোলেন সেদিনের বীর ভাষা শহীদেরা।

সেদিনের এই আন্দোলনকে অসম্ভব গুরুত্ব দিয়ে করে প্রচার করেছিল তখনকার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমগুলো। দাবি আদায়ের পাশাপাশি দেশে-বিদেশে জনমত গঠনেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিল সংবাদপত্রগুলো।

বাংলা ভাষার পক্ষে যেসব পত্রিকা সেসময় সোচ্চার ভূমিকা পালন করেছিল তার মধ্যে দৈনিক আজাদ এবং কলকাতা থেকে প্রকাশিত দৈনিক ইত্তেহাদ অন্যতম। তবে ১৯৫২ সালের আগ পর্যন্ত দৈনিক আজাদ পত্রিকার স্পষ্ট কোনো অবস্থান জানা যায়নি। কারণ ভাষা আন্দোলনের আগ পর্যন্ত তারা কখনো বাংলা ভাষার পক্ষে, আবার কখনো বিপক্ষে লেখা প্রকাশ করত।

তবে ২১ শে ফেব্রুয়ারির সন্ধ্যায় দৈনিক আজাদ ভাষার প্রশ্নে তাদের অবস্থান নিশ্চিত করে। সেদিন তারা প্রকাশ করে বিশেষ টেলিগ্রাম যার হেডলাইন ছিল ছাত্রদের তাজা খুনে ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত।' পরে মুসলিম লীগ সরকার কর্তৃক এটি বাজেয়াপ্ত করা হয়।

কিন্তু তারপরেও থেমে থাকেনি পত্রিকাটি। ২১শে ফেব্রুয়ারির পর থেকে পরবর্তী কয়েকদিন এটি বাংলা ভাষার পক্ষে সমর্থন জানিয়ে অনেকগুলো লেখা প্রকাশ করে। এর ফলে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের কাছে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি আরো জোরালো হয়।

তখন ইত্তেফাক পত্রিকা সাপ্তাহিক ভিত্তিতে প্রকাশ হতো। সেসময় ইত্তেফাকে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে নিয়ে বিভিন্ন শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল যেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো - 'দেশের কাছে লাল ফেব্রুয়ারির শহীদদের ডাক আসিয়াছে,'বাংলা ভাষার সংগ্রামকে সফল করিয়া রক্তের প্রতিশোধ নাও,'জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন সরকার আজ মিলিটারির জোরে বাঁচিয়া আছে ইত্যাদি

এছাড়া ১৯৫২ সালের ২৪শে ফেব্রুয়ারি ইত্তেফাক পত্রিকা প্রাদেশিক সরকারের বিচার দাবি করে তাদের সম্পাদকীয়তে বিশেষ লেখা প্রকাশ করেছিল।

সোচ্চার ছিল সাপ্তাহিক সৈনিক পত্রিকাও। ২৩শে ফেব্রুয়ারিতে পত্রিকাটি প্রকাশ করে বিশেষ সংখ্যা যেখানে লাল কালিতে লেখা হয় শহীদ ছাত্রদের তাজা রক্তে ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত', মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেলে ছাত্র সমাবেশে পুলিশের নির্বিচারে গুলিবর্ষণ। সেদিনের সে সংখ্যাটি এতটাই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল যে মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যেই পত্রিকাটির হাজার কপি বিক্রি হয়ে যায়। পরে পত্রিকা কর্তৃপক্ষ একই দিনে তিনটি সংস্করণ বের করে।

বাংলা ভাষার পক্ষে জোরালো সমর্থনের কারণে ২৩শে ফেব্রুয়ারি রাতে সৈনিক পত্রিকার অফিস ঘেরাও করা হয়। সেসময় গ্রেপ্তার করা হয় পত্রিকাটির সম্পাদক আবদুল গফুর ও প্রকাশক অধ্যক্ষ আবুল কাশেমকে।

এছাড়া সেসময় দৈনিক মিল্লাত ভাষা আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে লেখা প্রকাশ করেছিল। আর তাদের ব্যানার শিরোনামে লেখা হয় রাতের আঁধারে এত লাশ কোথায়? পরবর্তীতে মিল্লাত পত্রিকার সম্পাদক মোঃ মোদাব্বেরের নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়।

পাশাপাশি আরো কিছু সংবাদপত্র সে সময় বাঙালিদের অধিকার আদায়ে তাদের জোরালো সমর্থন লেখার মাধ্যমে প্রকাশ করেছিল। এর মধ্যে দৈনিক ইনসাফ এবং দৈনিক আমার দেশ অন্যতম।

এছাড়া ভাষা আন্দোলনের আগে উত্থাপিত বিভিন্ন দাবি তুলে ধরে সেসময় খবর প্রচার করতপাকিস্তান অবজারভার। পরবর্তীতে পাকিস্তান সরকার ১৯৫২ সালের ১৩ই ফেব্রুয়ারি পত্রিকাটির প্রকাশনা বন্ধ করে দেয় এবং এর সম্পাদক আব্দুস সালাম ও মালিক হামিদুল হক চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এছাড়া সেসময় বাংলাদেশের আঞ্চলিক পত্রিকাগুলোও ভাষা আন্দোলনের পক্ষে তাদের শক্ত অবস্থান লেখনীর সাহায্যে তুলে ধরে। এর মধ্যে ঢাকা থেকে প্রকাশিত নতুন দিন, চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত প্রগতিশীল, ফেনী থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক সংগ্রাম, সিলেট থেকে প্রকাশিত নওবেলাল উল্লেখযোগ্য।

সেসময় মাসিক পত্রিকা অগত্যা-ও ভাষার দাবি আদায়ে কাজ করেছে পাতায় পাতায়। বাংলাভাষী মানুষের প্রতি সমর্থন জানিয়ে এটি লেখা প্রকাশ করত। তবে আর্থিক অসামর্থ্যের কারণে ১৯৫২ সালের মার্চ মাস থেকে পত্রিকাটির সম্পাদনা বন্ধ হয়ে যায়।

তবে সেসময় মর্নিং নিউজ পত্রিকাটি ছিল ভাষা আন্দোলনের বিপক্ষে। তারা তাদের পত্রিকায় ভাষা আন্দোলনের তীব্র বিরোধিতা করে নানামুখী প্রচারণা চালাতে থাকে। এ কারণে তৎকালীন বাংলা ভাষার দাবিদাররা তাদের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে ভিক্টোরিয়া পার্কের কাছে অবস্থিত পত্রিকাটির প্রেস ও অফিস জ্বালিয়ে দেয়।

এছাড়া দৈনিক সংবাদ পত্রিকার অধিকাংশ সাংবাদিক ভাষা আন্দোলনকে সমর্থন করলেও মালিক পক্ষ ছিল ভাষা আন্দোলনের বিপক্ষে। তাই ২১শে ফেব্রুয়ারির কথা পত্রিকাটি কম গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছিল। ফলে ২২শে ফেব্রুয়ারি পত্রিকাটির অফিসে হামলা চালায় বিক্ষুব্ধ জনতা।

ভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতির কাছে এক গর্বের বিষয়। রক্ত দিয়ে মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার সমুন্নত রাখার নজির পৃথিবীতে বিরল। আর তাই এটিকে স্মরণীয় করে রাখতে পৃথিবীর অনেক দেশেই দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করা হয়। আর এ ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরতে ভূমিকা রেখেছিল সে সময়কার সংবাদপত্রগুলো।

তানজিম হাসান পাটোয়ারী বর্তমানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও ইন্স্যুরেন্স বিভাগের তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়ন করছেন।

tanjimhasan001@gmail.com

Share if you like