Loading...

শেষপর্যন্ত তোমাকে চাই : গানওয়ালা সুমন

| Updated: March 19, 2022 15:00:36


শেষপর্যন্ত তোমাকে চাই : গানওয়ালা সুমন

১৯৯২ সালের কলকাতা, কিশোর-শ্যামল-হেমন্তের প্রয়াণের পর বাংলা গানে তখন একরকম শূণ্যতা। ভালো গায়কেরা আছেন, তবে একেবারে ধাক্কা দেবার মতো কাজ আসছে না। 

সুরকারদের ভেতর নচিকেতা ঘোষ- সুধীন- হেমন্ত কেউ বেঁচে নেই। সলিল চৌধুরী তখন জীবনের অস্তরাগে। বাপ্পি লাহিড়ীর খুব ভালো সময় তখন, আর সাথে আছে ডিস্কো গান।

গৌরীপ্রসন্নের মৃত্যুর পর পুলক ব্যানার্জী দু'হাতে প্রচুর লিখছেন। কিন্তু গানের সেই কাব্যময়তা তখন আর নেই। হয়ত তোমারি জন্য-র পুলক লিখছেন তখন উরি উরি বাবা কিংবা বলো বলো সুন্দরী

এসব গান জনপ্রিয় তো হচ্ছে, কিন্তু কোথাও একটা কমতি যেন থেকেই যাচ্ছে। এমন সময় একদিন কলকাতার সিডির দোকানগুলোয় বাজতে শোনা গেলো নতুন একটা গান, গায়কও নবীন। বয়সের দিক থেকে নন, কিন্তু সঙ্গীতজগতে। তার সেই গান রাতারাতি ঝড় তুলে ফেলে পশ্চিমবাংলার সঙ্গীতাঙ্গনে। 

তোমাকে চাই এবং জীবনমুখী গান

অ্যালবামটার নাম তোমাকে চাই। টাইটেল গানটা তখনি মেগা-হিট।

প্রথমত আমি তোমাকে চাই, দ্বিতীয়ত আমি তোমাকে চাই, তৃতীয়ত আমি তোমাকে চাই

শেষপর্যন্ত তোমাকে চাই.......

সুমন একটা সিগারেট নিয়ে লিখেছিলেন গানটা। আর তার ভেতর মিশে গেলো বিক্ষোভ-বিপ্লব, শ্রেণিহীন সাম্যবাদী সমাজ। ফিরে এলেন হিমাংশু দত্ত কিংবা সলিল চৌধুরী। সুমন গাইলেন - ভীষণ অসম্ভবে তোমাকে চাই! 

এভাবে বাংলা গানে প্রেম ও দ্রোহের মিশেলে নিয়ে এলেন জীবনমুখী গানের ধারা। মোহিনী চৌধুরী, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, সলিল চৌধুরী, ভূপেন হাজারিকাদের অভাবটা পূরণ করলেন। আবার রবীন্দ্রনাথ, গৌরীপ্রসন্নের প্রেমটাও নিয়ে এলেন গানে।

সুমন অবশ্য তখনো কবীর সুমন হননি। তিনি তখন চট্টোপাধ্যায়, ব্রাহ্মণ। কবীর সুমন হন বাংলাদেশের প্রখ্যাত গায়িকা সাবিনা ইয়াসমিনকে বিয়ে করে৷ গুজরাটে দাঙ্গায় মুসলিম নিধনও তার ধর্ম পরিচয় পরিবর্তনে বড় ভূমিকা রেখেছে।

তবে কবীর নামটা আবার তিনি নিয়েছিলেন সন্ত কবীরের নাম থেকে, যিনি দোঁহা গানের জন্য সমধিক খ্যাত ও প্রান্তিক মানুষদের নিকটজন।

সুমনের এই এলবামের 'পেটকাটি চাঁদিয়াল', 'কখনো সময় আসে', 'আমাদের জন্য' - সহ সব গানই অনেক হিট করে।

এর ধারাবাহিকতায় আমরা পাই অঞ্জন দত্ত, নচিকেতা, শিলাজিত, পল্লব কীর্তনীয়াসহ আরো অনেক শিল্পীকে।

গানওয়ালা সুমন

সুমনের গানের শুরু কিন্তু ঠিক ১৯৯২ সালে নয়। ১৯৬৬-৬৭ এর দিক থেকে রেডিওতে গাইতেন। ১৯৭২ সালে দুটো রেকর্ড বেরোয় রবীন্দ্রসঙ্গীতের। এরপর ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র সুমন ব্যাংকের চাকুরে হলেন। তারপর সাংবাদিকতার কাজ নিয়ে বিদেশে।

১৯৮৯ সালে দেশে ফিরে ঠিক করেন গানবাজনা নিয়েই থাকবেন। কৈশোরের প্রেম কাজের ব্যস্ততায় সরে গিয়েছিল দূরে; বাকি জীবনটা গান নিয়েই থাকতে চাইলেন তিনি।

প্রথম প্রথম তেমন সাড়া পাননি। বামপন্থী চিন্তার অধিকারী সুমন সিপিএমের দুয়েকটা সভায় গিটার নিয়ে গেয়েছেন; তেমন সাড়া পড়েনি। এরপর তোমাকে চাই এলো এবং বাকিটা ইতিহাস।

সুমন তার এলবাম 'গানওয়ালা'-য় আরো ছাড়িয়ে গেলেন নিজেকে।

'ঘাতকের ষড়যন্ত্র, সভ্য আণবিক অস্ত্র/ অর্থহীন যত যুদ্ধ, এই অর্থহীন অপচয়' (আমি যাকে ভালোবাসি)-এর মতো লাইন লিখে দৃঢ় বার্তা দিলেন যুদ্ধের বিরুদ্ধে।

কিংবা সারারাত জ্বলেছে নিবিড় গানে বড় বেরঙিন আজকাল, কোনো রঙ পাইনা, তাই দিতে পারিনা কিছু থেকে এ চাওয়ার রঙ নাও তুমি, আগামীর রঙ দাও তুমি - সুমন নিরন্তর আশাবাদী করে গেছেন তরুণদের। 

বিরোধীকে বলতে দাও

সুমনের গানের বড় বিষয় তার লিরিক। কম্পোজিশনেও পাশ্চাত্য ধ্রুপদী ধাঁচ দেখিয়েছেন মুন্সিয়ানা। তবে তার লিরিকে তিনি ছিলেন বিপ্লবী। যেমন - বানতলার ঘটনায় যখন অনেকে চুপ, তখন সুমন গাইলেন অনিতা দেওয়ান ক্ষমা করো

নিজে সারাজীবন সমাজতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাসী হলেও দলদাসত্ব তাকে কখনো স্পর্শ করেনি। গানেই বলেছেন- বিরোধীর দৃষ্টি দিয়েও সবাই নিজের হিসেব নিক।

আবার সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সময় গিটার নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরেছেন। 'হুল' (২০১০)-এর মতো অ্যালবাম করেছেন।

তৃণমূল কংগ্রেসের হয়ে এমএলএ হলেও কার্টুনিস্ট গ্রেফতার থেকে শুরু করে চিটফান্ড ইস্যুতে তার দলের বিরুদ্ধেও সরব থেকেছেন। যদিও তার তৃণমূল সংশ্লিষ্টতা বিভিন্ন সময় অনেককে আহতও করেছে।

পদ্যের দায় নেই হিসেব দেবার

সুমন আজন্ম নিজেকে পরিচয় দিয়েছেন 'আরবান নকশাল' বলে। তবে গানে অসাধারণ হলেও ব্যক্তিগত কিছু বিষয় রয়ে গেছে চাঁদের কলঙ্কের মতো। যেমন- তার জার্মান স্ত্রী মার্গারিটাকে নির্যাতনের অভিযোগ। গ্রেফতার হতে পারতেন সুমন, তবে পেয়েছিলেন আগাম জামিন। সম্প্রতি সাংবাদিকের সাথে দুর্ব্যবহার কিংবা কবি শ্রীজাতর স্ত্রীকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ লেখাও থাকবে এই তালিকায়।

এসব বিষয় ব্যক্তি সুমনের ইমেজকে ক্ষতিগ্রস্থ করেছে সন্দেহ নেই, তবে গানের সুমন এরপরও শ্রোতার নিকট ভীষণভাবেই প্রাসঙ্গিক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ফাহিম শিহাব রেওয়াজ যেমন বললেন, “কবীর সুমনের গানে আছে বিদ্রোহ-তেজ-আশা – তার গান ভালোবাসি।” 

 

বাতাসে তোমার স্পর্শ ছেলেবেলার মত ডাকছে

১৯৪৯ এর ১৬ মার্চ জন্মানো সুমন পার করেছেন জীবনের ৭৩ টি বসন্ত। এখন তিনি ব্যস্ত বাংলা খেয়াল নিয়ে।

নিজের ইউটিউব চ্যানেলে নিজেই কথা বলেন গান নিয়ে, জীবন নিয়ে। 'বেজে ওঠা স্মৃতি' নামের এই সিরিজে সুমন স্মৃতির অর্গল খুলে বলে চলছেন তার জীবনের কথা।

প্রথম গান নিয়ে তার প্রেমের শুরু বড়ে গুলাম আলীর 'তেরে তিরছি নজরোঁকে বান' থেকে। তখন তার বয়স কেবল ৭ বছর। রেডিওতে শুনে শুনে গুনগুন করতেন গানটি। তারপর ক্লাসিকাল শেখা, রবীন্দ্রগীতির প্রতি অনুরাগ। তারপর তো গিটার হাতে গান।

সেই ৪৩ বছর বয়সে শুরু করেছিলেন গান। তারপর পেরিয়ে গেলো ত্রিশটা বছর। এ  বয়সে এসেও সমাজ-রাষ্ট্র নিয়ে ভাবেন। দীর্ঘ মনোলগ প্রকাশ করেন বিভিন্ন বিষয়ে। 

ক্লাসিকালে প্রচণ্ড দক্ষ সুমন এখন শিক্ষার্থীদের খেয়ালের তালিম দিতেই ব্যস্ত। আর তো রয়েছে স্মৃতিচারণা। তার শৈশব-কৈশোরের রঙিন স্মৃতিতে অবগাহন। নিজের গানেই (জাতিস্মর)  বলেছেন- অমরত্বের প্রত্যাশা নেই, নেই কোন দাবি-দাওয়া/ এই নশ্বর জীবনের মানে শুধু তোমাকেই চাওয়া।'' কিংবা 'আবার আসবো আবার বলবো শুধু তোমাকেই চাই। 

জানিনা গিটার কেন আমার প্রেমের রাজধানী

                                                                  

"সুমন আমাকে চিনিয়েছেন গিটার ও কবিতাকে একসাথে কিভাবে কথা বলাতে হয়। আমি কবিতা লেখা শুরু করি গিটার বাজানোর অনেক আগে থেকে। কবিতা ও সুমনের গান ছিল প্রেরণা। শুধুমাত্র গানের কথায় ও সুরে অবাক করে দিয়েছেন দিনের পর দিন । তার গানের কথাগুলোতে একইসাথে বিরাজমান থাকে মানুষের কথা বারুদ কিংবা প্রেম অথবা বিরহ। অথবা তার গানে যখন পাই মানুষের জেগে ওঠার আকুতি তখন নিজেই যেন জেগে উঠি!”

কথাগুলো বলছিলেন এ সময়ের কবি, গিটারিস্ট ও গায়ক মূয়ীয মাহফুজ।

সুমনের সকল গানেই মানুষের প্রতি অসম্ভব ভালোবাসা, প্রেম খুঁজে পান তিনি। যেকোনো রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও জুলুমের বিরুদ্ধে গানে গানেই তিনি সোচ্চার। আসলে যেকোনো সচেতন শিল্পীর ক্ষেত্রে সেটাই স্বাভাবিক, কেননা ইতিহাস তো আসলে মানুষের শ্রমে-ঘামে গড়া।

তিনি আরো যোগ করলেন, “বব ডিলানের ব্লোয়িং ইন দ্য উইন্ড গানটির কি সহজ সাবলীল এক প্রাণময় রূপ তিনি দিয়েছেন! 'দি এনস্যার মাই ফ্রেন্ড ব্লোয়িং ইন দ্য উইন্ড' এর বাংলা তিনি করেছেন 'প্রশ্নগুলো সহজ আর উত্তর তো জানা।' এর চাইতে সুন্দর অনুবাদ সত্যিকার অর্থে আমি কখনো দেখিনি কাউকে করতে।”

“কিংবা সাউন্ড অভ  সাইলেন্স এর ভাবানুবাদ এর মতন অসাধারণ রুপ বোধকরি সুমন বাদে আর কারো পক্ষেই সম্ভব ছিল না।”

মূয়ীয মনে করেন, সুমনের এ অনুবাদগুলোর কারণে গানগুলোকে আরো গভীরভাবে অনুভব করতে সক্ষম হয়েছে এ প্রজন্ম। বাংলাদেশে এসে সুমন জাদুঘরে একটি কনসার্ট করেছিলেন, সেখানে হলভর্তি দর্শক সুমনের সাথে গলা মিলিয়েছিল আনন্দিত চিত্তে।সুমনের সার্থকতা এখানেই যে তার গানগুলো বাজে মনে মনে ও প্রাণে প্রাণে।

নিজের অণুপ্রেরণা হিসেবে সবসময় সুমনকে দেখে এসেছেন তিনি৷ বলছিলেন সে কথাই- “সুমনের একটি গিটারে গান করার অপূর্ব দক্ষতা প্রেরণা দিয়েছে আমার মতো আরো অনেককে। কবিতা লেখার অভ্যাস অনেকটা সুমনকে সামনে দাঁড় করিয়ে রেখেই গান বানানোর শক্তি দিয়েছে।”

মূয়ীযের অনেক কথাই যেন সুমন আগেই বলে দিয়েছেন, এমনটাই মনে হয় তার। মনে হয় যেন "জানিনা গিটার কেন আমার প্রেমের রাজধানী" - এ লাইনগুলো তারই লেখার কথা ছিল!

“মনে হয় যেন আমার লিখিতব্য সকল গান গুলোই সুমন লিখে ফেলেছেন। বারবার মনে হয় আমার এই ব্যর্থ গায়ক জীবনের একমাত্র সফলতা যেন সুমনের নানান গানের ভিন্ন আঙ্গিকে উৎপাদন ও পুনরুৎপাদন করা।”

গড়িয়াহাটার মোড় বাস বাস মিনিবাস/ বাসের টারমিনালে

রোগা রোগা কন্ডাক্টর, সব আমাদের জন্য!

গানের এই গড়িয়াহাটার মোড় সুমন দেখতে পান বাংলাদেশের গুলিস্থান, গাবতলী সকল জায়গায়। সুমনের গানের সার্বজনীনতা এমনই যে তার গান নিয়ে যায় অতি নিজস্ব জগতের গানে উল্লিখিত সেসব স্মৃতিতে, স্থান-কাল প্রতিস্থাপিত হয় ব্যক্তির ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দ্বারা।                                                                 

বেঁচে থাক সব্বাই, হাতে হাত রাখা থাক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরমেন্স স্টাডিজের শিক্ষার্থী রাফায়াতুল্লাহ সোহান বেড়ে উঠেছেন সুমনের গান শুনে। তিনি বললেন, “জীবন, যাত্রা- আমার সবকিছু জুড়েই থাকেন  কবীর সুমন। সেই ছোটবেলায় প্রথম শুনেছিলাম 'ও গানওয়ালা'। সেই থেকেই কবীর সুমনের সাথে পথচলা।”

সুমনের প্রতিটা গানে জীবনের প্রতিচ্ছবি দেখেন সোহান, নিজের জীবনও গড়ে তোলেন গানের কথামতই।

“সেই ‘হাল ছেড়োনা’ থেকে 'প্রথম সবকিছু' প্রত্যেকটা গানই হয় আমি আমার জীবনের সাথে মিলে গেছে, অথবা আমি আমার জীবনকে সেই গানের সাথে মিলিয়ে নিয়েছি। প্রেমে পড়েছি 'তোমাকে চাই' শুনে। বিকেলের রক্তিম আলোয় মেঘের ওপারে হারিয়ে গিয়েছি 'একলা হতে চাইছে আকাশ' শুনে৷ কবীর সুমনের গান এই পৃথিবীতে না থাকলে হয়তো বেঁচে থাকাটাই কঠিন হয়ে যেতো আমার জন্য!"

কবীর সুমন যে একালের তরুণ শ্রোতা আর গায়ক, সকলের মাঝেই বেঁচে আছেন ভীষণভাবে, সে অভিব্যক্তিই যেন প্রকাশ পেয়েছে সোহানের কথায়। সামনেও তার গানে মাতবে ছেলে-বুড়ো সবাই, গানের সুমন আর সুমনের গান দুটোই মাতিয়ে রাখবে শ্রোতাদের।

মাহমুদ নেওয়াজ জয় বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষে পড়াশোনা করেছেন।

mahmudnewaz939@gmail.com

Share if you like

Filter By Topic