দেশের বিভিন্ন বন্দরে শুল্ক বিভাগের জন্য বিভিন্ন নথিপত্র দাখিল ও কাগজপত্রের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে গিয়ে ব্যবসায়ীদের একদিকে যেমন পণ্য খালাস বা জাহাজীকরণে দেরি হচ্ছে, অন্যদিকে তাদেরকে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
শুল্ক ও বন্দর প্রশাসন থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, শতকরা ৫০ ভাগ ক্ষেত্রে আমদানিকৃত পণ্য খালাসের ক্ষেত্রে প্রায় ৭২ ঘণ্টার মতো সময় লেগে যায়। আবার শতকরা ৩৮ ভাগ ক্ষেত্রে নথির সব নিয়ম-কানুন মেনে পণ্য খালাসের ক্ষেত্রে আমদানিকারকদের ৭২ ঘন্টা থেকে কখনো কখনো ১৫০ ঘণ্টা অবধি সময় লেগে যায়।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি বা বিডা)-এর ওয়েবসাইট থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
এতে দেখা যায় যে শতকরা ১২ ভাগ ক্ষেত্রে আমদানিকৃত পণ্য খালাসের পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ১৫০ থেকে ২৭৫ ঘণ্টা সময়ের প্রয়োজন হয়ে থাকে।
আবার নথি অনুযায়ী পণ্য খালাসের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে বন্দর দিয়ে আমদানিকৃত পণ্যসমূহের প্রতিটির বিল অব এন্ট্রির জন্য দশমিক ৫৯ মার্কিন ডলার বা প্রায় ৫০টাকা ব্যয় হয়।
প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে, রপ্তানির ক্ষেত্রে নথি অনুযায়ী পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ২৪ ঘণ্টা সময় প্রয়োজন; যেখানে বন্দরেই লেগে যায় ২২ ঘণ্টা।
অবশ্য পণ্য খালাসের সময় এবং খরচের বিষয়ে শুল্ক ও বন্দর প্রশাসন যে দাবি করেছে, সে ব্যাপারে রপ্তানিকারকরা আপত্তি জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, বন্দর থেকে আমদানিকৃত পণ্য খালাসের ক্ষেত্রে ৩০ দিন পরযন্ত সময় লেগে যায়।
বন্দর থেকে পণ্য খালাসের ক্ষেত্রে কিছু হিডেন চার্জ বা সুপ্ত ব্যয় থাকার বিষয়েও তারা অভিযোগ জানিয়েছেন। এর ফলে ভোক্তা পর্যায়ে গিয়ে পণ্যের মূল্য বেড়ে যায়।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলামের সভাপতিত্বে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিডার একটি ভার্চুয়াল বৈঠকে পণ্য আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে খরচ ও সময় বিষয়ক এ তথ্যগুলো উপস্থাপন করা হয়েছিল। দেশের ব্যবসাক্ষেত্র সহজ করার লক্ষ্যে এই সূচকগুলো উন্নয়নের বিষয়ে আলোকপাতের জন্য এ বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছিল।
বিনিয়োগ উন্নয়নের সাথে সম্পৃক্ত কর্মকর্তারা বলেছেন, বাইরের দুনিয়ার সাথে ব্যবসার ক্ষেত্রে যে সময় এবং খরচের বিষয়ে বিডা বেসরকারি খাত থেকে কোনো ইতিবাচক বার্তা পায়নি।
আমদানিকারকরা বলেছেন, বাজারে টিকে থাকার জন্য সীমান্ত ও বন্দরের মাধ্যমে বাণিজ্য সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে সময় এবং খরচ কমাতে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজ (সিসিএইচ) বা চট্টগ্রাম শুল্ক বিভাগ (সিসিএইচ) এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (সিপিএ) উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
এ প্রসঙ্গে এ.টি.এস অ্যাপারেলস লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক মুহাম্মদ আব্দুস সালাম বলেন, বাংলাদেশে পণ্য খালাসের ক্ষেত্রে যে সময় এবং খরচের প্রয়োজন হয়, তা ভিয়েতনামের মতো অন্যান্য আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় অনেক বেশি। তিনি বলেন, ভিয়েতনামে শুল্ক বন্দরে জাহাজ থেকে আমদানিকৃত পণ্য খালাসের পর তা কারখানায় পৌঁছতে ৪৮ ঘণ্টা সময় লাগে।
জনাব সালাম আরো বলেন যে যেহেতু বন্দরের খরচের উপর ভ্যাট এবং অন্যান্য ট্যাক্স আরোপিত রয়েছে, তাই নথি অনুযায়ী পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সেখানেও কিছু অলিখিত খরচ দিতে হয়।
বৈঠকের কার্যবিবরণী অনুসারে,আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সঠিক তথ্য প্রদানের জন্য সকল আমদানিকারক, রপ্তানিকারক ও মালামাল পরিবহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সচেতন করতে বিডা কাজ করবে বলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
বিডা’র ব্যবস্থাপক জীবনকৃষ্ণ সাহা রায় বলেছেন, শুল্ক ও বন্দর কর্তৃপক্ষ বন্দরে প্রয়োজনীয় যে খরচ ও সময়ের কথা বলেছে, তা কমানোর জন্য লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ন্যাশনাল কমিটি ফর মনিটরিং ইমপ্লিমেনটেশন অব ডুয়িং বিজনেস রিফর্মস (এনসিএমআইডি) এর সর্বশেষ বৈঠক অনুযায়ী, অংশীদাররা লক্ষ্য বাস্তবায়নের ব্যাপারে কাজ করতে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
জনাব রায় বলেছেন, “সময় ও খরচ কমানো এবং এ মর্মে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের ব্যাপারে বিডা অভ্যন্তরীণ সম্পদ অধিদপ্তর ও পরিবহণ মন্ত্রণালয়কে সকলকে অবগত করার ব্যাপারে সুপারিশ করবে।”
তবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রথম সচিব আমিমুল এহসান খান বলেন, আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যে বিলম্ব হয়ে থাকে, সেখানে শুল্ক বিভাগ একা দায়ী নয়। কেননা, এই বাণিজ্যের সাথে ৬০টি প্রতিষ্ঠান জড়িত।
তিনি বলেন, “শুল্ক কর্তৃপক্ষ মাশুল পরিশোধসহ বেশিরভাগ প্রক্রিয়াই অনলাইনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করার ব্যবস্থা চালু করে ফেলেছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কার্যক্রমগুলো স্বয়ংক্রিয় না করায় ব্যবসায়ীরা এর সুফল ভোগ করতে পারছেন না।“
তিনি সহজে ব্যবসা করার সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান নিচের দিকে হওয়ার কারণ হিসেবে ‘ইজ অফ ডুইং বিজনেস রিপোর্ট’ তৈরির সময় তিনি বিশ্ব ব্যাংকের তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়াকে দায়ী করেন।
তিনি আরো বলেন, “ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো (এনএসডব্লিউ) প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে শুল্ক বিভাগ সংশ্লিষ্ট ৩৮টি সংস্থার সাথে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে যার ফলে ব্যবসায়ীগণ এক ছাদের নিচে সকল ধরনের সেবা পেয়ে যাবেন”।
পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ এ প্রসঙ্গে বলেন, বিশ্ব বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি ক্ষেত্রের প্রসার এবং প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির জন্য কার্যকর ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত বাণিজ্য সুবিধা অত্যাবশ্যক।
তিনি বলেন, “বিশ্ব ব্যাংকের র্যাংকিংয়ের আওতায় বৈশ্বিকবাণিজ্যের ক্ষেত্রে যে সংস্কারগুলো নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বাস্তবায়ন করলে এই লক্ষ্যগুলো পূরণে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সংস্কারকাজ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে কি না, তা নিরূপণের জন্য ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট সুবিধাভোগীদের মতামত মূল্যায়ন করা জরুরি।:
মাসরু রিয়াজ আরো বলেন, বন্ডেড ওয়্যারহাউস এবং বাণিজ্য নীতি আধুনিকীকরণের মতো বড় কিছু বিষয়ও রয়েছে যেগুলোর ওপর ব্যবসাক্ষেত্র উন্নয়নের জন্য আলোকপাত করা জরুরি।
এদিকে বিডার বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে যে বন্দরে পণ্যবাহী জাহাজ পৌঁছানোর আগেই পণ্য খালাসের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দাখিল এবং সেগুলো নিয়ে কাজ শুরুর ব্যাপারে অনুমতি প্রদানের জন্য অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ ও পরিবহন মন্ত্রনালয় কাজ করবে।
doulot_akter@yahoo.com
