ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে কর্মজীবন কিংবা সাংস্কৃতিক জীবন; সর্বক্ষেত্রেই নিজের ব্যক্তিত্বকে ফুটিয়ে তুলতে প্রয়োজন শুদ্ধ, সাবলীল উচ্চারণ।
একজন মানুষের উচ্চারণ, কথা বলার ধরন, কিংবা বাচনভঙ্গী যদি সুন্দর হয়, সেটি ব্যক্তির গ্রহণযোগ্যতা অন্যদের কাছে বাড়াতে সাহায্য করে। মানুষ সুন্দরের ভক্ত। আর কথার মাঝে শুদ্ধ উচ্চারণও সেই সৌন্দর্যের দাবিদার যা কথাকে শ্রুতিমধুর করার পাশাপাশি নিজের অবস্থানকে সবার মাঝে আরো সুদৃঢ় করতে ভূমিকা রাখে।
কথা হয় চট্টগ্রামে কণ্ঠনীড় বাচিক শিল্পচর্চা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি সেলিম রেজার সঙ্গে, যিনি উচ্চারণে আর ভাব প্রকাশে শুদ্ধতার চর্চা করেন, করতে শেখান।
“একজন মানুষের ব্যক্তিত্ব কয়েকটি জিনিসের মাধ্যমে ফুটে ওঠে যার মধ্যে একটি হলো শুদ্ধ উচ্চারণ। কারণ কথা বলার সময় উচ্চারণ যদি ঠিক না হয় তাহলে মানুষ সে কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনতে চায় না। এর ফলে বক্তা নিজেও এক ধরনের অতৃপ্তি বোধ করেন।”
আর কর্মজীবন তো সঠিক উচ্চারণ আর সঠিক যোগাযোগ ছাড়া চলবেই না। অফিসে সহকর্মী কিংবা বসের সাথে সামান্য ভুল যোগাযোগে চলে যেতে পারে চাকরি, ঘটতে পারে দুর্ঘটনাও।
“কর্মজীবনে একজন কর্মীকে দল পরিচালনা, অধস্তনদের নির্দেশ প্রদান কিংবা ব্যবসায় সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সাথে যোগাযোগ করতে হয়। আর এসব ক্ষেত্রে শুদ্ধ উচ্চারণ সাবলীল ও নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি সাংবাদিকতা, উপস্থাপনা, মার্কেটিং ইত্যাদি ক্ষেত্রেও উচ্চারণ শুদ্ধ ও সঠিক না হলে তা নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।”
উপস্থাপনার ক্ষেত্রে শুদ্ধ উচ্চারণের গুরুত্ব নিয়ে কথা হয় আবৃত্তিশিল্পী আচরারুল হক এর সঙ্গে। তার মতে, কেউ যখন শুদ্ধ উচ্চারণে কথা বলেন কিংবা একজন উপস্থাপক শুদ্ধ উচ্চারণের মাধ্যমে উপস্থাপনা করেন, তখন সহজে তাদের বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে যায় ও মনে দাগ কাটে।
“সুন্দর করে কথা বলার যোগ্যতা একজন ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেয়। ফলে ঐ ব্যক্তি হয়ে ওঠেন সবার কাছে আরো বেশি গ্রহণযোগ্য।”
এছাড়া তিনি আরো বলেন, “দেশের সব অঞ্চলের মানুষের জন্য একটি সর্বজনবোধ্য আদর্শ ভাষা গঠনের জন্যও এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।”
অনেকের কথাতেই আঞ্চলিকতার টান থাকে যা সহজে চলে যায় না। এর জন্য প্রয়োজন অনুশীলন এবং কিছু বিষয়ের সচেতন প্রয়োগ।
এ বিষয়ে কথা হয় বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) চট্টগ্রাম কেন্দ্রের উপস্থাপিকা এবং আবৃত্তিশিল্পী শারমিন মুস্তারি নাজুর সঙ্গে। তিনি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করেন যে কোনো কিছু শেখার পেছনে মূল যে বিষয়টি প্রয়োজন, সেটি হলো নিজের প্রবল ইচ্ছাশক্তি ও পরিশ্রম।
“বর্তমানে বিভিন্ন সংগঠন শুদ্ধ উচ্চারণের উপর বিভিন্ন মেয়াদের কর্মশালার আয়োজন করে থাকে, যেগুলো শুদ্ধ উচ্চারণ শেখা এবং চর্চার একটি মাধ্যম হতে পারে। এছাড়া বাজারে এ বিষয়ক কিছু বইও পাওয়া যায় যেগুলো এক্ষেত্রে ফলপ্রসূ হতে পারে।”
“পাশাপাশি যারা নিয়মিত শুদ্ধ উচ্চারণে কথা বলেন তাদের কথা কিংবা উপস্থাপনা শুনে বা পর্যবেক্ষণ করেও একজন ব্যক্তি তার ভুলগুলো শুধরে নিতে পারেন।”
প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শুদ্ধ উচ্চারণের অনুশীলনে যাদের হাতে সময় নেই খুব একটা, তাদের জন্য ইউটিউবেই আছে হাজারো কন্টেন্ট। তবে প্রধান শর্ত একটাই, নিয়মিত অনুশীলন।
“যে মধ্যমেই একজন মানুষ শুদ্ধ উচ্চারণ শেখার চেষ্টা করুক না কেন, তাকে অনেক বেশি অনুশীলন করতে হবে। কারণ ভুল হবে নাকি শুদ্ধ হবে এই দোটানায় থেকে কথা কম বললে কখনোই শুদ্ধ উচ্চারণ শেখা হবে না,” বলেন শারমিন।
প্রত্যেক ভাষারই কিছু নিজস্ব নিয়ম-কানুন থাকে যেগুলো শুদ্ধভাবে প্রয়োগের মাধ্যমে ভাষা হয়ে ওঠে আরো সুন্দর ও সাবলীল।
রক্তের বিনিময়ে পাওয়া আমাদের বাংলা ভাষাটিও ব্যতিক্রম নয়। অপপ্রয়োগের ফলে যে কোনো ভাষাই তার সৌন্দর্য হারায়। তাই ভাষার ব্যবহারে অধিক সচেতন হওয়া বাঞ্ছনীয়।
তানজিম হাসান পাটোয়ারী বর্তমানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও ইন্স্যুরেন্স বিভাগে তৃতীয় বর্ষে পড়াশোনা করেছেন।
tanjimhasan001@gmail.com
