আইব বুঝি আইব দুলা, আর কিছুক্ষণ পরে
তাই নলেন গুঁড় আর খেজুরের রস কিন্ন্যা রাখসি ঘরে।
ভাপা পিঠা কইরা রাখসি,রসে খাইবার লাইগ্যা
চিতুই পিঠা ফুইল্যা উঠসে, রসে চুয়াই থাইক্যা।
নলেন গুঁড়ের পিঠা,পায়েস দিমু মজা করে তাই
তাই নলেন গুঁড় আর খেজুরের রস কিন্ন্যা রাখসি ঘরে।
ছোটবেলায় এ গানটি শেখার প্রতি আলাদা টান কাজ করতো শুধুমাত্র পিঠা-পুলির নামের কারণে। গানটি আমাদের গ্রামীণ লোকজ ও নান্দনিক সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ। এ ধরনের বহু লোকজ গান রয়েছে যা আমাদের পুরনো সব ইতিহাস-ঐতিহ্যের কথা মনে করিয়ে দেয় এক নিমিষেই।
মায়েরা শীতকাল এলেই চালের গুড়ি করানো শুরু করতেন। পুরানো চালের পিঠাপুলি নাকি খেতে দারুণ হয়। মা যখন ভেজানো আতপ চাল শুকিয়ে গুড়ি করার জন্য দোকানে পাঠাতেন, তখনই আমরা অপেক্ষার প্রহর গুনতে শুরু করতাম মুখরোচক সব পিঠার জন্য। ছোটবেলার এসব মুহূর্তগুলো আজ চাইলেও ফিরে পাওয়ার সুযোগ নেই।
সংস্কৃত সাহিত্যমতে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রাচীনকাল থেকেই পিঠা খাওয়ার চল রয়েছে। হেমন্তে নবান্নের নতুন ধান ঘরে উঠার সাথে সাথে গ্রাম-বাংলার নারীরা চালের গুড়ি বানাতে ব্যস্ত সময় পার করতো ঢেঁকিতে। সময়ের সাথে আজ ঢেঁকি হারালেও পিঠা হারিয়ে যায়নি।
অবশ্য শীতের রাতে চুলার পাশে গোল করে সবাই বসে পিঠা বানানো, আর ঘুম থেকে উঠেই ছোট্ট ছেলেমেয়েদের পিঠা খেতে বসে যাওয়ার দৃশ্যগুলো এখনও গ্রাম বাংলায় দেখা মিলে।
বাঙালির ঘরে ঘরে পুরোদমে পিঠা খাওয়া শুরু হয় মাঘ মাসে আর শেষ হয় ফাল্গুনে। অগ্রহায়ণ-চৈত্রেও কিছু কিছু পিঠা খাওয়া হয়, যদিও পিঠে খাওয়ার হইহই রইরই মজা তখন আর থাকে না।
প্রায় ৫০০ বছরের পুরনো বই অন্নদামঙ্গল, চৈতন্যচরিতামৃত কাব্য ও ময়মনসিংহ গীতিকার কাজল রেখা আখ্যানেও পরিচয় মেলে শীতের বাহারি পিঠার। এই পিঠা খাওয়াকে কেন্দ্র করেই বাংলাদেশের বিখ্যাত কবি সুফিয়া কামাল তার পল্লী স্মৃতি কবিতায় উল্লেখ করেন-
পৌষ পার্বণে পিঠা খেতে বসি খুশীতে বিষম খেয়ে,
আরও উল্লাস বাড়ায়াছে মনে মায়ের বকুনি পেয়ে
বাংলাদেশে ইতোমধ্যে শীতের হিমেল হাওয়া এসে গেছে। শহরাঞ্চলে গলির মোড়ে ভ্যানে করে পিঠা নিয়ে বসে পড়েছে বিক্রেতারা। শহুরে ব্যস্ততায় এই পিঠা বিক্রি করা মানুষগুলোই পিঠা-পুলির সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
পিঠা হলো চালের গুড়ি, ডালবাটা, গুড়, নারকেল, চিনি, সুজি, ইত্যাদির মিশ্রণে তৈরি মিষ্টান্নবিশেষ। চালের গুঁড়ার সঙ্গে প্রয়োজনমাফিক বিভিন্ন উপকরণ যোগ করা হয় ভিন্ন স্বাদের সব পিঠা তৈরিতে।
মূলত, ভাজা ও ভাপা - দুটো রুপে পিঠা বানানো হয়। এই ভাজা ও ভাপা দুই ধরনের পিঠা কখনো দুধে চুবিয়ে হয় দুধপিঠা, কখনো চিনি অথবা গুড়ের শিরায় বা খেজুরের রসে ভিজিয়ে হয় রসের পিঠা।
ক্ষীরপুলি, চন্দ্রপুলি, পোয়া পিঠা, ভাপা পিঠা, ছাঁচ পিঠা, ছিটকা পিঠা, আস্কে পিঠা, চাঁদ পাকন পিঠা, সুন্দরী পাকন, সর ভাজা, পুলি পিঠা, পাতা পিঠা, পাটিসাপটা, মুঠি পিঠা, আন্দশা, লবঙ্গ লতিকা, নকশি পিঠা, মালপোয়া, মেড়া পিঠা, মালাই পিঠা, কুলশি, কাটা পিঠা, কলা পিঠা, খেজুরের পিঠা, ক্ষীরকুলি, গোকুল পিঠা, গোলাপ ফুল পিঠা, রসফুল পিঠা, সরভাজা - পিঠার প্রকারভেদের শেষ নেই।
এছাড়াও আছে নারকেলের সেদ্ধ পুলি, নারকেল জিলাপি, তেজপাতা পিঠা, তেলের পিঠা, তেলপোয়া পিঠা, পানতোয়া, জামদানি পিঠা, হাঁড়ি পিঠা, ঝালপোয়া পিঠা, ঝুরি পিঠা, ছাঁচ পিঠা, বিবিখানা, চুটকি পিঠা, চাপড়ি পিঠা, ঝিনুক পিঠা, সূর্যমুখী পিঠা, ফুল পিঠা, বিবিয়ানা পিঠা, সেমাই পিঠা, নারকেল পিঠা, নারকেলের ভাজা পুলি, দুধরাজ, ফুলঝুরি পিঠাসহ অনেক নাম না জানা পিঠার সমাহার।
প্রায় ১৫০-২০০ প্রকারের পিঠা রয়েছে বাংলাদেশে। তার মাঝে সর্বাধিক প্রচলিত ৩০-৪০ প্রকারের পিঠা।
তবে সবার উপরে রয়েছে ভাপা ও চিতই পিঠা। এ দুই পিঠার রাজত্ব রয়েছে সব অঞ্চলেই। গরম ভাপে তৈরি ভাপা পিঠা, নকশা করে তৈরি নকশি পিঠা, দুধে ভিজে চিতই হয় দুধ চিতই, লবঙ্গের ঘ্রাণে সাজে লবঙ্গ লতিকা, মুঠ পাকিয়ে সেদ্ধ হলে হয় মুঠোপিঠা, ডিম ভেঙে পাতলা কাই করে তৈরি করা হয় খোলাজালি পিঠা, যে পিঠার উৎপত্তিস্থল নোয়াখালী জেলা।
এই একই পদ্ধতিতে তৈরি হয় চিতই পিঠাও। চিতই পিঠা খাওয়ার অনুষঙ্গ সবচেয়ে বিচিত্র; গলির মোড়ের বা কোনো জনবহুল জায়গার চিতই পিঠা বিক্রেতাকে দেখলেই সেটা বোঝা যায়।
কোন এলাকার চিতই পিঠা বিক্রেতা কত পদের ভর্তা দিচ্ছে, তার ওপর তাদের খ্যাতি নির্ভর করে আজকাল। দুইচার পদ ভর্তা তো সর্বত্রই মেলে, সাত থেকে সতের পদের ভর্তা দিয়ে চিতই পিঠা খাবার অভিজ্ঞতাও আছে অনেকের।
সরিষাবাটা, ধনেপাতার ভর্তা, মরিচপেঁয়াজের ভর্তা, শুঁটকির ভর্তা, বেগুন ভর্তা, মসুর ডালের ভর্তা, ছোলা-কাবলির চাট, মাছের ভর্তা, কলা ভর্তা, কাঁচা মরিচের ভর্তা, ইত্যাদি।
আবার ছিটা পিঠার আটায় মরিচ বাটা মিশিয়ে ঝাল করে ভাজে অনেকে। ছিটা পিঠা আবার হাঁসের মাংস দিয়েও খাওয়ার রেওয়াজ রয়েছে বাংলাদেশের কোনো কোনো অঞ্চলে। তবে চিতই পিঠা খাবার আদি পদ্ধতি হলো ঝোলা গুড় দিয়ে খাওয়া। এখনো বাংলাদেশের বেশির ভাগ পিঠা মিষ্টিজাতীয় এবং গুড়সহযোগে খাওয়া হয়। গরু বা মুরগির মাংসের ঝোল দিয়ে খাওয়ার রেওয়াজও আছে।
ময়দা, চালের গুঁড়ো, চিনি, দুধ, ক্ষীর, নারিকেল প্রভৃতির সঠিক মিশ্রণে তৈরি হয় পাটিসাপটা পিঠা। আর চালের গুঁড়ো, চিনি ও নারকেল কুরো দিয়ে তৈরি করা হয় সবারই প্রিয় পুলি পিঠা। আবার কখনো কখনো পুলি পিঠা বানানো হয় ঝাল তরকারি দিয়ে।
মোটকথা, মিষ্টান্ন হিসেবে পিঠা খাবার ব্যাপারটা ঠিক থাকলেও এখন স্বাদমতো পিঠা খাবার প্রচলন হয়েছে, যেখানে মিষ্টির পাশাপাশি থাকছে ঝাল, গুড়ের পাশে থাকছে ধনেপাতার ভর্তা, মরিচপেঁয়াজের ভর্তা, শুঁটকির ভর্তা, বেগুন ভর্তা, বিভিন্ন ডালের ভর্তা, হাঁস বা মুরগির ঝোল ইত্যাদি।
কিছু পিঠা পুরো বাংলাদেশেই খাওয়া হয়। আবার কিছু পিঠা নির্দিষ্ট অঞ্চলের বাইরে খুব কম খাওয়া হয়। সিলেটে চুঙ্গি পিঠা, বিক্রমপুরে বিবিখান পিঠা বেশ প্রসিদ্ধ। বাঙালীর সাথে সবসময় আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে থাকবে এই পিঠাপুলির ইতিহাস।
চাহিদা আর স্বাদের কারণে পিঠার সেকাল আর একালে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু পিঠাকে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্ম পর্যন্ত টিকিয়ে রাখার পুরো কৃতিত্ব নারী সমাজের। সে কারণে পিঠার স্বাদের গুপ্তবিদ্যার সন্ধান পাওয়া যায় গৃহিণীদের অভিধানেই।
শহরে, আজকাল গ্রামাঞ্চলেও পিঠার দোকানের প্রভাব বেড়ে যাওয়ায় বাসা-বাড়িতে আর পিঠার আসর বসে না তেমন। পিঠা-পুলি আমাদের সংস্কৃতির অংশ, একে বাচিঁয়ে রাখার দায়িত্বও আমাদের। আর এই সংস্কৃতি পিঠার দোকানে নয়, ঘরে ঘরে পারিবারিক সৌহার্দ্রেই সবচেয়ে ভালো বেঁচে থাকবে।
লাবণ্য ভৌমিক বর্তমানে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান অনুষদে ৪র্থ বর্ষে অধ্যয়নরত রয়েছেন।
labanyabhowmik1777@gmail.com