Loading...

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পুনরায় খুলে দেওয়ায় প্রকাশনা সংস্থাগুলো আবারো আশার আলো দেখছে

| Updated: September 16, 2021 16:18:30


Representational image Representational image

কোভিডের কারণে দীর্ঘদিন যাবত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ বন্ধ থাকার কারণে প্রকাশনা সংস্থাগুলো মাসের পর মাস হতাশায় ডুবে ছিল। স্কুল-কলেজ পুনরায় খুলে দেওয়ার ফলে প্রকাশনা ব্যবসার সাথে জড়িত ব্যক্তিরা অবশেষে যেন আশার আলো দেখতে পেলেন।

কোভিড মহামারিতে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত খাতের মধ্যে এটি একটি ছিল। বর্তমানে আবার সেই আগের ছন্দে ফিরে আসার লক্ষ্যে এই প্রতিষ্ঠানগুলো পাঠ্যবই, সিলেবাস এবং ‘সহায়িকা’ বা সহায়ক বই প্রকাশে ব্যস্ত রয়েছে।

সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক বিষয় হচ্ছে, বই কেনার জন্য এখন আবার বিভিন্ন বইয়ের দোকানগুলোতে মানুষ ঝাঁকে ঝাঁকে ভিড় করতে শুরু করেছে, যা বই ব্যবসায়ীদের দিনবদলের আভাস দিচ্ছে।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ যাতে ছড়িয়ে না পড়ে, তার পূর্ব সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে শুরুর দিকে অর্থাৎ, সেই ২০২০ সালের ১৬ মার্চ থেকে সরকার সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছিল। এর একটা বিশাল প্রভাব পড়েছিল প্রকাশনা খাতের উপর।

ইউনিভার্সাল পাবলিকেশন্সের প্রকাশক কাজী শাহ আলম তার উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন যে, তারা দীর্ঘদিন যাবত এই সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় ছিলেন, কারণ স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকার কারণে তাদের রুজি-রোজগারের উপর মারাত্মক প্রভাব পড়েছিল।

তিনি বলেন, “পুনরায় খুলে দেওয়ার ঘোষণায় আমরা যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলাম...এই দিনটি (১২ সেপ্টেম্বর) আমাদের কাছে অনেকটা চাঁদরাতের মতো। আমরা এখন দিন গুনছি।”

নিজের ব্যবসার দুর্দশার কথা ব্যাখ্যাবশত জনাব আলম বলেন যে, তাঁর প্রতিষ্ঠানে ৫০ জন কর্মী কর্মরত ছিল, কিন্তু দীর্ঘদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে তার ব্যবসায় মারাত্মক ধ্বস নামে এবং তিনি ২ জন কর্মীকে রেখে বাকি সবাইকে ছাঁটাই করতে বাধ্য হন।

তিনি আরো বলেন, “অন্য প্রকাশকদের অবস্থাটাও অনেকটা একই রকম। অনেক প্রকাশক এবং বই বিক্রেতা তাদের ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছেন। যারা এখনো ব্যবসা টিকিয়ে রেখেছেন, তাদের জন্য এই ঘোষণা (শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পুনরায় খুলে দেওয়া) শেষ একটি সুযোগ হিসেবে এসেছে।”

জনাব আলম বলেন, সম্প্রতি তিনি একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে চাকরির একটি বিজ্ঞাপন জারি করেছেন। তিনি বেশ অবাক হয়েছেন যে পাঁচজন নিয়োগের বিজ্ঞাপনের বিপরীতে বিপুল পরিমাণ আবেদন জমা পড়েছে।

তিনি আরো যোগ করেন, “প্রথমদিনেই আমি ৫০০ জন ব্যক্তির কাছ থেকে সিভি পেয়েছি। এ থেকেই বোঝা যায়, কোভিড আমাদের চাকরির বাজারে কীরূপ প্রভাব ফেলেছে।”

বিগত কয়েক বছর ধরে প্রকাশনা খাত ধীরে ধীরে তার পরিধি বিস্তার করে, কিন্তু বই বিক্রির চূড়ান্ত মৌসুমের মাঝামাঝিতে (জানুয়ারি থেকে এপ্রিল) গত বছর মার্চে মহামারির কারণে এই খাতে শোকস্তব্ধতা নেমে আসে। গত বছর ব্যাপক ক্ষতির পরে, প্রকাশকরা আশা করেছিলেন যে, এই বছর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে গেলে নতুন বছরে বই বিক্রির মৌসুমে (জানুয়ারি থেকে মে) তাদের অবস্থার উন্নতি ঘটবে।

তারা বলেন, কিন্তু, দুর্ভাগ্যবশত এমনটা ঘটেনি।

দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার ফলে পরপর দুটো বই বিক্রির মৌসুমে বই বিক্রি করতে না পারার ফলে এই খাতের সাথে যুক্ত ব্যক্তিরা আশাহত হয়ে পড়েছিলেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মহামারির কারণে তাদের ব্যবসায় প্রায় ৭০% ক্ষতিসাধন হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রায় সবধরনের বই বিক্রি প্রায় এক-তৃতীয়াংশে কমে এসেছে এবং সংশ্লিষ্ট খাত যেমন প্রিন্টিং, বাঁধাই এবং অন্যান্য বিষয়ের উপর এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে।

প্রকাশক ও বই বিক্রেতাদের মতে, এই খাতে বিভিন্ন পর্যায়ে প্রায় ২০ থেকে ৭০ শতাংশ কর্মী ছাঁটাই হয়েছে।

নীলক্ষেত ভিত্তিক ইসলামিয়া মার্কেট ট্রেডার্স মাল্টিপারপাস কোঅপারেটিভ সোসাইটি এর প্রাক্তন পরিচালক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, বই সংক্রান্ত ব্যবসা যেমন প্রকাশনা বা বিক্রয় কেবল একটি খাত, যা মহামারির কারণে এখনো টিকে থাকার জন্য লড়াই করে যাচ্ছে।

লাইফ পাবলিশার্সের মালিক জনাব হেলাল বলেন, “বর্তমানে অন্য খাতসমূহ পুনরায় উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে বা অনেকে খানিকটা বিপদ কাটিয়েও উঠেছে, কিন্তু প্রকাশনা খাতের চিত্র কিছুটা ভিন্ন।“

স্কুল ও কলেজ খুলে দেওয়ার ব্যাপারে সরকারের এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়ে তিনি বলেন এই সিদ্ধান্তের ফলে আজকাল বইয়ের দোকানগুলোতে ভালো লোকসমাগম দেখা যাচ্ছে, যা খুবই উৎসাহজনক।

বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশনা ও বিক্রেতা সমিতির ঢাকা ইউনিটের সম্পাদক জনাব রহমান বলেন কোভিডের কারণে যে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে বলা হয়েছে, সে ব্যাপারে আমাদের সচেতন থাকতে হবে, কারণ পুনরায় সব বন্ধ হয়ে গেলে এই খাত হয়তো আর টিকে থাকবে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্সের এক কর্মকর্তা বলেন, মহামারীর পূর্বে কেবলমাত্র ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় এই প্রতিষ্ঠান হতে বিক্রিত মূল্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১০০ কোটি টাকা সমমূল্যের। কিন্তু, কোভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাবের পর তা ৭৫ শতাংশ কমে গিয়েছে।

তিনি আরো বলেন, ব্যবসার এই দুরবস্থার কারণে প্রায় ২০ শতাংশ কর্মীকে ছাঁটাই করা হয়েছে।

বিনা সুদ বা অল্প পরিমাণে সুদভিত্তিক ঋণের জন্য সরকারের কাছে সহায়তা চাওয়া হয়েছে।

এই খাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে, কারণ এই উদ্যোক্তারা কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঋণ নিতে পারবেন না।

এখানে প্রায় ১০০টির মতো প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা ১ম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠ্যপুস্তক, সিলেবাস ও ‘সহায়িকা’ বা সহায়ক বই, গাইড বই প্রকাশ করে থাকে।

কিন্তু লেকচার, পাঞ্জেরী, অনুপম, পুথিনিলয় ও জুপিটার– এই পাঁচটি কোম্পানি পুরো বাজারের প্রায় ৭০ শতাংশ দখল করে বসে আছে।

বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বই বিক্রেতা সমিতি (বিপিবিএ) এর প্রাক্তন  ভাইস প্রেসিডেন্ট কাজী জহুরুল ইসলাম বুলবুল বলেন, যারা প্রকাশনা ব্যবসার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত আছেন- তাদের জন্য শুধুমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়াটাই যথেষ্ট নয়।

কোভিডের কারণে যে ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠার জন্য এ ব্যাপারে তিনি সরকারের কাছ থেকে প্রণোদনার গুরুত্বের ব্যাপারে আলোকপাত করেছেন।

জনাব বুলবুল বলেন, কেবল কিছু  কোম্পানি, যারা ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন করে থাকেন, তারাই এই অর্থ পাওয়ার জন্য বিবেচিত হবে। কিন্তু, বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই এরকম ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন করে না।

তিনি উল্লেখ করেন যে, যেসকল কোম্পানি ব্যাংক থেকে এক বছর মেয়াদে ৪.০ শতাংশ হারে এই বিশেষ অর্থ সুবিধা পেয়েছিল, তারা এই পরিস্থিতিতে এখন বিপাকে পড়েছে।

তিনি বলেন, লকডাউন এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ বন্ধ থাকার কারণে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বই বিক্রি করতে পারেনি।

তিনি বলেন, “এখন ব্যাংক প্রতিষ্ঠানগুলো নির্ধারিত সময়ে ঋণ পরিশোধের জন্য তাদেরকে তাগাদা প্রদান করছে। এই ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে কম সুদের এই ঋণ সাধারণ তালিকাভুক্ত ঋণের আওতায় চলে যাবে, যেখানে সুদের পরিমাণ ৯.০ শতাংশ।

মহামারির কারণে প্রকাশনা খাত যে পরিমাণ ক্ষতির মুখে পড়েছে, তা বিবেচনাপূর্বক জনাব বুলবুল ঋণ পরিশোধের সময় বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছেন সরকারের কাছে।

সব বাধা দূর করে সকল ধরনের ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা যাতে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ সুবিধা পায়, সে ব্যাপারে সরকারের প্রতি তিনি আহ্বান জানিয়েছেন।

jubairfe1980@gmail.com

Share if you like

Filter By Topic