স্কুল শুরু হয় সকাল ৮.২৫-এ আর শেষ হয় বিকাল সাড়ে তিনটায়। এরপর হয়ত এক ঘণ্টা কাটাতে হয় পাঠ্যক্রম বহির্ভূত কার্যক্রমে। না, এ পর্যন্ত সবই স্বাভাবিক হিসেবেই ধরা হবে। কিন্তু সবচেয়ে বড় অস্বাভাবিক বিষয়টা হলো, এরপর থেকেই একটি শিশুর দিন শুরু হলো বলা ধরা হবে। কপালে থাকলে দৌড়ে বাসায় গিয়ে শান্তিমতো দু’টি খাওয়া নয় বরং নাকেমুখে কিছু গেলার সময় হয়ত পাওয়া যাবে। তারপরই তাকে আবার দৌড়াতে হবে বিকাল পাঁচটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত টানা স্কুলের জন্য। এখানে পড়ালেখা নয়, শিশুর খুদে মস্তিষ্কে বিদ্যা ঠেসে ঢোকাবার লড়াই চলে। সেখান থেকে বাস বা ট্রেন ধরে বাসায় ফিরে বিশ্রাম নয়, বরং বাড়ির কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয় শিশুকে। সব কিছু শেষ করে বইখাতা গুছিয়ে রাতের মতো নিজেকে বিছানায় ছুঁড়ে দেওয়ার খানিক অবকাশ মেলে শিশুর। পরদিন আবার একই শিক্ষা-যুদ্ধে নামতে হয় তাকে। এটাই টোকিওর একটি ১০ বছরের শিশুর প্রতিদিনের ব্যতিক্রমহীন দিনলিপি।
[চলতি কথায় একে ক্রাম-স্কুল বা পরীক্ষা-প্রস্তুতির স্কুল বলা হয়। কেউ কেউ একে ‘পরীক্ষা-কারখানা’বলতেও পছন্দ করেন। তবে প্রকৃতিগত ভাবে এর সাথে আমাদের দেশে সর্বজন পরিচিত, বহুল আলোচিত ও নিন্দিত ‘প্রাইভেট টিউশনি-র মিল খুঁজে পাওয়া যাবে। হয়ত কেউ কেউ রবীন্দ্রনাথের সেই ‘তোতা কাহিনী’র শিক্ষা কার্যক্রম-কেও এর মাঝে দেখতে পাবেন। তাই, কেউ একে ‘তোতা-শিক্ষা’বললেও অত্যুক্তির দায়ে হয়ত পড়বেন না।–অনুবাদক]
একজন অভিভাবককে শিশু-শিক্ষার এ খাতে মাসে ৫০০ মার্কিন ডলার সমপরিমাণ অর্থ মূল্য চুকাতে হয়। এ ক্ষেত্রের শিক্ষকরা যদি তাদের কাজ খুব ভালো ভাবে করেন, তবে ১২ বছর বয়সে জাপানি শিশু একটি পরীক্ষা-যুদ্ধে উৎরে যেতে পারে। ঢুকতে পারে নামজাদা বেসরকারি স্কুলে। এতে তৈরি হয়ে যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছে যাওয়ার রাস্তা । একই সাথে হয়ত, ভবিষ্যতের তুলনামূলক আরামদায়ক এবং সফল জিন্দেগি ছোঁয়ার রাজপথেরও দেখা মেলে। তবে এ খাতে খরচটা অনায়াসেই ছয় অংক পার হয়ে যেতে পারে। কোনো কোনো জরিপে দেখা গেছে, জাপান ও কোরিয়ার পরিবারগুলো তাদের আয়ের ১০ শতাংশই ঢালছে শিশুর টিউশনির খাতে!
পরিণামে, সমাজে অসাম্যসহ নানা সমস্যার দগদগে ঘা বাড়ছে বা ছড়িয়ে পড়ছে। শিশু-শিক্ষা এক ধরণের অস্ত্র প্রতিযোগিতায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদিকে জনমিতিবিদরা বলছেন, খরুচে এই শিক্ষার বদআছর পড়ছে জন্মহারের ওপর। বছর বছর জন্মহার কমতে শুরু করেছে। জাপানে নারী প্রতি ১.৩৬ এবং চীনে ১.৩ এসে দাঁড়িয়েছে সন্তান জন্মের হার। আর দক্ষিণ কোরিয়া এই হার ঠেকেছে গিয়ে ০.৮৪-এ। চীন সম্প্রতি প্রাইভেট টিউশনির বিরুদ্ধে খড়গ হস্ত হয়ে উঠেছে। লাভের লক্ষ্য নিয়ে সে সব কোম্পানি স্কুল-পাঠ্যক্রম চালায় তাদের নিষিদ্ধ করেছে বেইজিং সরকার। ফলে নিবন্ধিত শিক্ষা-কোম্পানিগুলোর শেয়ারে নেমেছে ব্যাপক ধস। চীনের এই পদক্ষেপকে সুবিবেচনার কাজ হিসেবে দেখা যেতে পারে।
চীনের প্রাইভেট টিউশনি অশুভ প্রবণতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে দেখা গেছে দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংকে। সম্প্রতি একদল শিক্ষাবিদকে তিনি বলেন, প্রাইভেট টিউশনি চীনের ‘একটি আদি ও দুরারোগ্য শিল্প। আর একে সারিয়ে তোলা মোটেও চাট্টিখানি কাজ নয়।’ তবে প্রাইভেট টিউশনিকেই কেবল সমস্যা মনে করলে এবং সরবরাহ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আদা-পানি খেয়ে নামলে শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত সুফল হাতে ধরা দেবে না। বরং এটা উল্টা বিপত্তি ডেকে আনবে এবং প্রাইভেট টিউশনিকে তুলে দেওয়ার সব চেষ্টা হয়ত ব্যর্থই হবে। সব মিলিয়ে এতে হয়ত জন্মহার বাড়ার বদলে আরো কমবে। সরবরাহ ব্যবস্থা ওপর আঘাত হানার বদলে চীন ও তার পূর্ব এশিয়ার পড়শিদের উচিত হবে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা ব্যবস্থাকে ঠিক করা। এ পরীক্ষা ব্যবস্থা তীব্র প্রতিযোগিতামূলক ক্রীড়া বা রণক্ষেত্রের মতো হয়ে উঠেছে যেখানে একজন জিতলে আরেক জনকে হারতেই হয়। আর হারজিতের এই ধারাই প্রাইভেট টিউশনির ভূমিকে উর্বরতর করে তুলছে। পাশাপাশি হয়ে উঠছে জনপ্রিয়।
রাষ্ট্র ধনী হয়ে ওঠার সাথে পাল্লা দিয়ে সাধারণ ভাবে কমতে থাকে জন্মহার। শিক্ষাখাতে ব্যয়ের সাথে এর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ গ্যারি বেকার দেখিয়েছেন যে, পরিমাণের বদলে মানকে বেছে নেওয়াই জন্মহার কমার নিয়ামক হয়ে উঠেছে। অনেক সন্তানের বদলে মা-বাবা চাইছেন অল্প সন্তান। বেশি সন্তান পালতে খরচ করার বদলে অল্প কয়েকজনের শিক্ষায় উদার হাতে খরচ করছেন তাঁরা। [ উল্লেখ্য, নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ থিওডর ডব্লিউ সোলজ ‘মানবপুঁজি’-র ধারণাকে পরিচিত করেন। আর এই তত্ত্বের সম্প্রসারণ ঘটান ১৯৯২ সালে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ গ্যারি বেকার।]
এভাবে যে টাকা ব্যয় করা হয় তার কতগুলো বিশেষত্ব রয়েছে। প্রথমত, প্রতি শিশুর প্রতি একই পরিমাণ টাকা ব্যয়ের চেষ্টা করেন মা-বাবা। গ্যারি বেকার দেখিয়েছেন, বিত্তশালী মা-বাবা দামি ও কম-দামি গাড়ির কেনার পরিকল্পনা করেন। ঠাটবাট দেখানোর জন্য রয়েছে দামি গাড়ি ফেরারি। অন্যদিকে আটপৌরে বাজারহাট করার জন্য রয়েছে টয়োটা। কিন্তু কেউ একই ভাবে ঠাটবাট আর আটপৌরে ব্যবহারের ধারাবাহিকতায় সন্তানের হিসাব করেন না। দ্বিতীয়ত, মান ও পরিমাণের হিসাবও আলাদা ভাবে কেউ করেন না। এই যেমন ধরুন, বেসরকারি স্কুলে ছাত্র পাঠানোর খরচ সব সন্তানের জন্য একই ভাবে করা হয়। এ থেকেই বোঝা যাবে, দেশ উন্নত হলে জন্মহার কেন কমে। সব শিশুর জন্য শিক্ষায় বিনিয়োগ করতে হবে ,তাই বেশি সন্তান নেওয়া সম্ভব নয়।
এখন স্কুলভিত্তিক প্রাইভেট টিউশনি বা কোচিং-য়ের খরচ যদি বেড়ে যায়, তাহলে তার বদলে প্রাইভেট টিউটর বা গৃহ শিক্ষক নিয়োগে বাধ্য হবেন মা-বাবা। কিংবা নিজেদের চাকরি-বাকরি বাদ দিয়ে শিশুকে শিক্ষা দেওয়ার কাজে নেমে যাবেন। ফলে, তারা স্বাভাবিক ভাবেই কম সন্তান নিতে আগ্রহী হবেন। সন্তানদের মাথাপিছু ব্যয় বজায় রাখতে যেয়েই এমন বিকল্পের কথা ভাবতে হবে তাদের। কিন্তু এ ভাবে ‘উল্টা বুঝলি রামের মতো’ শিশু জন্মের হার আরো কমে যাক – ঠিক তা চায়নি বেইজিং।
মেধাবী বংশধরের জন্য লালায়িত হয়ে এই ‘তোতা-স্কুল’ বা স্কুলভিত্তিক প্রাইভেট টিউশনিতে বাচ্চাকে পাঠান না মা-বাবা। অনেক জরিপেই দেখা গেছে, এ সব প্রতিষ্ঠান বাচ্চাদের জন্য ভালো নয় সে কথা বিনা দ্বিধায় স্বীকার করছেন জাপানি মা-বাবা। কিন্তু সেরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হয়ে বের হয়ে আসার সুবর্ণ সুযোগ আছে বলেই কচি বয়স থেকেই অন্যের সাথে মল্লযুদ্ধের মতো জীবন-মরণ কঠোর প্রতিযোগিতায় নামান এবং এ সব প্রতিষ্ঠানে নয়নের মণিকে পাঠান তাঁরা।
চীনে প্রতি ছাত্রকে মাত্র ১৫ বছর বয়সে নগরকেন্দ্রিক উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় নামতে হয়। পরীক্ষার্থীদের মাত্র অর্ধেক এতে টেকে। বাকিদেরকে ট্রেড স্কুল বা বৃত্তি বা পেশামূলক স্কুলে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায়ই থাকে না। এরপর ১৮ বছর হলে উচ্চবিদ্যালয়ের ছাত্রদের নামতে হয় দেশব্যাপী ভর্তি পরীক্ষায়। এই পরীক্ষার মধ্য দিয়ে চীনের সেরা সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকা যায়। আর এসব বিশ্ববিদ্যালয়কে ভালো চাকরি পাওয়ার তোরণ মনে করা হয়। এ ভর্তি পরীক্ষার কঠিন বৈতরণী ২ শতাংশ বা তার চেয়েও কম সংখ্যক ছাত্রই কেবল উতরাতে পারে। এ দিকে, আরেকবার এ পরীক্ষায় নামার অর্থ হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রই কেবল হ্রাস পাওয়া। কাজেই এ ভাবে সন্তানের সাফল্যের আশায় কোন মা-বাবা গৃহ শিক্ষককে টাকা দিতে অস্বীকার করবেন?
স্কুলভিত্তিক প্রাইভেট টিউশনি কিংবা গৃহ শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অভিযানে না নেমে প্রথমেই উচিত হবে হারজিতের এ পদ্ধতি বা খেলাকে বন্ধ করা। এক বাচ্চার জয় যেন অন্য বাচ্চার পরাজয়ের কারণ না হয়ে ওঠে, সে জন্য এ পদ্ধতিকে সংস্কার করতে হবে। জাপানের সেরা সেরা বেসরকারি স্কুলে ঢোকার গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা-যুদ্ধে কচি বাচ্চাদের যেন নামতে না হয়। একই সাথে প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা বা দ্বিতীয় পর্যায়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর বিনিয়োগ বেশি সুফল এনে দেবে। এতে অভিজাত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সহজেই ছাত্র নিতে পারবে। তাদেরকে আগ্রাসী টিউশনভিত্তিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হবে না।
মা-বাবার চাপ কমানোর উদ্যোগ নিচ্ছে এমন ইংগিত পূর্ব এশিয়া থেকে পাওয়া যাচ্ছে। মনে রাখতে হবে, বিশ্বে সবচেয়ে দ্রুত বুড়ো হওয়ার পথে রয়েছে যে জনগোষ্ঠী তাঁরা এ অঞ্চলেই বসবাস করেন। জাপানে স্কুল-পূর্ব শিক্ষা বিনামূল্যে দেয়া হয়। চীন তার পেশাভিত্তিক স্কুলগুলোর মান উন্নত করছে। তবে এতকিছু পর অভিজাত বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকার পরীক্ষা আগের মতোই কঠোর রয়েছে।
টিউশনিতে সন্তান পাঠানোর যে উন্মাদনা রয়েছে তার কারণেই অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা বা ওইসিডি’র পরিচালিত আন্ত:সীমান্ত পরীক্ষায় পূর্ব এশিয়া খুবই ভালো ফলাফল ছিনিয়ে আনছে। এক্ষেত্রে চীন, সিঙ্গাপুর, ম্যাকাও, হংকং, তাইওয়ান, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়া নাম শোভা পায় ইউরোপের শীর্ষস্থানীয় দেশ এস্তোনিয়ারও আগে। এতে হয়ত গর্বে ছাতি ফুলে উঠবে কিন্তু এই জ্বলজ্বলে নজরকাড়া বাতির নিচেই রয়েছে ঘন কালো অন্ধকার। এ সব মেধাবীরা প্রায়ই নিজ দেশের মাটিতে আর থাকছে না, চলে যাচ্ছে। তাই বিশ্বের সেরা শিক্ষিত ব্যক্তিদের নিয়ে সন্তোষ প্রকাশের অবকাশ কমছে এ সব দেশের।
[ফাইনান্সিয়াল টাইমস থেকে বাংলায় রূপান্তর করেছেন সৈয়দ মূসা রেজা]
