শিক্ষাঙ্গনে মানসিক স্বাস্থ্য


অনিন্দিতা চৌধুরী | Published: October 10, 2021 13:29:32 | Updated: October 10, 2021 19:03:16


— প্রতীকী ছবি

অসাম্যের পৃথিবীতে মানসিক স্বাস্থ্য- এই আঙ্গিকে উদযাপিত হবে ২০২১ সালের বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। সমাজে বিদ্যমান নানা অসাম্য নির্দেশ করার জন্যই এই থিম। বিশেষত করোনাকালে অসম পৃথিবীতে সাম্যের গান গাওয়া ক্রমে আরো মুশকিল হয়ে উঠেছে, বেড়েছে অসাম্যের ধ্বনি। রুজি-রোজগার, শিক্ষাজীবন, ব্যক্তিজীবন, সুস্থতা- সবদিকেই যেন শুধু ঘাটতির মাপকাঠি বেড়ে চলেছে। আর এই সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাব পড়ছে মানুষের মনে, মানসিক স্বাস্থ্য প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় অনেক শিক্ষার্থী নিজের খরচ যুগিয়ে চলার টিউশনটুকু পর্যন্ত হারিয়েছেন, সেই সাথে শিক্ষাজীবনে পিছিয়ে পড়ার সাথে সাথে আসন্ন কর্মজীবনেও পেছানোর ভয় তো রয়েছেই। আর বেসরকারি চাকরিজীবী, তাদের মাসিক আয়েও একটা বড় অংশ কমে গিয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষতির কারণ দর্শানোতে। এরপরও মানুষ সামনে এগোচ্ছে, অনেকে খোঁড়াচ্ছে, তবু থামবার সুযোগ নেই এতটুকু। এই লাগামহীন অবস্থার কারণে মানসিকভাবে ভেঙে পড়া ব্যক্তির সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে বৈ কমছে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মার্জিয়া রহমান মতামত দেন, বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য সাইকো-সোশ্যাল কাউন্সেলিং অথবা ছাত্র-নির্দেশনা ও পরামর্শদান দফতরের মতো অবকাঠামো থাকলেও এখনো পর্যন্ত মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিতে সচেতনতা ও উদ্যোগের ক্ষেত্রে অপ্রতুলতা রয়ে গেছে। প্রতিটি মানুষেরই যে শরীরের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও সমান নজর রাখা প্রয়োজন- এই চর্চাটি এখনো সার্বজনীন হয়ে ওঠেনি।

আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা কাউন্সেলিং সেবা নিতে শুরু করলেও নানাবিধ কারণে তা অব্যাহত রাখতে পারেন না। আমরা এমন একসময় ও সমাজে বাস করি, যেখানে জীবনের প্রায় সমস্ত ক্ষেত্রেই প্রতিযোগিতা ও সাফল্য অর্জনের লড়াইয়ের মাঝে যে কোনো মানুষ একলা ও অসহায়বোধ করতে পারে, বিষণ্ণতা বা অবসাদে আক্রান্ত হতে পারে। চলমান অতিমারী এই অবস্থাকে আরও গুরুতর করে তুলেছে। মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষার জন্য তাই রাষ্ট্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মনোযোগ এবং অবকাঠামোর পাশাপাশি ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সচেতনতা ও অত্যন্ত জরুরি।

তিনি শুধু শিক্ষার্থীদেরই নয়, শিক্ষকদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও নজর দেয়া দরকার বলে মনে করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী সুমাইয়া জাহিদ চলমান অতিমারীকালকে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি মনে করেন, এ সময়টাতে বহুবিধ কারণে তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক অসহায়ত্ব ও জীবনের অনিশ্চয়তার কারণে মানসিক স্বাস্থ্যের উপর বড় প্রভাব পড়ছে।

প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিটি বিভাগে স্টুডেন্ট কাউন্সেলিংয়ের জন্য নির্দিষ্ট একজন কাউন্সেলর নিযুক্ত করা দরকার। এবং এমন একজনকে নেয়া উচিত, যিনি ইতোমধ্যেই এই ক্ষেত্রটিতে পারদর্শী। এমন নয় যে, বিভাগের শিক্ষকদের মধ্যে থেকে কাউকে নিয়োগ করে দেয়া হবে যে তিনি শিক্ষার্থীদের সকল সমস্যা মোকাবেলায় সাহায্য করবেন। এক্ষেত্রে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ প্রয়োজন, এবং কেন্দ্রীয়ভাবে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এমন একজন বিশেষজ্ঞকে রাখা দরকার।

অনেকসময় এমন হয় একজন শিক্ষার্থী কোনোরূপ লজ্জা বা সংশয়ের কারণে তার মনের কথা, মানসিক সমস্যাগুলো বলতে পারছেন না, অথবা কাউকে বললেও সে অনুযায়ী যথেষ্ট সমর্থন পাচ্ছেন না। সেক্ষেত্রে তাকে যাতে পর্যাপ্ত সহায়তাটুকু করা যায়, এ বিষয়ে মনোযোগ দেয়া অত্যন্ত দরকারি।

সিলেট মুরারিচাঁদ কলেজের রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী শতরূপা সেন মনে করেন, পূর্বের অবস্থার সাথে তুলনা করলে বর্তমান পরিস্থিতি অনেক খারাপের দিকে চলে গেছে। শিক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থার অবনতি হয়েছে। তার জন্য কিছুটা শিক্ষাব্যবস্থা দায়ী, কিছুটা অভিভাবক, পশ্চিমা সংস্কৃতি আর অল্প বয়সে শিক্ষার্থীদের হাতে মুঠোফোন তুলে দেওয়া। এতে করে তারা ভালো শিক্ষা থেকে খারাপ শিক্ষা বেশি গ্রহণ করছে।

আমাদের ইন্টারনেট নিরাপত্তা বাড়ানো উচিত, যাতে শিক্ষার্থীরা প্যারেন্টাল গাইডের আওতায় থাকে। অভিভাবক ও শিক্ষকদের তাদের সন্তান ও শিক্ষার্থীদের উপর নজর রাখা উচিত। তাদের সাথে বন্ধু সুলভ আচরণ করতে হবে, যাতে তারা তাদের মনের কথা ভাগাভাগি করতে পারে। সর্বোপরি, তাদের উপর কোনোপ্রকার মানসিক চাপ না দেওয়ার কথা বলব।

শ্রীমঙ্গলের নটরডেম স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষিকা তিথি দেব পূজা করোনাকালে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি চিহ্নিত করে বলেন, শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকা খুবই জরুরি। করোনাকালে দীর্ঘদিন বাসায় থাকার কারণে শিক্ষার্থীরা মানসিকভাবে কিছুটা ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। তাদের মধ্যে মিশ্র আচরণ দেখা যাচ্ছে। সাপ্তাহিক ক্লাস শুরু হওয়ার পর অনেকেই বিদ্যালয়ে আসতে চায়নি, অনেকেই আবার দারুণ উদ্যমে পুনরায় শ্রেণিতে এসেছে। তাই তাদের মানসিক স্বাস্থ্য ভালো যাতে থাকে, এ বিষয়ে খেয়াল করে অতঃপর তাদের পুনরায় ক্লাসমুখী করার ব্যাপারে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের কাজ করা উচিত।

আমাদের সমাজে মানসিক স্বাস্থ্যকে এখনো শারীরিক স্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বের দৃষ্টিতে দেখা হয় না। তবে দিন দিন বিষয়টির গভীরতা বাড়ছে এবং এতে ভালোভাবে আলোকপাত করা এখন সময়ের দাবি। শরীরের সাথে সাথে যেন আমরা মনের খেয়ালও রাখতে পারি, ভেতরে-বাইরে উভয় দিকেই সুস্থ থাকি।

অনিন্দিতা চৌধুরী বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী।

anindetamonti3@gmail.com

Share if you like