শত্রুর বিদ্যায় শত্রুকে ঘায়েল করা – হ্যাঁ, যুদ্ধ নয় চিকিৎসা বিজ্ঞানের কথাই বলা হচ্ছে। আর এই পদ্ধতি চিকিৎসা বিজ্ঞানের জগতে প্রায় এক বিপ্লব ঘটাতে চলছে বলেই ভাবছেন অনেকেই। ভাইরাসের কথাই ধরুন। বেশির ভাগ সময়ই শত্রু শব্দের সমার্থক হিসেবে ভাইরাস ব্যবহার করলে কেউ দোষ হয়ত ধরবেন না। এই ভাইরাসই এবারে চিকিৎসার নতুন পথের দিশা দিয়েছে। ভাইরাস হলো এক অতি জঘন্য ছিনতাইকারী। শরীরের কোষে কোষে ঢুকে পড়ে। ওখানেই থামে না। এই দেহ-কোষরাজির উপাদান ব্যবহার করে আরো ভাইরাস উৎপাদন শুরু করে। এক কথায় পৈশাচিক ভাবে কার্যকর কৌশল। এ কৌশলে শরীরের ভেতর হু হু করে নিজের সংখ্যা বাড়ায় হানাদার ভাইরাস। ফলে, ভাইরাস তার সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে দেহ-প্রতিরক্ষার ওপর। তোমারই শিল তোমারই নোড়া, ভাঙ্গবো তোমার দাঁতের গোঁড়া- বলে যে কথা গ্রামাঞ্চলে প্রচলিত আছে এখানে শরীরেও ঠিক তাই ঘটে।
শরীরের আমিষ তৈরির কারখানাকে নিজের বদমতলব এবং স্বার্থ হাতিয়ে নেয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে ভাইরাস। তা হলে কি একই পন্থায় আমরাও কাজ করতে পারি না? অর্থাৎ দেহ-প্রতিরক্ষা বাহিনীকে শক্তি যোগানোর কাজে দুশমনের এই প্রক্রিয়াকে কী কাজে লাগাতে পারি না? ১৬ অক্টোবরের ব্রিটিশ বিজ্ঞান সাপ্তাহিক নিউ সায়েন্টিস্টের এক প্রচ্ছদ নিবন্ধে এ বিষয় তুলে ধরেন বিজ্ঞান সাংবাদিক মাইকেল লি পেইজ।
.jpg)
হ্যাঁ ।এই ভাবনারভিত্তিতে গত কয়েক দশক ধরে যে গবেষণা চলেছে তারই চূড়ান্ত সুফল এবারে দুনিয়া দেখেছে । কোভিড-১৯’এর বিরুদ্ধে ফাইজার/বায়োএনটেক এবং মডার্নার টিকা তৈরিতে এই কৌশলই খাটানো হয়েছে। বিজ্ঞানীরা ম্যাসেঞ্জার আরএনএ বা এমআরএনএ’র বংশগতির উপাদান ব্যবহার করে শরীরকে বিশেষ আমিষ বানানোর নির্দেশ দেন। হানাদার ভাইরাস সম্পর্কে শরীরকে শিক্ষিত করে তুলতে ব্যবহার হয় এই বিশেষ আমিষ। ফলে কোভিড-১৯ সম্পর্কে সতর্ক হওয়ার সময় পেয়ে যায় শরীর। হুট করে শরীরে কোভিড-১৯ ঢুকতে হয়ত পারবে। তবে শরীর তাতে হতচকিত হবে না। কোভিড-১৯ বাড়াবাড়ির সুযোগ তো পাবেই না। বরং শরীর পাকড়াও করতে পারবে হানাদার দলকে।
কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার পিয়েটার কিউলিস বলেন, চিকিৎসার এ প্রযুক্তির যথার্থতা নজরকাড়া ভাবে তুলে ধরতে পেরেছে বিশ্বমারি। দেখিয়ে দিয়েছে কতো দ্রুত এবং সস্তায় টিকা বানানো যায়। এভাবেই করোনার টিকা তৈরির কাজ শুরু করার মাত্র তিনমাসের মধ্যেই টিকাকে চিকিৎসা কেন্দ্রে হাজির করা গেছে।
এই পদ্ধতির চিকিৎসা শুরুর পদক্ষেপ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে কোভিড-১৯ টিকাকে। একই ভাবে ওষুধ তৈরিতে যদি খোদ শরীরকেই নিয়োগ করা যায় তবে সব রোগের চিকিৎসার দরজা খুলে যাবে। ব্যাকটেরিয়াজনিত অসুখ থেকে শুরু করে দেহ-প্রতিরক্ষার সঙ্গে জড়িত রোগ-ব্যাধি, বংশগতির সঙ্গে জড়িত বিরল অসুখ এমনকি ঘাতক ব্যাধি ক্যান্সারেরও এ ভাবে চিকিৎসা চলবে। কিউলিস আরো বলেন, চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটাকে বিপ্লব বলা যায়। এতে নতুন নতুন এমআরএনএ টিকা দ্রুত তৈরি এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা যাবে।
এখনো সূচনার পর্যায়ে রয়েছে এ পদ্ধতি। তারপরও প্রতিশ্রুতিশীল ফলাফল আসতে শুরু করেছে। এ পদ্ধতি প্রয়োগে গোটা চিকিৎসা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটবে। এ কথা বলা হলে তা মোটেও বাড়িয়ে বলার দায়ে পড়তে হবে না।
এমআরএনএ টিকা নিয়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা এমন আহ্লাদিত হয়ে উঠলেন কেনো? সে প্রশ্নের জবাব পেতে হলে তাকাতে হবে পেছন দিকে। আগে টিকায় ব্যবহার হতো ‘জীবিত’ ভাইরাস। বুনো ভাইরাসের তুলনায় কম ক্ষতিকর বানানোর জন্য টিকায় ব্যবহৃত ভাইরাসের মিউটেশন বা পরিব্যাপ্ত ঘটানো হতো। কোষের পরিব্যাপ্ত ঘটানো হলে নতুন কিছু চরিত্র দেখা দিতে পারে। ফলে বুনো ভাইরাসের তুলনায় এমন ভাইরাসের বিপজ্জনক সক্ষমতা কম থাকে। কার্যকরিতার দিক থেকে ‘জীবিত’ টিকার তুলনা চলে না। অতি চমৎকার। কিন্তু তৈরি করা সহজ নয়। প্রথম কথাই হলো, ভাইরাস একমাত্র জীবিত কোষে বংশবৃদ্ধি করে। দ্বিতীয়ত, অনেক মানুষের দেহ-প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়। এ টিকা তাদের জন্য আপদ ডেকে আনতে পারে। কখনো কখনো টিকায় ব্যবহৃত ভাইরাসের আবার পরিব্যাপ্ত হতে পারে। ফিরে পেতে পারে সেই বুনো স্বভাব। জীবিত পোলিও টিকার বেলায় এমন কাণ্ড ঘটে। আজকের যুগের অনেক টিকাই, এ কারণে, ‘মৃত’ বা ‘নিষ্ক্রিয়’ ভাইরাসকে কাজে খাটায়। কখনো কখনো ভাইরাস থেকে আলাদা করে নেওয়া একটিমাত্র আমিষও ব্যবহার করে। এগুলো সাবইউনিট বা অবএকক টিকা নামে পরিচিত। কিন্তু এ সব টিকা বানানোর কাজও সহজে শেষ করা যায় না। আমিষ-ভিত্তিক যে কোনো ওষুধকে জীবিত কোষরাজিতেই তৈরি করতে হয়।
ঐতিহ্যবাহী টিকা বানানো, প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য মাত্রা ঠিক করা, গণ-উৎপাদন করা প্রতি ধাপেই এমন সমস্যার দেখা পাওয়া যাবে। ঠিক মতো কাজ না করলে টিকার রদবদল করাও এ সব কারণেই যারপরনাই কঠিন হয়ে ওঠে।
এর চেয়েও সহজ পথ আছে সে কথা কয়েক দশক আগেই জানতে পেরেছিলেন বিজ্ঞানীরা। এমন হাঙ্গামার দরকার কী! তারচেয়ে ভাইরাসের আমিষ তৈরির প্রণালী শরীরকে দেওয়া হোক। তারপর সে অনুযায়ী কোষই বানিয়ে নিক প্রয়োজনীয় আমিষ। আমিষ নির্মাণ প্রণালী স্থায়ী ভাবে থাকে কোষের ডিএনএতে। কোনো কোষের যদি কেনো বিশেষ আমিষ বানানোর প্রয়োজন পড়ে তখন সে নির্মাণ প্রণালীর আরএনএ অনুলিপি তৈরি করে। এটি এমআরএনএ আদলে তৈরি করা হয়। এই এমআরএনএ কোষের আমিষ তৈরির যন্ত্রকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেয়। কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন পর এমআরএনএ ভেঙ্গে যায়। আর সাথে সাথেই থেমে যায় আমিষ তৈরির কারখানাও।
নতুন ‘বিতর্কিত’ প্রণালীর কথা
১৯৯০’এ ইঁদুর নিয়ে পরীক্ষার সময় জীববিজ্ঞানীরা দেখতে পান, ডিএনএ বা এমআরএনতে জীবিত কোষের জন্য আমিষ তৈরির সঙ্কেত জুড়ে দেওয়া সম্ভব। এরপর ওই আমিষ তৈরি হতে থাকে। তারা আরো দেখতে পেলেন, বিজ্ঞানাগারে আমিষের চেয়ে সোজা হলো ডিএনএ এবং এমআরএনএ তৈরি করা। এতে বিজ্ঞানীরা বেশ উৎফুল্ল হয়ে ওঠেন। কোনো ভাইরাসের বিরুদ্ধে দেহ-প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চাঙ্গা বা প্রস্তুত তোলার কাজ এতে সহজ হয়ে গেল। প্রথমে ওই ভাইরাসের আমিষ তৈরির সঙ্কেত লাগবে। দ্বিতীয় ধাপে, ওই সঙ্কেত এমআরএনএকে দিতে হবে। ব্যাস! ফলে দ্রুততম সময়ে পরীক্ষামূলক টিকা তৈরির পথও খুলে গেল। কিউলিস বলেন, এ ভাবে আমিষ তৈরির জন্য কোনো জৈবপ্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করার দরকার নেই। গোটা পদ্ধতিটি মোটের ওপর সোজাসাপ্টা।
ভুলে গেলে চলবে না ঝামেলার পা মেলা। মানে এই সহজ পথেও সমস্যা আছে । শরীরের কোষরাজিকে ছিনতাইয়ের মতলবে অনেক ভাইরাস এবং পরজীবী আরএনএকে রূপান্তর ঘটিয়ে নেয়। এ ভাবে দেহ-প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে নজরদারি এড়ানোর কসরত করে তারা। শরীরের তা অজানা নেই। কিন্তু আমাদের রক্ত, ঘাম এবং চোখের পানিতে রেনেজ নামের এনজাইম থাকে। কোষের বাইরে কোনো আরএনএ পেলে তাকে খেয়ে ফেলে রেনেজ। এরপরও যদি বহিরাগত কোনো চালাক-চতুন আরএনএ কোষরাজির মধ্যে ঢুকে যায় তাহলে তার বিরুদ্ধেও দেহ-প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে লেলিয়ে দেওয়ার দায়িত্বও পালন করে রেনেজ।
তা হলে? বহিরাগত আরএনএর বিরুদ্ধে দেহ-প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চাঙ্গা বা সতর্ক করে তোলার আগেই রেনেজ হত্যা করল টিকাকে! এ যেন, প্রথম দৃশ্যেই নায়কের মৃত্যু! কেউ কেউ হতাশ হয়ে বললেন, ডিএনএ টিকা ছাড়া পথ নেই। কিন্তু পথ পাওয়া গেল, নানা পরীক্ষা নিরীক্ষার পর দেখা দেখা গেল চর্বি বা তেলজাতীয় কিছু দিয়ে এমআরএনএন মুড়ে দেওয়া হলে রেনেজের প্রাণঘাতী মারে মুখে পড়তে হয় না।
২০১৩ সালে চীনে একশ ব্যক্তি আক্রান্ত হলে এইচ৭এন৯ বার্ড ফ্লু ভাইরাসে। অনলাইনে এই ভাইরাসের বংশগতির অনুক্রম প্রকাশের মাত্র ৮ দিনের মাথায় টিকা বের করে ফেলল মার্কিন কোম্পানি নোভার্টিস। এর আগে এতো দ্রুত কোনো টিকা বের হয়নি। তবে তাড়াতাড়িই বার্ড ফ্লু বিদায় নেয়। টিকা পরীক্ষার মওকাই আর মেলেনি।
সুতরাং পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়নি এমন টিকায় মোটা মুনাফার আশা নেই দেখে এ গবেষণা থেকে পিছুটান দিল বড়ো বড়ো সব ওষুধ কোম্পানি। দুটি মাত্র ছোট কোম্পানি মডার্না এবং বায়োএনটেক লেগে রইল। ২০২০’এ সর্বাঙ্গে শুঁয়াপোকার মতো শুঁয়াঅলা করোনা, শুঁয়া না দেখে বরং মুকুটের অঙ্গসজ্জা দেখতে পেয়েছেন পশ্চিমী বিজ্ঞানীরা এবং আমরাও মেতেছি তাতে, ভাইরাসসৃষ্ট বিশ্বমারি ছড়াল দুনিয়ায়। ততদিনে এমআরএনএ টিকার ছোট ছোট কিছু পরীক্ষা হয়েছে। তবে এ সবই ক্যান্সার সংক্রান্ত। তারপরও এ সব টিকার কোনোটাই মানুষকে দেওয়ার অনুমোদন তখনো পাওয়া যায়নি।
বিশ্বমারির দিনগুলোতে সব বদলে গেল। শুঁয়াভাইরাস করোনা দমানোর কাজে নষ্ট করার মতো সময়ের বিলাসিতা ছিল না। বিশ্বমারির সর্বনাশ কিন্তু এমআরএনএ ভাইরাস গবেষণার জন্য সুযোগের পৌষ মাস হয়ে উঠল। এমআনএনএ টিকার দিন এ ভাবেই ফিরল। আগস্টেই মার্কিন ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিসট্রেশনের প্রথম অনুমোদন পেল ফাইজার/বায়োএনটেক টিকা।
কোভিড-১৯’এর টিকার মধ্য দিয়ে চিকিৎসার এ নতুন পদ্ধতি নিজের বিপুল ক্ষমতার প্রমাণ প্রায় চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। বিশাল মুনাফার অবকাশ রয়েছে দেখতে পেয়ে এবারে বিনিয়োগকারীরা হামলে পড়ল। তাদের তহবিল থেকে অর্থের অঢেল ঝর্ণাপ্রবাহ বইতে শুরু করল। কিউলিস বলেন, একে ‘গোল্ড রাশ’ (সোনা পাওয়ার হুজুগে জীবন তুচ্ছ করে হাজার হাজার মানুষের আমেরিকার পশ্চিমে সেই শ্রমসধ্য ও ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান) বলা যায়। তিনি আরো বলেন, সত্যি বলতে কি টিকা প্রয়োগের অনেক বড় সম্ভাবনা রয়েছে তবে চাহিদা মতো সঠিক আমিষ খুঁজে বের করতে হবে।
