এক গ্লাস দুধ হাতে মা তার ছোট্ট সোনামণির পেছন পেছন দৌড়ে বেড়াচ্ছে। ঘরে ঘরে এটি খুব পরিচিত একটি দৃশ্য। পুষ্টিগুণের কথা মাথায় রেখেই প্রতিটি মায়ের জোর প্রচেষ্টা থাকে নিয়মিত এক গ্লাস করে দুধ পান করানোর।
কিন্তু অনেকসময় অনেক শিশু বা প্রাপ্তবয়স্কদের দুধ বা দুগ্ধজাত খাবার খেলে ডায়রিয়া, পেট কামড়ানো বা গ্যাসের সমস্যা হয়ে থাকে, দুধটা যেনো ঠিক হজম হতে চায় না। কেন এমনটা হয়? বাচ্চা কি তবে দুধ খাবে না? শরীরে ক্যালসিয়ামের চাহিদা পূরণ হবে কী করে?
দুধ বা দুগ্ধজাত খাবার খেলে অনেকের হজম হয় না; চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই সমস্যাকে বলা হয় ‘ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স’ বা ‘ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা’।
এটি কোনো ধরনের এলার্জি নয়, বরং পরিপাকতন্ত্রের পরিপাকজনিত জটিলতা মাত্র। দুধ বা দুগ্ধজাত খাবারে ল্যাকটোজ নামে এক ধরনের ন্যাচারাল সুগার থাকে যা অনেকের ক্ষেত্রে সঠিকভাবে ভেঙে পাচিত হতে পারে না ফলে পরিপাকতন্ত্রে ঠিকমত হজম হয় না।
ছেলে বা বুড়ো যেকোনো বয়সেই এই সমস্যা হতে পারে। এটি আপাততদৃষ্টিতে কোনো ক্ষতিকারক রোগ বা রোগের পূর্বলক্ষণ নয় তবে ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা থাকলে পেটের নানা রকম অস্বস্তিদায়ক সমস্যায় ভুগতে হয়।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ডায়াবেটিস অ্যান্ড ডাইজেসটিভ অ্যান্ড কিডনি ডিজিজেসের তথ্য অনুযায়ী, এশিয়ার দেশগুলোতে ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতার সমস্যা সবচেয়ে বেশি। বিশেষত পূর্ব এশিয়ার প্রায় ৭০-১০০% মানুষ এই সমস্যায় ভুগছে।
ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা থাকলে তবে কি সে দুধ বা দুগ্ধজাত খাবার খাবে না?
ডাক্তাররা বলেন, দুধ না খাওয়াই ল্যাকটোজ অসিষ্ণুতা নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে ভালো উপায়। তবে শরীরে ক্যালসিয়ামের চাহিদার কথাও মাথায় রাখতে হবে।
তাহলে দুধের বিকল্প হিসেবে শরীরে ক্যালসিয়ামের চাহিদা পূরণের জন্য কোন খাবারগুলো গ্রহণ করতে হবে?
জাপান বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশীপ হাসপাতালে কর্মরত পুষ্টিবিদ, ড. আয়শা সিদ্দিকা বিকল্প খাবারগুলো সম্পর্কে সম্যক ধারণা দিয়েছেন।
ল্যাকটেজযুক্ত দুধ
বাজারে ল্যাকটেজযুক্ত দুধ এবং দুগ্ধপণ্য পাওয়া যায় যাতে দুধে বিদ্যমান সকল পুষ্টিগুণই রয়েছে। ল্যাকটেজ এক ধরনের এনজাইম যা দুধে উপস্থিত সুগারকে ভাঙ্গতে সাহায্য করে।
ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার
পাতাজাতীয় শাকসবজি, যেমন-বাধাকপি, ব্রকলি; সয়াবিন, টফু, বাদাম। সামুদ্রিক মাছ ক্যালসিয়ামের অন্যতম উৎস। ছোট মাছ, যেমন-সারডিন মাছ। সারডিন মাছে নরম কাঁটা থাকে। এই মাছ কাঁটাসহ খেলে প্রচুর পরিমানে ক্যালসিয়াম পাওয়া যায়। এছাড়াও স্যালমন ও টুনা মাছে উচ্চ মাত্রায় ক্যালসিয়াম থাকে।
আমন্ড মিল্ক
দেখতে দুধের মতই কিন্তু কিন্তু এতে প্রোটিনের পরিমাণ দুধের চেয়ে কম। কিন্তু এতে উচ্চমাত্রায় ক্যালসিয়াম, ফাইবার এবং ভিতামিন ডি রয়েছে।
কোকোনাট মিল্ক
এটি দুধের চেয়ে খানিকটা ঘন। এতে উচ্চমাত্রায় স্যাচুরেটেড ফ্যাট রয়েছে।
সয় মিল্ক
এতে অন্যান্য পুষ্টিগুণের পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন এবং পটাশিয়াম রয়েছে।
ডেইরি ফ্রি-দই
বাজারে ডেইরি ফ্রি-দই পাওয়া যায় যা ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুদের জন্য একদম উপযুক্ত। এগুলো মূলত ফাইবার, প্রোবায়োটিকস, বাদাম নিঃসৃত দুধ এবং উদ্ভিজ প্রোটিনের সমন্বয়ে তৈরি করা হয়।
আইসক্রিমের বিকল্প
বাজারে অনেক ‘ডেইরি-ফ্রি’ আইসক্রিম কিনতে পাওয়া যায়। এছাড়াও ঘরে ফ্রোজেন কলা, ভ্যানিলা বা সামান্য পরিমাণ কোকোনাট বা আমন্ড মিল্ক মিশিয়েও আইসক্রিম বানিয়ে নেওয়া যেতে পারে।
বাটারের বিকল্প
বাটারের বিকল্প হিসেবে মার্জারিন ব্যবহার করা যেতে পারে। এছাড়াও রয়েছে কোকোনাট অয়েল, ওলিভ অয়েল বা অ্যাভোক্যাডো ব্যবহার করা যেতে পারে।
পনিরের বিকল্প
সফট চিজ (যেমন-উদ্ভিজ সফট চিজ), হার্ড চিজ (যেমন-প্রক্রিয়াজাত টফু)।
শবনম জাবীন চৌধুরী ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের ফার্মেসি বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন।
zabin860@gmail.com
