সকাল সাড়ে নয়টা; রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের সামনে থেকে যানবাহনের জটলা শুরু হয়ে ঠেকেছে শ্যামলী মানসিক হাসপাতালের প্রবেশ মুখ পর্যন্ত। হাসপাতালের সামনের রাস্তায় পুলিশের তল্লাশী চৌকিতে জিজ্ঞাসাবাদ চলায় এমন পরিস্থিতি।
এই চৌকিতে তিতুমীর নামের ট্রাফিক সার্জেন্ট বলেন, “যতটা সম্ভব তল্লাশী করছি। অধিকাংশই ব্যাংক ও হাসপাতালগামী যাত্রী। গাড়ির চাপ বেড়ে যাওয়ায় সবার কাগজপত্র দেখা সম্ভব হচ্ছেনা।”
শুধু এই সড়কই নয়, ঈদের পর শুরু হওয়া ‘কঠোরতম লকডাউনের’ তৃতীয় দিন রোববার পুরো ঢাকাতেও যানবাহন চলাচল বেড়েছে। তবে অধিকাংশই প্রাইভেট কার, মোটর সাইকেল ও পণ্যবাহী পিকআপ। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।
গণপরিবহন না থাকায় জরুরি প্রয়োজনে বাইরে বেরিয়ে দ্বিগুণ ভাড়ায় রিকশায় করে গন্তব্যে ছুটছেন অনেকে। বিভিন্ন মোড়ে ভাড়া নিয়ে যাত্রী ও চালকের মধ্যে বিতণ্ডার দৃশ্য দেখা গেছে।
সকালে কয়েক দফায় বৃষ্টি হওয়ায় কিছু কিছু এলাকায় তল্লাশি কাজে ছেদ পড়েছে। পুলিশ সদস্যরা ব্যারিকেড ছেড়ে দিয়ে রাস্তার পাশে গাছের নিচে আশ্রয় নেন। এমনই পরিস্থিতি দেখা গেছে বিজয় সরণি, জাহাঙ্গীর গেট ও আসাদগেট এলাকায়।
শনিবার রাতে গাজীপুর থেকে পাকা আনারস নিয়ে কারওয়ান বাজারে বিক্রি করতে এসেছিলেন ব্যাপারী রাতুল মিয়া। ফেরার পথে তিনি পড়েন বিড়ম্বনায়। পায়ে হেঁটেই গন্তব্যে যাচ্ছিলেন তিনি। দুই একটি মোটর সাইকেল পেলেও কেউ আব্দুল্লাহপুর যেতে রাজি হয়নি।
সকাল ১০টার দিকে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের সামনে বৃষ্টিতে ভিজতে থাকা রাতুল বলেন, “কারওয়ান বাজার থেকে এখানে আসতে গিয়ে তিনবার বৃষ্টিতে পড়েছি। কোনো রকমে আব্দুল্লাহপুর পর্যন্ত যেতে পারলে বাকিটা একটা ব্যবস্থা করা যেত।”
গাবতলী থেকে বনানীর গন্তব্যে ২০০ টাকা ভাড়ায় মহাখালী এসে রিকশা চালকের সঙ্গে বিতণ্ডায় জড়াতে দেখা যায় পঞ্চাশোর্ধ এক ব্যক্তিকে। পায়ের ব্যথার কারণে আর যেতে চাচ্ছিলেন না রিকশাচালক। বৃষ্টির মধ্যে বাকি পথ হেঁটে যেতে চাচ্ছেন যাত্রীও। তবে মিনিট দশেক বিতণ্ডার পর বৃষ্টি থামলে তারাও চলতে শুরু করেন।
মহাখালী ফ্লাইওভারের নিচে উত্তরা, আব্দুল্লাহপুরগামী বহু যাত্রীকে অপেক্ষায় দেখা যায়। তাদের অধিকাংশই এসেছেন কোনো না কোনো হাসপাতালে।
মিরপুর ষাট ফিট সড়কে বসা তল্লাশী চৌকিতে কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যরা জানান, মানুষজন বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে রাস্তায় নামছে। তাদের ঠেকানো যাচ্ছেনা। তবে সকাল থেকে কিছু গাড়ির কাগজপত্রে ঝামেলা থাকায় মামলা করা হয়েছে।
রাজধানীতে মানুষ ও যানবাহন চলাচল বাড়ার কথা জানালেন কাকরাইলের একটি ওষুধর দোকানে বিক্রয়কর্মী শামীমুর রহমান।
“আজকে মনে হচ্ছে না ঢাকায় লকডাউন আছে। অফিস-আদালত, শিল্প কারখানা, দোকানপাট-শপিংমল কিংবা গণপরিবহন বন্ধ থাকলেও রাস্তায় গাড়ি বেড়েছে। এসব গাড়ির মধ্যে প্রাইভেট কারের সংখ্যা গণনা করে দেখেন বেশি হবে। দুইদিন তো ভালোই মনে হয়েছিল, মানুষজন একটু সর্তক হচ্ছে। এখন তো দেখি না।”
একই চিত্র দেখা গেছে মালিবাগ, মৌচাক, কাকরাইল, শান্তিনগর, বিজয় নগর, পল্টন এলাকার রাস্তাঘাটে।
রামপুরা থেকে যাত্রী নিয়ে কাকরাইলে আসা রিকশা চালক রিপন বলেন, “গত দুইদিন মানুষজন রাস্তায় কম দেখা গেছে। আইজকা একটু বেশি। মানুষজন রাস্তায় বেশি দেখা গেলে আমগো জন্য আশীর্বাদ। কাস্টমার পামু পেটের জ্বালা মিটব।”
শান্তিনগর, মালিবাগ রেল গেইটের কাঁচাবাজারেও মানুষজনের উপস্থিত বেশি দেখা গেছে।
ঈদের ছুটির পর টিসিবির ট্রাকে ন্যায্যমূলে ডাল, চিনি ও তেল বিক্রি আবার শুরু হয়েছে। শান্তিনগরের কাছে ট্রাকে মানুষজনকে লাইন ধরে কিনতে দেখা গেছে পণ্য । তবে সেখানেও গাদাগাদি। ক্রেতাদের নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়াতে ট্রাকে বসা এক বিক্রেতা বার বার সতর্ক করছিলেন।
মূল রাস্তা ছাড়াও অলিগলিতেও মানুষজনের উপস্থিতি বেশি দেখা গেছে। গলির ভেতরে অধিকাংশ দোকানপাটই খোলা।
শেখেরটেক, মোহাম্মাদীয়া হাউজিং, লোহারগেট এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, দোকানপাট অধিকাংশ বন্ধ। কিছু দোকান খোলা থাকলেও টহল পুলিশের গাড়ি দেখলেই ঝাপ নামিয়ে ফেলা হচ্ছে।
মোহাম্মদীয়া হাউজিংয়ের একটি মুদি দোকানের কর্মচারী জোবায়ের ইসলাম বলেন, “পুলিশ আসার খবর পেলেই দোকানের শাটার নামিয়ে দিচ্ছি। আমাদের বেচাকেনা তো করতে হবে। দোকান বন্ধ রাখলে চলবে কিভাবে?“
ফেরিওয়ালারাও পুলিশের গাড়ি দেখলে গলির ভিতরে ঢুকে যাচ্ছেন।
সবজি বিক্রেতা স্বপন বিশ্বাস বলেন, “সকাল থেকে চারবার জায়গা বদলাইছি। আমরা তো আর ভিড় করি না। খোলা জায়গায় বসি। আমাদের ক্যান উডায়া দেয়?”
ধানমণ্ডি, মোহাম্মদপুর, সাত মসজিদ রোডেও এদিন তুলনামূলকভাবে লোকজনের আনাগোনা বেড়েছে।
ধানমণ্ডি ২৭ নম্বর এলাকায় অফিস খোলা থাকায় লোকজনের আনাগোনা বেড়েছে।
এখানে ট্রাফিক সার্জেন্ট দুর্জয় হাসান জানান, সকাল থেকে তিনজনকে মামলা দেওয়া হয়েছে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী এসব লোকের বের হওয়ার কথা নয়।
একই দৃশ পুরান ঢাকার আজিমপুর, লালবাগ, কেল্লার মোড়, বকশিবাজার ও পলাশীর অলিগলিতে।
অলিগলিতে ভ্যানগাড়িতে ফল আর সবজির পসরার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে মানুষের আনাগোনা।
লালবাগ চৌরাস্তা, ঢাকেশ্বরী, পলাশীর মোড় ও বকশিবাজারে অলিগলিতে কিছু মানুষ দেখা গেছে। আজিমপুর চৌরাস্তায়, বকশিবাজার, চানখারপুলে পুলিশের উপস্থিতি দেখা গেছে।
অন্যদিকে গুলিস্তান ও মতিঝিল অফিসপাড়ায় ব্যক্তিগত গাড়ি বেশি দেখা গেছে।
