অনলাইনে ট্রেনের আসন বুকিংয়ের টাকা কাটলেও সার্ভারের সমস্যার কারণে তা হয়নি বলে জানানো হয়, অথচ প্রায় দ্বিগুণ দামে সরাসরি বিক্রি করা হয় টিকেট।
এর প্রতিবাদ জানাতেই কমলাপুর রেলস্টেশনে অবস্থান নিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মহিউদ্দিন রনি।
রেলওয়ের অব্যবস্থাপনার পরিবর্তনে ছয় দফা দাবি জানিয়ে গত ৭ জুলাই থেকে টিকেট কাউন্টারের সামনে দুর্নীতিবিরোধী বিভিন্ন প্ল্যাকার্ডসহ চালিয়ে যাচ্ছেন অবস্থান কর্মসূচি। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।
মহিউদ্দিন রনি বলেন, যতদিন পর্যন্ত দাবি মানা না হবে ততদিন পর্যন্ত আমার এই অবস্থান কর্মসূচি চলবে।
স্টেশনে অবস্থান নেওয়ায় এবার ঈদেও বাড়ি যাওয়া হয়নি জানিয়ে তিনি শুক্রবার বলেন, টানা নয়দিন ধরে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছি, কিন্তু রেলওয়ের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা আমার দাবির বিষয়ে কোনো সাড়া দেননি।
যখন এক পুলিশ সদস্য আমাকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দিতে চেষ্টা করেছিল, তখন আমার বন্ধু-বান্ধব কয়েকজন চলে আসে।
তবে নিজেরা সহিংস হননি জানিয়ে রনি বলেন, এরপর আমরা রেলওয়ের কর্মকর্তাদের গোলাপের শুভেচ্ছা জানিয়ে দুর্নীতি ভেঙে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছি। আমরা রেলের দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে চাই।
রেলের টিকেট কাটতে গিয়ে হয়রানির বর্ণনা করে এই শিক্ষার্থী জানান, গত ১৩ জুন বাংলাদেশ রেলওয়ের ওয়েবসাইট থেকে ঢাকা-রাজশাহী রুটের ট্রেনের আসন বুক করার চেষ্টা করেন তিনি।
কিন্ত মুঠোফোনে আর্থিক সেবাদাতা সংস্থা বিকাশ থেকে ভেরিফিকেশন কোড দিয়ে তার পিন কোড ছাড়াই অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা কেটে নেওয়া হয়।
কিন্তু ট্রেনের কোনো আসন পাইনি, এমনকি কেন টাকা নেওয়া হল, তার কোনো রশিদও দেওয়া হয়নি।
পরে কমলাপুর রেল স্টেশনে সার্ভার কক্ষে অভিযোগ জানালে সেখান থেকে সিস্টেম ফল করার কথা বলা হয়। সেইসঙ্গে ১৫ দিনের মধ্যে টাকা না পেলে আবার যেতে বলা হয়৷
তবে তার সামনেই প্রায় দ্বিগুণ দামে টিকেট বিক্রির অভিযোগ করে রনি বলেন, কিন্তু ওই মুহূর্তে কক্ষে থাকা কম্পিউটার অপারেটর ৬৮০ টাকার সিট বারশ টাকায় বিক্রি করেন।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) সরদার সাহাদাত আলী বলেন, এই বিষয় নিয়ে কথা বলার মত দায়িত্বপ্রাপ্ত আমি না।
ছেলেটিকে সরিয়ে দেওয়া কিংবা কথা বলা, এমনকি মিডিয়াতে কথা বলার জন্য কোনো নির্দেশনা আমি পাইনি। নির্দেশনা ছাড়া তো আমার কিছু করার নাই। আপনি দায়িত্ব প্রাপ্তদের সঙ্গে কথা বলুন।
পরবর্তীতে রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোন ধরেননি। এসএমস পাঠানো হলে তারও সাড়া মেলেনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রনি জানান গত ১৪ ও ১৫ জুন দুবার তিনি ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে নিজের অভিযোগ জানান। কিন্তু সেখান থেকে কোনো জবাব বা শুনানির জন্য ডাক আসেনি।
পরে তিনি কমলাপুর রেলস্টেশনের টিকিট কাউন্টারের সামনে অবস্থান ও গণস্বাক্ষর কর্মসূচি শুরু করেন। কিন্তু তৃতীয় দিন ৯ জুলাই পুলিশ সদস্যরা তাকে বাধা দেন।
তখন থেকে তিনি গণস্বাক্ষর বন্ধ রেখে শুধু অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে প্রথম তিন দিনে শ খানেক মানুষের স্বাক্ষর সংগ্রহ করেছেন রনি।
পরে তার প্রতি সংহতি জানিয়ে রেল স্টেশনে অবস্থান নেন বন্ধু, সহপাঠীসহ বেশ কজন শিক্ষার্থী।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্র মোহাম্মদ মাহিন রুবেল ও কাজী আশিকুর রহমান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগের ছাত্রী জয়া মণ্ডলও যোগ দিয়েছিলেন।
সেখানে তারা গান, কবিতা, পথ নাটকের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানান। কয়েকদিন অবস্থান করার পর বাকিদের চলে যাওয়ার অনুরোধ করেন এবং একাই আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন রনি।
তিনি বলেন, এই মুহূর্তে আমি একাই অবস্থান করছি। যেহেতু এটা একটা ট্রান্সপোর্ট স্টেশন, অনেক মানুষ গ্যাদারিং করে এখানে, তো যাত্রীদের ভোগান্তিতে ফেলা যাবে না।
শান্তিপূর্ণভাবে আমি একাই কর্মসূচি চালিয়ে যাব। আশা করি অতি দ্রুত বাংলাদেশ রেলওয়ের অব্যবস্থাপনা পরিবর্তনে ৬ দফা দাবি বাস্তবায়িত হয়ে আঁধার কেটে আলো ফুটবে।
দাবিগুলো হল-
>> টিকেট ক্রয়ের ক্ষেত্রে সহজ ডটক কম কর্তৃক যাত্রী হয়রানি অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। হয়রানির ঘটনায় তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
>> যথোপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে টিকেট কালোবাজারি প্রতিরোধ করতে হবে।
>> অনলাইনে কোটায় টিকেট ব্লক করা বা বুক করা বন্ধ করতে হবে। সেই সাথে অনলাইন-অফলাইনে টিকেট ক্রয়ের ক্ষেত্রে সর্বসাধারণের সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
>> যাত্রী চাহিদার সঙ্গে সংগতি রেখে ট্রেনের সংখ্যা বৃদ্ধিসহ রেলের অবকাঠামো উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
>> ট্রেনের টিকেট পরীক্ষক ও তত্ত্বাবধায়কসহ অন্যান্য দায়িত্বশীলদের কর্মকাণ্ড সার্বক্ষণিক মনিটর, শক্তিশালী তথ্য সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে রেল সেবার মান বৃদ্ধি করতে হবে।
>> ট্রেনে ন্যায্য দামে খাবার বিক্রি, বিনামূল্যে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ও স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
এদিকে মহিউদ্দিন রনির সঙ্গে দেখা করে সংহতি জানিয়েছেন ডাকসুর সাবেক জিএস ও ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী, যুব ইউনিয়ের সাধারণ সম্পাদক খান আসাদুজ্জামান মাসুম।
এছাড়া শুক্রবার ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি মো. ফয়েজউল্লাহ এবং সাধারণ সম্পাদক দীপক শীল যৌথ বিবৃতিতে রনির ৬ দফা দাবির সঙ্গে সংহতি জানিয়েছেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশ রেলওয়ের যাত্রী হয়রানি, টিকিট কালোবাজারি, খাবারের মূল্য নির্ধারণে অন্যায্যতা, অস্বাস্থ্যকর স্যানিটেশন ব্যবস্থাসহ রেলওয়ের সামগ্রিক অব্যবস্থাপনা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এসব নিয়ে তেমন কোনো প্রতিবাদ প্রতিরোধ না হলেও যাত্রীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে প্রতিনিয়ত।
ছাত্র ইউনিয়নের বিবৃতিতে বলা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মহিউদ্দিন রনিসহ আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ৬ দফা দাবির সাথে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষ থেকে আমরা সংহতি জানাচ্ছি।
এই ন্যায্য দাবির অবস্থান কর্মসূচিতে রেলওয়ে এবং পুলিশ কর্মকর্তাদের অসহযোগিতা ও হুমকি প্রদর্শনের মত ঘটনার তীব্র নিন্দা এবং প্রতিবাদ জানাচ্ছি।