পঞ্চগড় এক্সপ্রেস ট্রেনটি চলছিল ঘণ্টায় প্রায় ৮০ কিলোমিটার গতিতে। ভোরের আলো কেবল ফুটেছে। লোকো মাস্টার (ট্রেন চালক) মো. শাহ আলম ও তার সহকারী মো. আরিফ হোসেন দেখলেন কয়েকজন লোক লাল গামছা নেড়ে ট্রেন থামানোর ইশারা দিচ্ছেন।
চালক দ্রুত ট্রেনের গতি নিয়ন্ত্রণ করেন, থামার পর দেখা যায় মাত্র ৫০ গজ দূরেই লাইনের একটা অংশ ভাঙা।
লোকোমাস্টার শাহ আলম বলেন, “লাইনের প্রায় ৮ ইঞ্চি জায়গা ভেঙে রয়েছে। এই রেলপথেই ট্রেনটি প্রায় ৮০ কিলোমিটার গতিতে পার হওয়ার কথা ছিল।
“গ্রামবাসীর তৎপরতায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছে ট্রেনের যাত্রীরা।”
বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ১১টায় ঢাকা থেকে রওনা দেওয়া ট্রেনটি শুক্রবার সকাল সাড়ে ৬টায় জয়পুরহাটের পাঁচবিবি স্টেশন অতিক্রম করে দিনাজপুরের হাকিমপুর স্টেশনের পথে ছিল।
আর রেললাইনের ভাঙা অংশটি ছিলো পাঁচবিবি উপজেলার বালিঘাটা ইউনিয়নের কোকতারা গ্রামে। ধান ক্ষেতের পাশে ট্রেন থামার পর যাত্রীরা নেমে ভাঙা অংশটি দেখতে ভিড় করেন। গ্রামের মানুষও জড়ো হয়।
গ্রামবাসী জানায়, স্থানীয় শফিকুল ইসলাম, তার ভাতিজা গুলজার ও স্থানীয় তরুণ নাজির হোসেন রেললাইনের ভাঙা অংশ দেখে ট্রেন থামানোর সিদ্ধান্ত নেন।
কোকতারা গ্রামের শফিকুল ইসলাম বলেন, ভোরে তিনি হাঁটতে বের হয়েছিলেন। ওই সময় এলাকার নাজির ভাঙা রেললাইন দেখে তাকে জানালে তিনি ভাতিজা গুলজারকে বাড়ি থেকে একটি লাল গামছা আনতে বলেন।
সেই লাল কাপড় দিয়ে নাজিরকে ঘটনাস্থল থেকে কিছুটা এগিয়ে থাকতে বলেন। গুলজারের সঙ্গে তিনিও লাল গামছা নিয়ে লাইনের ওপর দাঁড়ান।
তরুণ নাজির হোসেন বলেন, “লাইনের ভাঙা অংশটা দেখে মনে হয়েছে এদিক দিয়ে ট্রেন যাওয়া সম্ভব নয়। এই ভাঙা অংশে কোনো দ্রুতগামী ট্রেন পড়লে দুর্ঘটনার আশঙ্কা আছে।”
রেললাইনের কাছেই বাড়ি; তাই তারা জানেন যে ভোরের দিকে ঢাকা থেকে দিনাজপুরগামী ট্রেন যায়। ট্রেনটি থামাতে তিনি একটি লাল কাপড় নিয়ে বেশ কিছু দূর এগিয়ে যান। আর শফিকুল ও গুলজার লাল গামছা নিয়ে অবস্থান নেন ভাঙা অংশের সামনে।
ট্রেনের যাত্রী গোলাম মোস্তফা বলেন, “সৃষ্টিকর্তা আমাদের নিজের হাতে বাঁচিয়েছেন। ভোরের দিকে তখন ট্রেনটি অনেক জোরে চলছিল। হঠাৎ জোরে ব্রেক কষায় বেশ ঝাঁকিও লেগেছিল।
“গ্রামের মানুষের মধ্যে এই বুদ্ধিটা এসেছে, সেজন্য তাদের অবশ্যই পুরস্কৃত করা দরকার।”
ট্রেনে হাজারখানেক যাত্রী ছিলেন বলে জানালেন এর পরিচালক রায়হান মুস্তাফিজ রাজু। তিনি বলেন, “গ্রামবাসী সংকেত দিয়েছে বলে দ্রুতগামী ট্রেন থামাতে পেরেছেন লোকো মাস্টার।”
খবর পেয়ে রেলকর্মীরা এসে ভাঙা অংশটি মেরামত করেন। সোয়া এক ঘণ্টা আটকে থাকার পর সকাল ৮টা ২৫ মিনিটে ট্রেনটি আবার গন্তব্যের পথে রওনা দেয়।
