রেজিনের গয়নায়


শবনম জাবীন চৌধুরী | Published: November 15, 2021 17:10:42 | Updated: November 17, 2021 20:37:57


ফাইল ছবি (সংগৃহীত)

হালআমলে চিরচারিত গয়নার সাথে এসেছে বিভিন্ন উপাদানের অনুষঙ্গ ব্যবহারের চল। নতুন ধারার এসব ধরনের মাঝে অন্যতম হচ্ছে রেজিনের গয়না। হালকা সাজ-পোশাকের সাথে রেজিনের এই গয়নাগুলো খুব সুন্দর মানিয়ে যায়, প্রতিদিনের ব্যবহারের জন্য মানানসই।

আমাদের দেশে রেজিন বা রেজিনের তৈরি গয়নার পরিচিতি একদমই সামান্য। সম্প্রতি বেশ কিছু তরুণ উদ্যোক্তা এই ধরণের গয়না নিয়ে কাজ শুরু করেছেন; ইতিমধ্যে বেশ সাড়া পেয়েছে ক্রেতাদের মাঝে। চলুন আজকে জেনে নেয়া যাক রেজিনের তৈরি গয়না সম্পর্কে কিছু কথা।

রেজিনের গয়না তৈরির উৎসাহ নিয়ে উদ্যোক্তা হিসেবে যাত্রা শুরু করেন মেহের নওরিন। তিনি ২০২২ সালের একজন এসএসসি পরীক্ষার্থী। ফেসবুকে বিভিন্ন ছবি ও ভিডিওতে বাহারি রেজিনের গয়না তার নজর কাড়ে। কিছুদিনের মধ্যে এই আগ্রহই তার রেজিনের গয়না তৈরির কারিগর হওয়ার স্বপ্নে পরিণত হয়।

২০২১ সালের জানুয়ারিতে বিভিন্ন অনলাইন রিসোর্স ও ইউটিউব ঘেঁটে রেজিনের গয়না সম্পর্কে ধারণা নিতে শুরু করেন তিনি। কিছুদিন পরে একটি অনলাইন পেইজ থেকে প্রয়োজনীয় উপকরণাদি কিনে গয়না বানানো শুরু করেন এবং নিজের তৈরি রেজিনের গয়না গুলো নিয়ে উদ্যোক্তা হিসেবে পথ চলা শুরু করেন, ফেসবুকে খোলেন একটি পেইজ।

রেজিনের গয়না তৈরির ক্ষেত্রে তিনি বিদেশী ড্রাইড (শুকনো) ফুল দিয়ে কাজ করে থাকেন। তিনি বলেন,যেকোনো ফুল, পাতা বা ফুলের পাপড়ি দিয়েই কাজ করা সম্ভব। তবে বিদেশী ফুলগুলোই আমাকে বেশি আকর্ষণ করে; যেমন ডেইজি, আম্মি মজুস, নার্সিসাস প্লাম ব্লুজম, বেবি ব্রেথ ইত্যাদি।

কথা হয়েছিলো আরো এক তরুণ উদ্যোক্তার সাথে, তিনিও কাজ করছেন রেজিনের গয়না নিয়ে। জান্নাত লাজিন, তিনি বিইউপিতে অধ্যয়নরত রয়েছেন। বেশ কয়েকবছর আগেতার বোন তাকে রেজিনের একটি গয়না উপহার দিয়েছিলেন। গয়নাটি তার পছন্দ তো হয়েছিলই, সেই সাথে তার মনে এক কৌতুহলের সৃষ্টি করে। তার কাছে মনে হয়েছিল, পানির মাঝে ভাসছে যেন এক টুকরো ফুলের পাপড়ি। অতঃপর, স্নাতক পড়াকালীন সময়ে ২০২০ সাল থেকে তিনি রেজিনের কাজ শিখতে লাগলেন নিজেই এবং কাজ শুরুর উদ্দেশ্যে এর উপরকরণগুলো কোথায় পাওয়া যায় তারও খোঁজ শুরু হলো।

শুরুতে একদম শখের বসে গয়না বানানো শুরু করলেও দিনে দিনে মানুষের উৎসাহ, আগ্রহ ও চাহিদার কারণে তিনিও একটি অনলাইন পেইজ আর্টিসানাট- এর মাধ্যমে নিজের শখকে এখন ছোটখাট ব্যবসায় রূপান্তর করেছেন।

তিনি ফুল, পাতার পাশাপশি গয়না বানানোর ক্ষেত্রে নুড়ি পাথর, ছোট্ট শামুকের খোলস, বিভিন্ন ধরনের ছবিও ব্যবহার করে থাকেন যা কেবল দৃষ্টিনন্দনই নয় বরং গয়নার বিচিত্রতার জগতে খানিকটা ভিন্নতাও এনেছে।

প্রশ্ন আসতে পারে- যেহেতু প্রাকৃতিক ফুল বা পাতা দিয়ে গয়না তৈরি করা হয়, সেক্ষেত্রে ফুল-পাতাগুলো নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না? সিলিকা জেল দিয়ে ফুলগুলো শুকিয়ে তারপর সেগুলো ব্যবহার করা হয়। এছাড়া প্যাকেটজাত বিদেশি ফুলগুলো আগেই পানি শুকিয়ে খটখটে শুকনো (ডিহাইড্রেট) করে নেওয়া হয়, যাতে সেগুলো নষ্ট না হয়ে যায়।

প্রয়োজনমত রেজিন এবং তাতে পরিমাণমত হার্ডেনার মিশিয়ে ইচ্ছানুযায়ী ছাঁচে ফেলে পছন্দসই ফুল, পাতাবাচার্ম (ছোট ছোট আকৃতির কাগজ) দিয়ে রেজিনের গয়না তৈরি করা হয়ে থাকে। চাইলে এর সাথে কালার পিগমেন্ট বা গ্লিটার (জরি) ও মেশানো যায়। এই একেকটি গয়না শুকাতে প্রায় ২৪ ঘন্টা সময় লেগে যায়, তবে আল্ট্রাভায়োলেট কিউরিং মেশিনের সাহায্যে প্রায় সাথে সাথেও শুকিয়ে নেওয়া যায়।

স্বচ্ছ কাঁচের ন্যায় রেজিনের এই গয়নাগুলো সংরক্ষনের জন্য একটি বায়ুনিরোধক বাক্সে রাখা হয়। আলো থেকে দূরে, শুষ্ক ও শীতল জায়গায় সংরক্ষণ করলে এই গয়নাগুলো দীর্ঘদিন ভালো থাকে।

এমনই দেশের বিভিন্ন স্থানে রেজিনের গয়নার বেশ কজন তরুণ উদ্যোক্তা শুরু করেছেন তাদের পথচলা, সাথে সাথে বেড়ে চলেছে চাহিদাও। রেজিনের গয়নার অনন্যতা ও এর বৈচিত্র্যময় সাধাসিধে সৌন্দর্য একে তরুণদের মাঝে বেশ জনপ্রিয় করে তুলছে। চাহিদা বৃদ্ধির সাথে সাথে এর জন্য বেশ আকর্ষণীয় বাজারও বাংলাদেশে ইদানীংকালে তৈরি হচ্ছে।

শবনম জাবীন চৌধুরী ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের ফার্মেসি বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন

zabin860@gmail.com

Share if you like