ঢাকার বনানীর রেইনট্রি হোটেলে দুই তরুণীকে ধর্ষণের মামলায় সব আসামির খালাস পাওয়ার কারণ হিসেবে তদন্ত প্রতিবেদনের দুর্বলতার কথা বলছেন বাদীপক্ষের আইনজীবীরা।খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।
বাদীর আইনজীবী ফারুক আহাম্মদ রায়ের প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, মামলাটি মিথ্যা নয়। মিথ্যা হলে ট্রাইব্যুনাল ভিকটিম বাদীর বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১৭ ধারায় প্রসিকিউশন দাখিলের নির্দেশ দিতেন।
তিনি বলেন, ঘটনার অনেক দিন পর মেডিকেল পরীক্ষা হওয়ায় সেখানে ধর্ষণের আলামত না আসাই স্বভাবিক ছিল। তাই তারা মামলা চালাতে ভরসা করেছিলেন পারিপার্শ্বিক সাক্ষী ও আসামিদের স্বীকারোক্তির ওপর।
মূলত সঠিক তদন্ত না হওয়ায় আজ দুই ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার বঞ্চিত হলেন। যার কারণে আদালত তদন্তকারী কর্মকর্তাকে ভর্ৎসনা করেছেন।
ঢাকার ৭ নম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক বেগম মোছা. কামরুন্নাহার বৃহস্পতিবার এ রায়ে আপন জুয়েলার্সের মালিকের ছেলে সাফাত আহমেদসহ পাঁচ আসামির সবাইকে খালাস দিয়েছেন।
রায়ের পর্যবেক্ষণে তিনি বলেন, ঘটনার ৩৮ দিন পর মামলা হল, চিকিৎসক মেডিক্যাল রিপোর্টে ধর্ষণের আলামত পাননি মর্মে মতামত দিলেন, ভুক্তভোগীদের পরিধেয় কাপড়ে কোনো পুরুষের সিমেন্সের কনা পাওয়া যায় নাই। তারপরও তদন্ত চার্জশিট দাখিল করে আদালতের পাবলিক টাইম নষ্ট করেছেন।
এতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ রেইপ কেসের বিচার ব্যাহত হয়েছে। তিনি অন্য কোনো পক্ষ কর্তৃক প্রভাবিত হয়ে এই চার্জশিট দিয়ে মামলাটি বিচারের জন্য পাঠিয়েছেন। আজকের দিনসহ এই মামলায় ৯৪ কার্যদিবস ব্যয় হয়েছে।
৭২ ঘণ্টার পর মেডিকেল পরীক্ষা করা হলে যে ধর্ষণের আলামত পাওয়া যায় না, সে কথা তুলে ধরে বিচারক পুলিশকে ওই সময়ের পরে কোনো মামলা না নিতে বলেছেন।
এই রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে বাদীর আইনজীবী ফারুক আহাম্মদ বলেন, এ মামলার রায়ের পর একজন ভিকটিমের মায়ের সঙ্গে আমরা কথা বলেছি। তারা পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন। আমি উচ্চ আদালতে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছি।
এ মামলায় প্রধান আসামি ছিলেন সাফাত আহমেদ, যিনি আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদের ছেলে। বাকি আসামিরা হলেন সাফাতের বন্ধু সাদমান সাকিফ ও নাঈম আশরাফ ওরফে এইচএম হালিম, সাফাতের দেহরক্ষী রহমত আলী ও গাড়িচালক বিল্লাল। রায়ের সময় তারা সবাই আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
২০১৭ সালের ২৮ মার্চ বনানীর রেইনট্রি হোটেলে সাফাতের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই দুই ছাত্রীকে ধর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগ করা হয় এ মামলায়।
ঘটনার এক মাসের বেশি সময় পর ৬ মে বনানী থানায় মামলাটি করেন এক তরুণী। তার অভিযোগ ছিল, ওই হোটেলে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে তাকেসহ তার বন্ধুকে রাতভর আটকে রেখে সাফাত ও নাঈম ধর্ষণ করেন। অন্য তিনজন তাতে সহায়তা করেন।
মামলার মধ্য দিয়ে বিষয়টি সামনে এলে সারা দেশে ব্যাপক আলোচনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। আসামিদের গ্রেপ্তারের দাবিতে রাজপথে মানববন্ধনের মত কর্মসূচিও পালন করে বিভিন্ন সংগঠন।
মামলা হওয়ার কয়েকদিনের মধ্যে ১১ মে সিলেট থেকে সাফাতকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার সঙ্গে গ্রেপ্তার হন সাদমানও। অন্য আসামিদেরও এর মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়।
পরের মাসেই তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনের (ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার) পরিদর্শক ইসমত আরা এমি আদালতে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। অভিযোগ গঠনের পর জুলাই মাসে শুরু হয় সাক্ষ্যগ্রহণ।
রাষ্ট্রপক্ষে এ মামলা পরিচালনা করেন এ ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আফরোজা ফারহানা আহমেদ অরেঞ্জ। রায়ের কপি পেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলেছেন তিনি।
অরেঞ্জ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এই মামলায় বিচারে সহযোগিতা করেছি। আদালত চুরচেরা বিশ্লেষণ করেছেন। রাষ্ট্রপক্ষ থেকে কী করব ঠিক এখনই বলতে পারছি না।
অন্যদিকে সাফাত আহমেদের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ঘটনার সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে আদালত চূড়ান্তভাবে রায় ঘোষণা করেছেন। আসামিদের খালাস দিয়েছেন। আমরা প্রথমে থেকেই বলছিলাম এটা অবিশ্বাস্য ঘটনা। পরবর্তীতে যারা প্রসিকিউশন করেছেন, সাক্ষ্য প্রমাণ আদালতে এনেছেন, ২২ জন সাক্ষী হাজির করা হয়। পরেই মেডিকেল রিপোর্ট, ডিএনএ রিপোর্ট, ভিকটিমের জবানবন্দি মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। এজন্য আদালত তাদের খালাস প্রদান করেছে।
আসামিপক্ষের এই আইনজীবীও তদন্তকারীদের সমালোচনা করেন। তার ভাষায়, তদন্তকারী টিম মামলা তদন্তে চূড়ান্তভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।
এই মামলাটি গ্রহণ করার পর থেকে তারা যেভাবে উপস্থাপন করেছেন, আমরা বিস্মিত হয়েছি। তাদের ব্যর্থতায় আদালত বলেছে, এই মামলায় চূড়ান্ত রিপোর্ট হওয়ায় উচিত ছিল। কিন্ত তারা কাউকে খুশি করার জন্য এ কাজ করেছিলেন।
নাঈম আশরাফের আইনজীবী এম এ বি খায়রুল ইসলাম (লিটন) বলেন, সাফাত আহমেদের সাবেক স্ত্রী মডেল ফারিয়া মাহবুব পিয়াসা ষড়যন্ত্র করে উচ্চ পর্যায়ে ব্যবসীদের কাছে হেনস্তা করার জন্য ১ মাস ৮ দিন পরে মামলাটি দায়ের করে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছে। আদালত সব দিক বিবেচনা করে মামলার মেডিকেল রিপোর্ট, ডিএনএ টেস্ট, আসামিদের দেওয়া জবানবন্দি, নারী ও নির্যাতন দমন আইনের ২২ ধারায় ভিকটিমের জবানবন্দি এবং ২২ জন সাক্ষীর জবানবন্দি পর্যালোচনা করে আসামিদের খালাস প্রদান করেছে।
আদালতের পর্যবেক্ষণের কথা তুলে ধরে এই আইনজীবী বলেন, মিথ্যা মামলায় আদালতের ৯৩ কার্যদিবস নষ্ট হয়েছে।