‘বড় বড় দেশে এমন ছোটো ছোটো ঘটনা ঘটতেই পারে’- সংলাপটি চেনা নেই এমন বলিউড সিনেমাপ্রেমী মানুষের খোঁজ পাওয়া দুষ্কর। যুগ দুয়েক আগে হলেও সিনেমার সংলাপগুলো এখনো লেগে আছে মানুষের ঠোঁটে।
রূপালী পর্দায় সোনালী ইতিহাসের ছাপ রেখে যাওয়া এই সিনেমাগুলো আজকের সময়ের সিনেমাগুলোর মতো সপ্তাহ দুয়েক ধুন্দুমার ব্যবসা করে হারিয়ে যেত না। বরং সেগুলো অনেকদিন ধরেই মাতিয়ে রাখতো সিনেমা হলগুলো। কতদিন চলতো একেকটি সিনেমা?
ম্যায়নে পেয়ার কিয়া (১৯৮৯); ৫০ সপ্তাহ
নব্বইয়ের দশকের প্রথম সাড়া জাগানো সিনেমা ম্যায়নে পেয়ার কিয়া। মুক্তি পাওয়ার পর ‘ফ্রেন্ডস’ লেখা ক্যাপের চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। অভিষেক বচ্চন তার বোনকে এমন ক্যাপটি উপহার দেন। এতেই এই সিনেমার জনপ্রিয়তার প্রমাণ মেলে। 
সিনেমাটি শুধু দর্শক হৃদয়েই জায়গা করে নেয়নি, একই সাথে গড়ে তুলেছে ভবিষ্যতে সুপারস্টার সালমান খানকেও। ম্যায়নে পিয়ার কিয়া মুক্তি পায় ৩২ বছর আগে ১৯৮৯ সালে।
ছবিটি মুক্তির পর থেকে টানা ৫০ সপ্তাহ, অর্থাৎ প্রায় এক বছর থিয়েটারে চলে। তখনকার সময়ে সিনেমার আয় দাঁড়ায় ৪০ কোটি রুপিতে। এটি নির্মাণে খরচ হয় মাত্র ২ কোটি যেখানে নায়ক সালমানের সম্মানি ছিল ৩০ হাজার রুপি মাত্র।
হাম আপকে হ্যা কোউন (১৯৯৪); ১ বছর

টানা এক বছর প্রেক্ষাগৃহে চলমান সিনেমার এই তালিকায় যুক্ত হয় সালমানেরই আরেক সিনেমা হাম আপকে হ্যায় কোউন। ম্যায়নে পিয়ার কিয়ার পরিচালক সুরজ বর্জাতিয়ার দ্বিতীয় ছবি এটি। মুক্তির পাওয়ার সাথেই সাথেই বর্জাতিয়ার ক্যারিয়ারের এই ছবিটিও জায়গা করে নেয় বলিউডের ইতিহাসের পাতায়।
সালমান খান ও মাধুরী দীক্ষিত অভিনীত এই সিনেমা প্রেক্ষাগৃহে চলে প্রায় এক বছরের মতো। ৭ কোটি বাজেটের এই সিনেমাটি তখন আয় করে ১০০ কোটির বেশি। মুদ্রাস্ফীতির হিসেবে এখন এটি ১৮’শ কোটি ছাড়ায়।
রাজা হিন্দুস্তানি (১৯৯৬); ১ বছর
পর পর সালমানের প্রেক্ষাগৃহ দখল করার রেকর্ডটি এবার যায় আমির খানের কাছে। এক বছর ধরে বড় পর্দায় জায়গা করে নিতে সক্ষম হয় আমির খান ও কারিশমা কাপুর অভিনীত ছবি রাজা হিন্দুস্তানি।
‘পরদেশি পরদেশি জানা নেহি,’ ‘কিতনা পিয়ারা তুঝে রাবনে বানায়া’ কিংবা ‘আয়েহো মেরি জিন্দেগিমে তুম বাহার বানকে’ - এই গানগুলোর সাথে সমস্বরে দর্শক গেয়ে ওঠেনি এমন কোনো প্রেক্ষাগৃহ তখন মিলতো না বললেই চলে।
দর্শকরা বছর জুড়েই সিনেমাটি উপভোগ করেছে মুম্বাই, দিল্লি, পাঞ্জাব ও বাংলার সিনেমা হলগুলোতে। প্রায় ৬ কোটি রুপির এই সিনেমা আয় করে নেয় ৪৫ কোটি রুপি।
কাহো না পেয়ার হ্যা (২০০০); ১ বছর
হৃতিক রোশন ও আমিশা প্যাটেল তাদের প্রথম সিনেমাতেই করেন বাজিমাত। পুনর্জন্মের ধারণার ওপর নির্মিত এই চলচ্চিত্রও টানা এক বছর প্রেক্ষাগৃহ মাতিয়ে রেখেছিল। তবে এই চলচ্চিত্র এক বছর পার হওয়ার পরও বিভিন্ন সিনেমা হলে চলেছিল, অন্তত ভারতীয় বক্স অফিসের পরবর্তী সময়ে এই সিনেমার টিকেট বিক্রির রেকর্ড তা-ই বলে।
সিনেমাটি আয় করে প্রায় ৬৮ কোটি রুপি যেখানে এর নির্মাণে খরচ হয় প্রায় ১০ কোটি।
বারসাত (১৯৪৯); ১০০ সপ্তাহ

রূপালী পর্দায় সোনালী ইতিহাসের সূচনা জানতে হলে পিছনে যেতে হবে আরো পাঁচ দশক। বলিউডে তখন চলছে রাজ কাপুর ও নার্গিসের যুগ। তাদের চলচ্চিত্র বারসাত, বাংলায় যার অর্থ বর্ষা, হয়তো বৃষ্টি হয়েই নেমেছিল খরায় জর্জরিত বোম্বের ফিল্ম পাড়ায়।
রাজ-নার্গিসের বারসাতের ১০০ সপ্তাহের দৌড়ে অনেকটাই দাড়িয়ে যায় বোম্বে টকিজ।
মুঘলে আজম (১৯৬০); ১৫০ সপ্তাহ

পরিচালক কে. আসিফ যখন এই সিনেমার গল্প নিয়ে ভাবতে থাকেন তখনই প্রতিজ্ঞা করেন যে তিনি এমন কিছু বানাবেন যা ভারতের সিনেমার ইতিহাসে কখনো হয়নি, এমন কিছু যা যুগে যুগে হবে অনুকরণীয়।
কে. আসিফের এই প্রতিজ্ঞার ফল হিসেবে এসে দাঁড়ায় মুঘলে আজম। দিলীপ কুমার, মধুবালা, পৃথ্বী রাজ কাপুরের অভিনয় শৈলী, ঐতিহাসিক সেট ও কস্টিউম ডিজাইনে তৈরি আসিফের এই ম্যাগনাম অপাস থিয়েটারে চলে প্রায় তিন বছর, সপ্তাহের হিসেবে ১৫০। তবে একুশ শতকে আবারো সিনেমাটি মুক্তি দেয়া হয় বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে।
সিনেমাটি তৈরিতে খরচ হয় তখনকার দেড় কোটি রুপি আর আয় করে ৫ কোটি ৭০ লক্ষ রুপি। মুদ্রাস্ফীতি ধরলে এখন এর আয় দাঁড়ায় ২০০০ কোটি রুপিরও বেশি!
কিসমত (১৯৪৩); ১৮৭ সপ্তাহ

অশোক কুমার অভিনীত কিসমত অবিভক্ত ভারতের প্রথম ব্লক বাস্টার সিনেমা। প্রেক্ষাগৃহে এই চলচ্চিত্রটি চলে পড়ায় ১৮৭ সপ্তাহ ধরে।
বোম্বে ও কোলকাতার রোক্সি সিনেমা হলে প্রথমে মুক্তি পায় ছবিটি। বোম্বের হল থেকে নেমে গেলেও কোলকাতায় দাপিয়ে বেড়িয়ে অভিনেতা ও প্রযোজকদের ‘কিসমত’ পাল্টে দেয় এই সিনেমা।
শোলে (১৯৭৫); ৫ বছর

দীর্ঘদিন হলে থাকার রেকর্ডটি মুঘলে আজমের পর আর কোনো ভারতীয় ছবি ভাঙতে পারবে বলে কেউ আশাও করতে পারে নি। এভাবেই কেটে যায় ১৫টি বছর। তারপর সন ১৯৭৫-এ মুক্তি পায় শোলে। বাকিটা ইতিহাস।
বন্ধুত্ব, প্রেম, রোম্যান্স ও অ্যাকশন - সব ধরনের উপাদান ছিল এই সিনেমায়। সত্তরের দশকের রাজনৈতিক টালমাটাল পরিস্থিতির বহিঃপ্রকাশও ঘটে এই সিনেমায়।
সেলিম-জাবেদের লেখা, রমেশ সিপ্পির পরিচালনা, আমজাদ-সঞ্জীব, ধর্মেন্দ্র-অমিতাভ-জয়া-হেমা মালিনীর অভিনীত চলচ্চিত্রটি তখন আয় করে ৩৫ কোটি রুপি। সিনেমাটি নির্মাণে ব্যয় হয় ৩ কোটি রুপি।
‘৭৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত শোলের সোনালী র্যালি থামে ৮০ সনে। কিন্তু এখনো ‘এভারগ্রিন’ এই বলিউড সিনেমার প্রদর্শনী চলেই আসছে ভারতজুড়ে নানা প্রেক্ষাগৃহে।
দিল ওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে (১৯৯৫); ২৭ বছর

ভারতে রোমান্টিক সিনেমার ইতিহাস যদি লেখা হয় তাহলে প্রথম অধ্যায় হবে ডিডিএলজে অর্থাৎ দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে। সিনেমার মুক্তির পর ভারতীয় উপমহাদেশের দর্শকেরা যেন পায় তাদের স্বপ্নের নায়ককে আর বলিউড পায় তার বাদশাহ - শাহরুখ খান।
রাজ যখন দুই হাত মেলে কাছে টেনে নেয় তার প্রিয়তমাকে, ভারতবর্ষের হাজারো তরুণ-তরুণীর হৃদয়ে তখন জেগে ওঠে রাজ-সিমরান।
শাহরুখ বিভিন্ন পুরস্কার বিতরনী অনুষ্ঠানে বেশ কয়েকবার স্মৃতিচারণ করেন, “আমি সিনেমাটির সাফল্য নিয়ে একটু সংশয়ে ছিলাম। তখন আমার পাশ থেকে বন্ধু আমাকে বললো, ‘দেখিস এই সিনেমা আমারটার থেকেও বেশি সফল হবে, তোকে সবাই মনে রাখবে।’ কথাটি বলেছিল আমার বন্ধু সালমান খান।”
সালমানের কথা এতোটাই সত্যি হয় যে টানা ২৭ বছর অর্থাৎ ১৩৫৬ সপ্তাহ ধরেও থামছে না এই ঐতিহাসিক সিনেমার যাত্রা।
মুম্বাইয়ের মারাঠা মন্দির হলে এখনো প্রতি শুক্রবারে দেখা যায় এই ছবি। সিমরানরা এখনো অপেক্ষা করে তার রাজের আর ভারতবর্ষের হাজারো তরুণ রাজের সাথে তাল মিলিয়ে বলে ‘পালাট, পালাট, পালাট!’
মোঃ ইমরান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করছেন।
imran.tweets@gmail.com
