মায়ের সাথে সন্তানের সম্পর্ককে পৃথিবীর সবচাইতে নিঃস্বার্থ সম্পর্ক বলা হয়। গর্ভধারণের মুহূর্ত থেকেই যেন অনাগত সন্তানের সাথে স্থাপিত হয় সে সম্পর্ক। এই সম্পর্কের বিভিন্ন রূপ বিভিন্ন সময়ে চলচ্চিত্রের রিলে ফুটে উঠেছে, জনপ্রিয়তা পেয়েছেন বহু মা চরিত্র।
ঢালিউড ও বলিউডের জনপ্রিয় এমন বেশ কয়েকটি সিনেমা রয়েছে, যেখানে মায়েরা কেড়ে নিয়েছেন দর্শকের সবটা মনোযোগ। শুধু স্নেহসুলভ মমতা দিয়েই নয়, চরিত্রের দৃঢ়তা আর বিবর্তনের মধ্য দিয়ে এসব চলচ্চিত্রে মায়েরা হয়েছেন আরো শক্তিশালী।
হাঙর নদী গ্রেনেড (১৯৯৭)
এই সিনেমাটির চিত্রনাট্য নেয়া হয়েছিল কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের একই নামের উপন্যাস থেকে। মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে এগিয়ে যায় এ সিনেমার কাহিনী। বুড়ি নামের চরিত্রটির মাধ্যমে প্রমাণ হয় যে একজন মা শুধু সন্তানকে আগলে রাখতেই জানেন না, বৃহত্তর স্বার্থের জন্য দেশমাতৃকার সন্তান হিসেবে নিজের কলজের টুকরোকে বিলিয়েও দিতে পারেন।
হাঙর নদী গ্রেনেড এমন এক মায়ের আত্মত্যাগের গল্প, যিনি প্রতিনিধিত্ব করেন ইতিহাসের সেইসব সাহসী মায়ের, যারা দেশকে ভালোবেসে নিজের শেষ সম্বলটুকু ছেড়ে দিতে পিছপা হননি। মন কেঁদেছে, চোখ পুড়েছে তবু কর্তব্যকে তারা সবচাইতে এগিয়ে রেখেছেন। এই চরিত্রটিতে অভিনয় করেছিলেন অভিনেত্রী সুচরিতা। সিনেমার পরিচালনায় ছিলেন চাষী নজরুল ইসলাম।
আম্মাজান (১৯৯৯)
বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ধারার চলচ্চিত্র ইতিহাসে শীর্ষেই অবস্থান করে এই সিনেমাটি। দর্শক জনপ্রিয়ও হয়। নামচরিত্রে অভিনয় করেছিলেন শবনম এবং তার সন্তানের ভূমিকায় ছিলেন প্রয়াত অভিনেতা মান্না। এক মমতাময়ী, সাধারণ দেখতে মায়ের চরিত্রের বিবর্তনটাই যেন সিনেমার মূলে থাকে।
মায়ের সাথে ঘটে যাওয়া এক যন্ত্রণাময় অভিজ্ঞতার পর থেকে এ বিবর্তনের শুরু। একমাত্র ছেলের প্রতি সীমাহীন ভালোবাসার পরও যেন এক মনস্তাত্ত্বিক জটিলতায় গল্পটা এগিয়ে যায়। এখানে মায়ের কোমল ও কঠোর দুই চেহারাই ফুটে ওঠে।
মাদার ইন্ডিয়া (১৯৫৭)
সন্তান যদি অন্যায় করে, তবে তাকে সমর্থন করাই মমতার আসল পরিচয়, নাকি তাকে ঠিক পথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা? আর যদি সন্তানকে সুপথে ফেরানো অসম্ভব হয়, তার দ্বারা বৃহৎ কোনো ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে? কী করবেন একজন মা?
এই সিনেমার মা তেমনই এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন, এবং সে সময় তার নেয়া পদক্ষেপই তাকে করে তোলে পুরো গ্রামের মা। তিনি হয়ে ওঠেন মাদার ইন্ডিয়া; দেশমাতৃকার পরিচয়।
নামচরিত্রে অভিনয় করেছেন বলিউডের প্রখ্যাত অভিনয়শিল্পী নার্গিস। পর্দায় তার এক সন্তানের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন পরবর্তী সময়ে তারই স্বামী সুনীল দত্ত। এই সিনেমার সেটেই নার্গিসকে আগুনের হাত থেকে বাঁচিয়েছেন তিনি। ১৯৫৮ সালে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
মম (২০১৭)
বলিউডের প্রয়াত অভিনেত্রী শ্রীদেবীর ক্যারিয়ারের সর্বশেষ সফল সিনেমার তকমা দেয়া যায় এটিকে। এ সিনেমার মা চরিত্রটি গর্ভধারিণী না হয়েও সন্তানের নিরাপত্তার জন্য, তার সাথে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ করবার জন্য এক পর্যায়ে সীমা ছাড়িয়ে যান, নাকি যান না?

বেশিরভাগ সিনেমায় সৎ মা বলে যেসব খলনায়িকাকে উপস্থাপন করা হয়, সে ছাঁচ থেকে বেরিয়ে আসা হাতেগোনা সিনেমার মধ্যে থাকবে মম। একসময়ের তুমুল জনপ্রিয় নায়িকা শ্রীদেবী তার জীবনের শেষ কাজগুলোতে একজন চরিত্রাভিনেতা হয়ে উঠেছিলেন। এ সময়ে তিনি উপহার দিয়েছেন ইংলিশ ভিংলিশ-এর মতো আধেয়নির্ভর সিনেমাও। মমও সেই পরম্পরায় এগিয়েছে।
অনিন্দিতা চৌধুরী বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করছেন।
anindetamonti3@gmail.com