রবীন্দ্রনাথের কাছে নামকরণ যেসব ফুলের


সুস্মিতা রায় | Published: May 08, 2022 14:58:07 | Updated: May 08, 2022 19:04:08


রবীন্দ্রনাথের কাছে নামকরণ যেসব ফুলের

রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতি প্রেমের পরিচয় মিলেছে তার রচিত সাহিত্যে। ফুল-লতা-পাতার সাথে কবির মধুমাখা সম্বন্ধ শৈশব হতেই। তারপরে যেখানেই গিয়েছেন, সেখানেই অতি ধীরে নিরক্ষণ করেছেন প্রকৃতির অলংকারকে।বিশ্ব ভ্রমণকালে যে ফুলের গাছ ভালো লেগেছে, তাকে ভালোবেসে রোপন করেছেন শান্তিনিকেতনের আঙিনায়। তা সে দেশি হোক কিংবা বিদেশি ফুল হোক, তার ভালোবাসা নিঃশেষে ঝরেছে। অপরিচিত ফুলগুলিকে পরিচিত করেছেন চমৎকার সব নাম দিয়ে।

সুদূর জাপানের ফুল ক্যামেলিয়া কিংবা দক্ষিণ আমেরিকার রডোড্রেনড্রন যেমন আসন লাভ করেছে তার লেখনীতে, তেমনি অতি আদরে মধ্যমণি হয়েছে বাংলার চিরচেনা বকুল, যুঁথি, জাতি পুষ্প।

'ফুলের মতন আপনি ফুটাও গান,

হে আমার নাথ, এই তো তোমার দান।

ওগো সে ফুল দেখিয়া আনন্দে আমি ভাসি,

আমার বলিয়া উপহার দিতে আসি,

তুমি নিজ হাতে তারে তুলে লও স্নেহে হাসি,

দয়া করে প্রভু রাখো মোর অভিমান।'

-গীতাঞ্জলি

পুষ্পের সৌন্দর্য বিন্দু বিন্দু হয়ে জমা হতো রবীন্দ্রনাথের হৃদয়ে, উৎসারিত হতো কথায় আর কবিতায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নামকবঙ্গসাহিত্যের মহীরুহে প্রস্ফুটিত গল্প, কবিতা, গান, নাটক ও পত্রাবলিতে মোটামুটি ১০৭ টির মতো ফুলের নাম পাওয়া যায়। শুধু ফুল প্রকৃতিকে নিয়েইতিনি লিখে ফেলেছেন একটা গোটা উপন্যাস -'মালঞ্চ'। সেখানে নিজের প্রকৃতি প্রেমী মনটিকেই সাজিয়েছেন নানা ফুলে আদিত্য আর নীরজার বাগানে।

১৬১তম জন্মবার্ষিকীতে আজ তপবন প্রেমী কবির চরণে রইল পুষ্পের অর্ঘ্যমাল্য, তারই রচিত উদ্যানের পুষ্পরাজিতে।

বাগানবিলাস

বৈজ্ঞানিক নাম: Bougainvillea glabra

রঙে চঙে একখানা ফুল, কাগজের মতো মনে হয়, তাই অনেকেই বলে কাগজ ফুল। প্রায় বাড়ির বাগানে, গেটে দেখা যায়।

জন্ম নাকি তারদক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশে, ব্রাজিলের বনে তাকে প্রথম দেখে টেকে বইয়ের মধ্যে ঠাঁই দিয়েছিল ফ্রান্সের লুই অটোইন ডি বোগেনভিল। তাই তারই নামে নাম হলো বোগেনভোলিয়া। ইংরেজদের হাত ধরেই বঙ্গদেশে এই ফুলের আগমন। তো স্বাভাবিক ভাবেই শুধু অভিজাতদের বাগানেই তখন তার দেখা মিলতো। এমনই এক বিলাসী বাবুর বাড়ির বাগানে বোগেনভোলিয়ার সাথে কবি বাবুর প্রথম সাক্ষাৎ। তো রূপে মুগ্ধ হলেও, কবির নামটি মোটেও মনে ধরলো না। কবির মাথায় এলো সুন্দর একটা বাংলা নাম - বাগানবিলাস। সেই থেকে বোগেনভিলা এই নামেই পরিচিত।

অলকানন্দা

বৈজ্ঞানিক নাম: Allamanda cathartica

সবুজ পাতার মাঝে পাঁচ পাপড়ি মেলে ধরা ঘন্টা আকৃতির হলুদ একটি ফুল। ফুলের স্বর্ণালি শোভা দৃষ্টিকে নন্দিত করে, মনে বিলায় আনন্দ।

ইংরেজি নাম আলমান্ডা। রবীন্দ্রনাথ তাই মিলিয়ে দিলেন অলকানন্দা, বেশ শ্রুতিমধুর। অলকানন্দার অবশ্য একটা সুন্দর মানে আছে, স্বর্গের নদী।

অমলতাস

বৈজ্ঞানিক নাম: Cassia fistula

গ্রামের পথের দুধারে ফুটে থাকে। বসন্তের শেষ দিকে তার আবির্ভাব হয়। উঁচু উঁচু শাখা থেকে ঝাড়বাতির মতো ঝুলে পড়ে, বাড়িয়ে দিয়ে হলদে সোনালি রঙের ফুল। এই গাছটির উৎপত্তি আমাদের উপমহাদেশে।

স্থানীয় নাম সোনালু বা বাদরলাঠি। হিন্দি নামে অম্বলতস। শান্তিনিকেতনে উদ্যান রচনার সময় এই গাছ রোপন করা হয়েছিল। রবিঠাকুর হিন্দি নাম থেকে নাম দিলেন অমলতাস।

নীলমণি লতা

বৈজ্ঞানিক নাম: Petria volubilus

রবীন্দ্রনাথের বন্ধু প্রবর উইলিয়াম পিয়ার্সন, কিন্তু ফিরিঙ্গি কোনো ভাব নেই তার, বেশভূষায়, আচরণে পুরোদস্তুর বাঙালি। তিনি এবং রবীন্দ্রনাথ দুজনেই তখন শান্তিনিকেতনে। সেখানকার উত্তরায়নের আঙিনায় কোণার্ক ভবনের উঠানে পিয়ার্সন পুতলেন এক নতুন ধরনেরলতার চারা। তিনি ওটি আনিয়েছিলেন আর্জেন্টিনা হতে। যার নাকি ইংরেজি নাম ব্লু বার্ড ভাইন।

কিছু দিন বাদেই সেই লতানো গাছটি নীলচে নীলচে ফুলের শাখা মেলে ধরলো। যেন গাছে অনেকগুলো নীল রঙের মণি ফুটেছে। নীল এমনিতেই তার প্রিয় রং। কিন্ত রবি বাবুর ইংরেজি নাম পছন্দ না। তিনি তাই নীলাভ শোভায় আকৃষ্ট হয়ে নতুন নাম দিলেন নীলমণি লতা।তারপরে তার কলমে বের হলো -

'তুমি সুদূরের দূতী, নূতন এসেছ নীলমণি, স্বচ্ছ নীলাম্বরসম নির্মল তোমার কণ্ঠধ্বনি।'

মধুমঞ্জরি

বৈজ্ঞানিক নাম: Quisqualis indica

'আমার দুয়ারে এসেছিল নাম ভুলি

পাতা-ঝলমল অঙ্কুরখানি তুলি

মোর আঁখিপানে চেয়েছিল দুলি দুলি

করুণ প্রশ্নরতা।

তার পরে কবে দাঁড়াল যেদিন ভোরে

ফুলে ফুলে তার পরিচয়লিপি ধরে

নাম দিয়ে আমি নিলাম আপন করে

মধুমঞ্জরিলতা।'

ফুলটি এমন কিছু অপ্রতুল নয়। প্রায়শই চোখে পড়ে, বারান্দা গলিয়ে বিকশিত হয়েছে কিংবা বাড়ির দেয়াল আঁকড়ে উর্ধ্বমুখী হয়ে উঠছে।সাদা আর গোলাপি রঙের যুগলবন্দী। লোকে ফুলেদের নামে যেই ভুলটা সবচেয়ে বেশি করে, সেটি হলো এই মধুমঞ্জরিকে মধুমালতি বা মাধবীলতা বলে ডাকা। আদতে ফুলগুলি পুরো ভিন্ন।

যাই হোক, মধুমঞ্জরি নামটা রবি ঠাকুরের দেয়া। দক্ষিণ - পূর্ব এশিয়ার জন্ম নেয়া ফুলটিকে নিয়ে বনবাণীতে কবি লিখেছেন -

'এ লতার কোনো-একটা বিদেশী নাম নিশ্চয় আছে - জানি নে, জানার দরকারও নেই।আমাদের দেশের মন্দিরে এই লতার ফুলের ব্যবহার চলে না, কিন্তু মন্দিরের বাহিরে যে দেবতা মুক্তস্বরূপে আছেন তাঁর প্রচুর প্রসন্নতা এর মধ্যে বিকশিত।কাব্যসরস্বতী কোনো মন্দিরের বন্দিনী দেবতা নন, তাঁর ব্যবহারে এই ফুলকে লাগাব ঠিক করেছি, তাই নতুন করে নাম দিতে হল।রূপে রসে এর মধ্যে বিদেশী কিছুই নেই, এদেশের হাওয়ায় মাটিতে এর একটুও বিতৃষ্ণা দেখা যায় না, তাই দিশী নামে একে আপন করে নিলেম।'

তারাঝরা

বৈজ্ঞানিক নাম: Clematis gourian

লতানো একটি গাছ জুড়ে তারার মতো ফুল। তার সুগন্ধ ছড়িয়ে চারপাশ ম ম করে। যারা কম বেশি বাগান করেন, ক্লেমাটিস নামের এই ফুলটিকে চেনেন আরোমেটিক জুঁই নামে।

নামে জুঁই হলেও ফুলটি মোটেই কিন্তু জুঁই নয়। লতায় লতায় ঢেউ খেলিয়ে গুচ্ছ ভরে যেন নেমে আসে।দেখে মনে হয় তারা ঝরে যাচ্ছে। তাই রবি ঠাকুর তার সম্ভাষণ কবিতায় এর নাম দিয়ে দিলেন তারাঝরা।

'যখন ডাকব তোমাকে ঘরে

সে হবে যেন আবাহনী।

সামনেই লতা ভরেছে সাদাফুলে--

বিলিতি নাম, মনে থাকে না--

নাম দিয়েছি তারাঝরা;

রাতের বেলায় গন্ধ তার

ফুলবাগানের প্রলাপের মতো।

এবার সে ফুটেছে অকালে,

সবুর সয় নি শীত ফুরোবার।

এনেছি তার একটি গুচ্ছ,

তারও একটি সই থাকবে আমার নিবেদনে।'

- সম্ভাষণ

অগ্নিশিখা

বৈজ্ঞানিক নাম: Gloriosa superba

পূর্ব মেদিনীপুরের তেলেগু শবররা মাথায় বাঁধা লালফেট্টিতেএকটা লাল শিখার মতো ফুল গুঁজতো। তারা ফুলটাকে বলতো 'কাকমারা ফুল'। আমাদের দেশে ভেষজ চিকিৎসায় ব্যবহৃত ফুলটি উলটচন্ডাল নামে পরিচিত। রবীন্দ্রনাথের ফুলটি দেখে খুব ভালো লাগে।

সাহিত্যিকরা চান ভাষা সুন্দর করতে। তাই কিছু কিছু তিতকুড়ি নাম তাদের কানে বিষ ঠেকে। তাই রবি ঠাকুর সেই কাকমারা ফুলকে একখানা সুন্দর নাম দিয়ে দিলেন । শিখার মতো জ্বলো জ্বলো - অগ্নিশিখা। এই ফুলটি কিন্তু জিম্বাবুয়ের জাতীয় ফুল!

উদয়পদ্ম

বৈজ্ঞানিক নাম: Magnolia grandiflora

ম্যাগনোলিয়া গোত্রের ফুল হিমচাঁপা। একেকটা ডালের মাথায় মাথায় পদ্মের মতো পাপড়ি ছড়িয়ে দেয়। দুগ্ধফেননিভ পাপড়ি, তার মাঝে উঁকি দেয় স্বর্ণ রঙা পরাগ। দেখতে যেমন মনোরম, তেমনি গন্ধ সুমিষ্ট। এটুকু বলেই হয়ত, সাধারণের ফুলটিকে নিরক্ষণ শেষ হয়ে যেত। কিন্তু রবি ঠাকুর তো, তাই সব গভীরে উপলব্ধি হওয়া চাই। তিনি দেখে বললেন, ডালের ঠিক আগায় সূর্যের মতো এর উদয়, তাই এটি হবে উদয়পদ্ম।

এই ফুলটিও কবিগুরুর বেশ পছন্দের। এই গ্রীষ্মকালই উদয়পদ্মের জেগে ওঠার উপযুক্ত সময়।

এমনি করে রবীন্দ্রনাথ কাঠগোলাপের নাম দিয়েছিলেন গুলঞ্চ, আকাশমণির ফুলকে নাম দিয়েছিলেন সোনাঝুরি, মাদারকে পারিজাত । আরো কিছু বনফুলকে ডেকেছেন বনজোৎস্না, বনপুলক, পলক জুঁই, হিমঝুরির মতো হৃদয়হরা নামে। সাঁওতালিদের প্রিয় একটি ফুলের নাম রেখেছিলেন লাঙল ফুল। শান্তিনিকেতন প্রাঙ্গনে বসন্তকে আহ্বান জানানো সোনা রঙা ফুলের নামকরণ করেছেন বাসন্তী লতা।

রবীন্দ্রনাথকে পেয়ে মানবমন যেমন ধন্য, তেমনি প্রকৃতিও ধন্য। কিন্তু মানুষের মধ্যে আজ সেই প্রকৃতি প্রেম হারিয়ে যাচ্ছে। কত ফুল, লতা, গুল্ম ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বাংলার কোল জুড়ে। কিন্তু আমাদের কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই সেদিকে, প্রায়শই আমরা চিনি না সেসব। রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতিকে ভাবনা হৃদয়ে লালন করতে পারলে আমাদের মাঝে পরিবেশ রক্ষার চেতনা জাগরুক হবে।

সুস্মিতা রায় বর্তমানে শহীদ তাজউদ্দীন আহমেদ মেডিকেল কলেজে ৩য় বর্ষে পড়াশোনা করছেন।

susmi9897@gmail.com



Share if you like