গত কয়েক দশকে ক্রমবর্ধমান চাহিদার যোগান দিয়ে আসা ব্রিটিশ যুগের উপকথার বাহক, দেশের ১৭০ বছর বয়সী চা শিল্প বর্তমানে একটি নতুন ও বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ে নেমেছে, যার প্রধান উদ্দেশ্য হলো, বাইরের দেশে রপ্তানি করার জন্য উদ্বৃত্ত চা উৎপাদন করা।
দেশের দক্ষিণ প্রান্তের অনাবাদী জমিতে কৃষি শিল্পের সম্প্রসারণ করা হয়েছে, যা এর জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। বিভিন্ন সূত্র হতে জানা যায় যে, স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে বিদেশে রপ্তানি করার জন্য অতিরিক্ত চা চাষের জন্য দেশের দক্ষিণ দিকের কিছু জায়গা নির্বাচন করা হয়েছে, যদিও এ অঞ্চল চা চাষের জন্য পরিচিত নয়। জাতীয় উৎপাদনের ১০ শতাংশ আসে এই অঞ্চল থেকে।
বর্ধিত স্থানীয় চাহিদা শিল্পের প্রবৃদ্ধি বাড়াতে যথেষ্ট অবদান রাখলেও বিশেষজ্ঞদের মতে এর রপ্তানি সম্ভাবনা বৃদ্ধি করতে সরকারি ও বেসরকারি উভয়ের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
২০১৯ সালে দেশের মোট চা উৎপাদন ও ভোগের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৯৬০ লক্ষ ৭০ হাজার কেজি ও ৯৫২ লক্ষ কেজি। অর্থাৎ, রপ্তানির জন্য উদ্বৃত্ত ছিল মাত্র ৬ লক্ষ কেজি।
দুই দশক আগে, ২০০১ সালে চায়ের বার্ষিক চাহিদার পরিমাণ ছিল মাত্র ৩৬৫ লক্ষ ৫০ হাজার কেজি, যেখানে সে বছর চা উৎপাদিত হয়েছিল ৫৩১ লক্ষ ৫০ হাজার কেজি। ফলে, তৎকালীন রপ্তানিকৃত চায়ের পরিমাণ ছিল ১৩১ লক্ষ কেজি।
গত বছর বাংলাদেশে ৮৬৩ লক্ষ ৯০ হাজার কেজি চা উৎপাদিত হয় এবং কোভিড অতিমারীর কারণে স্থানীয় চাহিদা হ্রাস পাওয়ায় তন্মধ্যে রপ্তানি করা হয় ২১ লক্ষ ৭০ হাজার কেজি।
উক্ত শিল্পে জড়িত কর্মকর্তারা অনুমান করছেন যে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসছে এবং সবাই ঘর থেকে বেরিয়ে আগের মতো জীবনযাপন শুরু করছে, যার ফলে চায়ের চাহিদা আবার বেড়ে যাবে এবং রপ্তানির জন্য উদ্বৃত্তের পরিমাণ কমে যাবে।
আসন্ন পরিস্থিতিতে উৎপাদন বাড়ানোর জন্য উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা আবশ্যক বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞেরা।
বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিটিউটের (বিটিআরআই) বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন যে, গত দশকে দেশের চা শিল্পে উৎপাদনশীলতা বেড়েছে বিপুলভাবে।
বিটিআরআই পরিচালক ডক্টর মোহাম্মদ আলী ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসকে জানান, বর্তমানে প্রতি হেক্টরে উৎপাদনশীলতার অনুপাত ২,৫০০ কেজি, যা ছয়-সাত বছর আগে ১,১০০ কেজি ছিল।
আমদানির জন্য উদ্বৃত্তের পরিমাণ বাড়াতে নতুন প্রজাতির চা চাষ ও আধুনিক উৎপাদন পদ্ধতি অবলম্বন করার সুপারিশ করেছেন তারা।
বিটিআরআই-এর জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসকে জানিয়েছেন, “নতুন প্রজাতির চা চাষের উদ্যোগ নেওয়ার মাধ্যমে কার্যকরীভাবে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো যাবে”।
তিনি আরো জানিয়েছেন যে, বিটিআরআই-এর ক্লোনকৃত বিটি-২২/২৩-প্রজাতির গাছ দিয়ে প্রতি হেক্টর জমিতে ৩,০০০ কেজির বেশি চা উৎপাদন করা যাবে। “বিটিএস-৫ নামে একই বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন আরেকটি বীজ উৎপাদন করেছি আমরা”।
কিন্তু শিল্পে জড়িত অন্যরা বলেন যে, নতুন প্রজাতি দিয়ে পুরনো প্রজাতি প্রতিস্থাপন করার কাজটি যথেষ্ট কঠিন।
চা বাগানের একজন মালী জানান, নতুন বাগানের জন্য এটা তুলনামূলক সহজ। কিন্তু পরিপক্ব হয়ে উঠতে গাছগুলোর ৫ বছর সময় লাগে। তাই পুরনো গাছগুলোকে নির্মূল করে নতুন গাছ রোপণ করা সবসময় সম্ভবপর হয়ে ওঠে না।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ চা বোর্ডের সভাপতি মেজর-জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম বলেন যে, সরকার চা শিল্পে অনেকভাবে সহায়তা দিয়ে আসছে, যার প্রমাণ গত দশকে চা শিল্পের অগ্রগতিতে স্পষ্ট।
সম্প্রসারণ পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি বলেন, “আমরা দেশের বিভিন্ন জায়গায় নতুন চা বাগান স্থাপন করতে সহযোগিতা করছি, যেখানে আগে কখনো চা চাষ করা হয়নি। পার্বত্য চট্টগ্রাম ও দক্ষিণাঞ্চলের কিছু জেলায় চা বাগান করার লক্ষ্যে আমরা কিছু প্রকল্প হাতে নিয়েছি”।
জনাব ইসলাম জানান, “আমাদের এখনো কিছু চলমান প্রকল্প আছে, যেগুলোতে আমরা ছোট চা বাগানগুলোকে সম্প্রসারণ করার জন্য কৃষকদের উৎসাহ দিচ্ছি ও ব্যবস্থাপনার কাজে সহায়তা করছি। এই প্রকল্পের অধীনে আমরা ক্ষুদ্র চা চাষীদের প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করে থাকি। এর পাশাপাশি আমরা তাদের ও প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজে নিয়োজিত সম্পাদকদের কর্মক্ষমতা গড়ে তুলতে ও দক্ষতা বিকাশের জন্য প্রশিক্ষণ দিচ্ছি"।
এই পরিকল্পনা মোতাবেক, প্রকল্পের স্থানে চা প্রক্রিয়াজাত করার কারখানাও নির্মাণ করা হবে।
তিনি অত্যন্ত আশাবাদ পোষণ করেন যে, ২০১৭ সালে বোর্ডের তৈরিকৃত পরিকল্পনার সাথে তাল মিলিয়ে ২০২৫ সালের মধ্যে ১,৪০০ লক্ষ কেজি চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা সম্ভব হবে।
আগ্রহজনকভাবে চা উৎপাদনকারী দেশগুলোতে চায়ের চাহিদা বাড়ছে, যা রপ্তানির উদ্বৃত্ত পরিমাণে ঘাটতি তৈরি করে।
চীন ২০১৮ সালে ২৬ লক্ষ ১০ হাজার টন চা উৎপাদন করে, যা এক দশকে বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছিল এবং এটা বৈশ্বিক উৎপাদনের ৪৪ শতাংশ। কিন্তু রপ্তানির পরিমাণ কমে ১৪ শতাংশে নেমে আসে, যা ২০০৯ সালে ছিল ২২ শতাংশ।
সাম্প্রতিক সময়ে চা উৎপাদনের বিশাল অগ্রগতির বড় একটা কারণ দক্ষিণাঞ্চলের চা চাষীরা।
মজার ব্যাপার হলো, ২০০০ সালের আগে কেউ এই অঞ্চলে চা বাগান করার কথা ভাবতেও পারত না। তবে সেসব দিন এখন বিগত। বর্তমানে পঞ্চগড়, নীলফামারী, দিনাজপুর ও লালমনিরহাটের চা বাগানগুলো ১০০ লক্ষ কেজি চা উৎপাদন করে, যা সমগ্র দেশের উৎপাদনের ১০ শতাংশ।
২০০০ সাল থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল যেমন পঞ্চগড়, লালমনিরহাট, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী, দিনাজপুর এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবানেও চা চাষের কার্যক্রম চালু হয়েছে।
দেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭১ সাল থেকেই দেশের চা শিল্প ধারাবাহিকভাবে প্রবৃদ্ধি অর্জন করে আসছে।
বাংলাদেশ চা অ্যাসোসিয়েশনের হিসেব অনুযায়ী, এই শিল্পে ১৬৬টি চা বাগানে প্রত্যক্ষভাবে ১ লাখেরও বেশি কর্মী নিয়োজিত।
দেশের চা শিল্প প্রত্যক্ষ শ্রমিক ও পরোক্ষভাবে চা কেনাবেচা, গুদামজাকরণ ও বিবিধ কাজে জড়িত ৫ লক্ষ মানুষের জীবিকা সন্ধানের উপায়।
তবে অনেক মালী অভিযোগ করেছেন যে, সরকার তাদের জন্য প্রণোদনা প্যাকেজের ব্যবস্থা করার ঘোষণা দিলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার জন্য তারা এখনো সেই সুবিধাগুলো পাননি।
এ বিষয়ে আশা ব্যক্ত করেন তাদেরই একজন, "আমি এখনো অপেক্ষা করছি"।
mirmostafiz@yahoo.com
