Loading...

রঙ, তুলির চিত্রকর্ম যখন হয়ে উঠে প্রতিবাদের ভাষা

| Updated: March 29, 2022 11:11:39


পাবলো পিকাসোর গুয়ের্নিকা। ছবি: আর্টসি পাবলো পিকাসোর গুয়ের্নিকা। ছবি: আর্টসি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে 'সুবোধ' চিত্রকর্ম, ছয় শতাব্দী আগে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির তুলির ছোঁয়ায় ইউরোপে নবজাগরণ আবার মুক্তিযুদ্ধের সময় দাঁত বের করা ইয়াহিয়ার পোস্টার... এই লেখাটি সেসব চিত্রকর্ম নিয়ে যেখানে রঙ তুলিতে আঁকা হয়েছে প্রতিবাদের ছবি।

ক্যানভাসে যখন ইউরোপের রেঁনেসা 

এই যুগ ছিল প্রতিবাদের। তবে প্রতিবাদ গতানুগতিক শাসকের বিরুদ্ধে নয়, বরং সমাজে প্রতিষ্ঠিত নিয়মগুলো ভেঙে দেয়ার, কোনো কোনো ক্ষেত্রে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার।

তাই এই যুগটি কোনো নির্দিষ্ট ঘটনাকে অবলম্বন করে প্রতিবাদস্বরূপ চিত্রকর্মের জন্যে বিখ্যাত নয়। বরং এই যুগে পুরো বিশ্ব পেয়েছে শক্তিমান কিছু শিল্পীর এবং তাদের শিল্পকর্মের। 

মাইকেলএঞ্জেলোর ‘দ্য লাস্ট জাজমেন্ট’। ছবি: সিটি ওয়ান্ডার্স

এদের মধ্যে অন্যতম হলো মাইকেলএঞ্জেলোর 'দ্য লাস্ট জাজমেন্ট' চিত্রকর্মটি। ওল্ড টেস্টামেন্ট থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এই চিত্রকর্মে মাইকেলএঞ্জেলো আঁকেন যিশুখ্রিস্টের ৩০০টির মতো চরিত্র। 

ছবিটি লক্ষ্য করলে দেখা যায় যিশুখ্রিস্টের অবস্থান চিত্রকর্মের মাঝখানে তার আশেপাশের রয়েছে অনুসারীরা এবং নিচে অবস্থান করছে নরকের যাত্রীরা। ৫০০০ ফুট দীর্ঘ চিত্রকর্মটি সরাসরি প্রতিবাদ না করলেও, গোটা সমাজব্যবস্থার রূপ এখানে দেখতে পাওয়া যায়। 

ডাডাইস্টদের বিভিন্ন রঙ 

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে সুইজারল্যান্ডের জুরিখ শহরে একত্রিত হয় ভিন্ন মতাদর্শের কিছু শিল্পী। তাদের কাজ ছিল এমন কিছু শিল্পকর্ম তৈরি করা যার কাজ সমসাময়িক প্রতিষ্ঠিত তথাকথিত ‘ভালো’ শিল্পকর্মকে প্রশ্নবিদ্ধ করা।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালে এদের আবির্ভাব। তাদের চিত্রকর্ম এতটাই প্রভাবশালী ছিল যে পরবর্তীতে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে এই ঘরানার বিভিন্ন শিল্পকর্মের তৈরি হতে থাকে। 

ডাডা শিল্পীদের মধ্যে রাউল হাউজম্যান খুব জনপ্রিয়। তার শিল্পকর্মে স্থান পায় সমাজের সমালোচনা। তার সতীর্থদের মধ্যে জন হার্টফেল্ড ও জর্জ গ্রুশের সাথে মিলে তৈরি করেন অসাধারণ কিছু শিল্পকর্ম।

ডাডা শিল্পী রাউল হাউজম্যানের বিখ্যাত চিত্র ‘আর্ট ক্রিটিক’। ছবি: টেইট.অর্গ

আনা হোচ আরেকজন ডাডা শিল্পী যিনি অনেকগুলো স্থির চিত্র কোলাজ করে প্রতিবাদের নতুন ভাষা তৈরি করেছিলেন। তাকে ‘ফটো মনটাজ’-এর সূচনাকারী হিসেবে ধরা হয়। 

টকাট উইথ দ্য কিচেন নাইফ, ডাডা থ্রু দ্য লাস্ট ওয়েইমার বিয়ারট - বিশ্বযুদ্ধের পরে জার্মানির ওয়েইমার শহরের জেন্ডার অসঙ্গতি নিয়ে বৃহত্তর এই ফটো মনটাজ তৈরি করেন তিনি। তার এই শিল্পকর্মের মাধ্যমে জেন্ডার অসঙ্গতি নিয়ে আন্দোলন নতুন রূপ পায়।

বিশ্বযুদ্ধের প্রতিবাদে

যুদ্ধ কখনো মহিমান্বিত করার মতো কিছু নয়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা গোটা পৃথিবীকে তা নতুন করে ভাবাতে শুরু করে। 'যুদ্ধহীন বিশ্ব'- এই লক্ষ্যে আন্দোলনে বিশেষ ভূমিকা রাখে তৎকালীন এই চিত্রকর্মগুলো।

এসব ছবিতে ফুটে উঠেছে যুদ্ধ বিরোধী বক্তব্য যা শান্তিপূর্ণ পৃথিবী গড়ে তোলার আন্দোলনকে রং-তুলিতে ছড়িয়ে দেয়। 

স্প্যানিশ শিল্পী পাবলো পিকাসোর ‘গুয়ের্নিকা’, পিটার পল রুবেনের 'কনসিকুয়েন্সের অফ ওয়ার', সালভাদোর ডালির 'দ্য ফেইস অফ ওয়ার' অন্যতম। 

এই ছবিগুলোতে যুদ্ধ বিরোধী আন্দোলনের বক্তব্য শক্তিশালী ভাবে উপস্থাপন করা হয়। একই সাথে নান্দনিক মাত্রাও বজায় রাখা হয়েছে চিত্রকর্মগুলোতে।

বর্ণবাদের বিরুদ্ধে রঙ-তুলি 

ড্যানিয়েল জোসেফ নিজের নাম 'ডিনায়াল' লিখতে পছন্দ করেন। তিনি এই নামেই গ্রাফিতি (দেয়ালচিত্র) করেন ‘সরি ইজ নট এনাফ’। 

এই গ্রাফিতি তিনি তৈরি করেন সেপ্টেম্বর ২০২০ বর্ণবাদবিরোধী বার্তা হিসেবে। তার এই শিল্পকর্ম স্থান পায় ইতিহাসের সেরা কাজগুলোর মধ্যে।

ছবি: আর্টসি

গ্রাফিতিটি প্রকাশিত হওয়ার পর নেটিজেনদের আলোড়ন সৃষ্টি হয়। 

বর্ণবাদ বিরোধী চিত্রকর্মের আরেকটি নজির পাওয়া যায় ‘এপার্থিড’ (দক্ষিণ আফ্রিকার বৈষম্যমূলক নীতি)। 

সোলোমন ম্যাঙ্ঘালু ১৯৮২ সালে 'ইউ টাচ আ উইম্যান, ইউ স্ট্রাক আ রক' নামে প্রতিবাদী পোস্টারটি আঁকেন। ১৯৭৯ সালে ১৯ বছর বয়েসী এক মেয়েকে হত্যার প্রতিবাদতস্বরূপ তিনি এই শিল্পকর্মটি এঁকেছিলেন। 

তার এই পোস্টারটি এতোটাই প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিল যে বর্ণবাদী শাসক প্রতিটি রাস্তায় অভিযান চালিয়ে পোস্টারটি অপসারণ করেছিল। 

পরবর্তী জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগের পাশাপাশি শিল্পকর্মের যৌথ অবদানে এক দশক পরেই পরাজিত হয় দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শাসকগোষ্ঠী। 

আমাদের একাত্তরে 

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময়ও প্রতিবাদী চিত্রকর্মের ব্যবহার দেখা যায়। গ্রাফিতি, পোস্টার ও লিফলেট ছেয়েছিল প্রতিবাদী ভাষা ও রাজনৈতিক বক্তব্যে।

বহির্বিশ্বে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জনমত গঠন করাও ছিল এই চিত্রকর্মগুলোর লক্ষ। তাই এই কাজের দায়িত্বে পরে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও প্রচার দপ্তরের হাতে। শিল্পী কামরুল হাসান ছিলেন প্রচার বিভাগের দায়িত্বে। 

শিল্পী কামরুল হাসান ছাড়াও নিতুন কুন্ডু, দেবদাস চক্রবর্তী, নাসির বিশ্বাস ও বীরেন সোমসহ আরো অনেকে দিলেই এই কাজে।

তর্জনি উঁচিয়ে বঙ্গবন্ধুর, ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম' চিত্রকর্মটি আঁকেন বীরেন সোম। 

মুক্তিযুদ্ধে পাক হানাদার বাহিনীর প্রতি ঘৃনা ও জনমত তৈরির জন্য কামরুল হাসান একটি পরিকল্পনা করেন। তিনি সিদ্ধান্ত নেন দানবীয় মুখাবয়বে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর কার্টুন আঁকবেন।

সে কার্টুন থেকে তৈরি হল বিখ্যাত পোস্টার যেখানে ইয়াহিয়াকে দেখানো হলো দাঁত বের করা, বড় বড় চোখের রক্ত চোষা দানবের মতো। পোস্টারটির নাম দেয়া হয় ‘এই জানোয়ারদের হত্যা করতে হবে।'

এরকম অসংখ্য চিত্রকর্ম করা হয় একাত্তরের সময় যা মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতাকামী মানুষদের দিয়েছিল আনন্দ এবং ভরশা। 

শুধু একাত্তরেই নয় পৃথিবীর ইতিহাসের যখনই প্রতিবাদের সময় এসেছে বুলেট ও বন্দুকের সাথে একই পথে হেঁটেছে শিল্পীরা। তাদের রঙ-তুলির আঁচড়ে এসেছে পরিবর্তনের ডাক যার ক্ষেত্র ছিল পুরো ক্যানভাস জুড়ে এবং রঙ ছিল দ্রোহের। 

মোঃ ইমরান বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করছেন।

imran.tweets@gmail.com

Share if you like

Filter By Topic