Loading...
The Financial Express

যে বই জাগিয়ে তোলে

| Updated: March 13, 2021 10:42:39


যে বই জাগিয়ে তোলে

চোখের সামনে বই খুলে বসলেই যেন আশপাশের চেনা জগৎ থেকে ছুটি পাওয়া যায় কিছুক্ষণের জন্য। সবার বেলায় যে ঠিক এমনটাই হবে, তার কোনো লিখিত প্রমাণ দেখানো একটু মুশকিলই বটে। কিন্তু বইয়ের সঙ্গে সখ্য গড়ে ঠকেছেন, এমন নজির পাওয়া দায়। বইয়ের পাতার সঙ্গে সখ্য যাঁদের, তাঁরা এগিয়ে থাকেন বুদ্ধিবৃত্তিক দিক দিয়েও। তবে বই পড়া শুধু জ্ঞানার্জনের জন্যই নয়, অস্তিত্বের উপলব্ধির সঙ্গে একাত্মতাও এর অনেক সুফলের একটি। সেভাবেই জীবনে চলার পথে কঠিন সময় মোকাবিলার অনুপ্রেরণাও জোগাতে পারে বই।

অন্ধকার দিনের দিশেহারা মুহূর্তগুলোয় মলাট উল্টে ছাপার পাতার আশা জাগানো এসব বই লিখেছেন বিশ্বসেরা খ্যাতিমান লেখকেরা। তাঁদের চমৎকার লেখনীতে তুলে ধরেছেন প্রেরণার বাণী। কখনো গল্প, কখনো উপন্যাস, আবার কখনো প্রবন্ধের আকর্ষণীয় ভঙ্গিমায় লিখেছেন অনুপ্রেরণা জোগানো এসব বই।

 

দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি

বিশ্বনন্দিত লেখক আর্নেস্ট হেমিংওয়ের লেখা এই বইয়ের ভেতর ডুব দিলে বুড়ো সান্টিয়াগো ও মানোলিনের সঙ্গে পাঠকও হারিয়ে যাবেন জীবনের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির মাঝের গভীর জীবনবোধে। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্রে আছে কিউবান বুড়ো জেলে সান্তিয়াগো প্রায় ৮৪ দিন যার জালে আটকায়নি কোনো মাছ। তাঁর শিষ্য ম্যানোলিন পরিবারের চরম বিরোধিতা সত্ত্বেও সাহায্য করে চলে তার গুরুকে। গুরু সান্তিয়াগোর জীবনবোধ তাকে তাঁর প্রতি আরও শ্রদ্ধাশীল করে তোলে। তাঁর জীবনের গল্পে ম্যানোলিন খুঁজে পায় জীবনের শিক্ষা।

একদিন ভাগ্য ফেরাতে সান্তিয়াগো নৌকা ভাসায় গালফ প্রবাহে। তার বড়শিতে গাঁথে এক অতিকায় মার্লিন মাছ। জীবনের সঞ্চিত সব শিক্ষা নিয়ে সান্তিয়াগো যুদ্ধ করে মার্লিনটিকে বশে আনতে। কিন্তু এর মাঝেও মাছটির বেঁচে থাকার সংগ্রাম, অবিরল প্রতিরোধ ও হার না মানার বৈশিষ্ট্যে নিজের সঙ্গেই মিল খুঁজে পায় সান্তিয়াগো। নিজের পরিচয়ে অটুট থাকা, নিজের অস্তিত্বকে প্রাণপণে লালন করা-এসব বিষয় গভীর ছাপ ফেলে তার মনে। হেমিংওয়ে তাঁর অপূর্ব লেখনীতে সান্তিয়াগোর হাতে দেখিয়েছেন মানুষের মনোবলের দৃঢ়তা, যেকোনো সংগ্রামে মানবমনের গড়ে তোলা প্রতিরোধের শক্ত দেয়ালের নমুনা।

 

দ্য আলকেমিস্ট

‘যখন তুমি মনেপ্রাণে কিছু চাইবে, তখন পুরো মহাবিশ্ব তোমাকে তা পেতে সাহায্য করবে’ – পাওলো কোয়েলহো ব্রাজিলিয়ান লেখক পাওলো কোয়েলহোর ‘দ্য আলকেমিস্ট’ উপন্যাসটি প্রকাশের পর সারা পৃথিবীতে সাড়া পড়ে যায়। সে বইয়েরই বিখ্যাত একটি বাক্য এটি। মাত্র দু সপ্তাহে কোয়েলহো বইটি লিখে শেষ করেন। তাঁর মতে, বইটির বাক্যগুলো তাঁর আত্মায় লিখিত ছিল। অসাধারণ সাবলীলতায় লেখা এ বই যে কতভাবে অনুপ্রেরণার কথা শোনায়, তার ইয়ত্তা নেই। আন্দালুসিয়ান এক মেষপালক সান্তিয়াগো বারবার ফিরে আসা স্বপ্নের মানে খুঁজতে এক জিপসির কাছে গেলে জিপসি এক গুপ্তধনের ইঙ্গিত দেয় তাকে।

সে গুপ্তধনের সন্ধানে ও আলকেমিস্টের সাক্ষাতের আশায় স্পেন থেকে মিসরের পথে যাত্রা শুরু করে। এই অনন্য যাত্রার প্রতিটি ধাপে তার জীবনবোধ পরিবর্তন হতে থাকে, বাড়তে থাকে তার জানার ও বোঝার পরিধি। আলকেমিস্টের খোঁজে তার এ যাত্রা তাকে নিয়ে যায় জীবনের সবচেয়ে গভীর কিছু উপলব্ধির পানে, যেখানে স্বপ্নের সীমানা ছাড়িয়ে যায় বাস্তবতার হিসেবকে। স্বপ্ন দেখার মাঝে জীবনকে বাঁচিয়ে রাখার, অনুভব করার ইচ্ছে কীভাবে বেঁচে থাকে, ‘দ্য আলকেমিস্ট’ তার প্রতিটি পাতায় সাজিয়েছে সেই গল্প।

 

ইট দ্যাট ফ্রগ!

নন-ফিকশন বইয়ের জগতের একজন তুমুল পাঠকনন্দিত লেখক ব্রায়ান ট্রেসি। আকর্ষণীয় নামের এই বইটির রচয়িতা তিনি। মার্ক টোয়েনের বিখ্যাত উক্তি ‘যদি তুমি দিনের শুরুতেই সবচেয়ে বড় ব্যাঙটি খেয়ে ফেলতে পারো, তাহলে দিনের সবচেয়ে কঠিন কাজটিই তুমি শেষ করে ফেলেছ!’

কোনো কাজে দীর্ঘসূত্রতাকে পরিহার করে অল্প সময়ে যত বেশি সম্ভব কাজ শেষ করা জরুরি; না হলে তা পরে আরও জটিল বোঝার মতো হয়ে যেতে পারে। সাবলীল ভাষায় লেখা চমৎকার বইটিকে কোনো খটমটে প্রবন্ধগ্রন্থ মনেই হবে না পাঠকের।

ব্রায়ান ট্রেসি তাঁর বইয়ে ২১টি উপায়ে দীর্ঘসূত্রতা পরিহারের উপায় বাতলেছেন, তবে খুবই আকর্ষণীয়ভাবে। দিনের শুরুতে সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু কঠিন কাজটি করা দিয়ে শুরু করে পুরো দিনের করণীয় কাজের মনছবি আঁকা এবং তা করার জন্য কাজটি শুরু করা – এই মূল তিনটি বিষয়ের ওপর আলোকপাত করেছেন তিনি। অল্প সময়ে বেশি কাজ করে কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি ও একই সঙ্গে সময় পরিকল্পনায় দক্ষতা অর্জন করার জন্যও বইটি বেশ কাজের। কাজ শুরু করার কঠিন কাজটিই সহজ করে তুলে কাজের প্রতি মনোযোগ বাড়াতে অনুপ্রেরণা জোগায় বইটি।

 

দ্য ডায়েরি অব আ ইয়াং গার্ল

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর সময় কিশোরী আনা ফ্রাঙ্কের বয়স ১৩। ইহুদি আনা ও তার পরিবারকে ছাড়তে হয় তাদের ঘরবাড়ি, কারণ হিটলার তখন ইহুদি নিধনে বদ্ধপরিকর। সপরিবারে আনারা চলে যায় এক অফিস বাড়ির পেছনে গোপন আস্তানায়। সঙ্গে রইল আরেকটি পরিবার ও কয়েকজন বন্ধু। তারপর দু’ বছর দু’ মাস কাটে আত্মগোপনে, এই সময়ের দিনলিপিই আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি। ১৯৪৪ সালের আগস্টে গোপন আস্তানায় হানা দিয়ে গেস্টাপো ধরে নিয়ে যায় সেখানকার আট বাসিন্দাকে, যাদের মাঝে ছিল কিশোরী আনাও।

১৯৪৫ সালে মার্চে বন্দীশিবিরে অমানবিক নির্যাতন শেষে মারা যায় আনা। মৃত্যুর অন্ধকার থেকে ফেরত আসেন শুধু তার বাবা অটো ফ্রাঙ্ক, যিনি খুঁজে পান আনার ডায়েরিটি। সেই দিনলিপিই প্রকাশিত হয়েছে, অনূদিত হয়েছে পৃথিবীর প্রায় সমস্ত ভাষায়। এ বইয়ে খুঁজে পাওয়া যাবে কিশোরী আনাকে, বিস্ময়কর জীবনবোধে পূর্ণ আশ্চর্য গভীর এক কিশোরীকে। বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার মাঝেও বেঁচে থাকার প্রবল আশা ও স্বপ্নেভরা আনা দৈনন্দিন বর্ণনার পাশাপাশি অনায়াসে বলে গেছে দর্শন, ঈশ্বর, মানবচরিত্র, প্রেম-প্রকৃতি-জীবনবোধ নিয়ে। বলেছে সমকালীন ইতিহাস ও রাজনীতি নিয়ে, ইহুদিদের লাঞ্ছনা-যন্ত্রণা-সংগ্রাম নিয়ে। আনার লেখা এই ডায়েরির একটি বাক্য, ‘আমি দেখেছি – নিসর্গে, রোদের আলোয়, স্বাধীনতায়, নিজের মাঝে কিছু সৌন্দর্য থেকেই যায়, বেঁচে থাকতে এতটুকুও সহায়-সম্বল হতে পারে। যার সাহস আর বিশ্বাস আছে, সে কখনো দুঃখকষ্টে মারা পড়বে না।’

 

হু মুভড মাই চিজ?

গম্ভীর ধাঁচের লেখার বাইরে ‘হু মুভড মাই চিজ?’ পড়ে বেশ খোশমেজাজেই পরিবর্তনকে গ্রহণ করার উপায়গুলো জেনে নেওয়া যায়। বইটি বেশ আকর্ষণীয়ভাবে ব্যক্তি ও কর্মজীবনের ছোটখাটো থেকে বড় পরিবর্তনগুলোর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার কৌশল শেখায়। দুটো ইঁদুর ও দুটো খুদে মানুষের পরিবর্তনে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখানোর মাধ্যমে দর্শক সেই কৌশল। পরিবর্তন জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, কিন্তু সব পরিবর্তন মেনে নেওয়া সবার জন্য সহজ হয়ে ওঠে না। জটিল এই মানিয়ে নেওয়ার মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ও সে পরিবর্তনের প্রতি স্বতন্ত্র ব্যক্তিসত্তার প্রতিক্রিয়া খুব সহজে এই বইটিতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। পরিবর্তনকে উপলব্ধি করা থেকে শুরু করে ধাপে ধাপে তার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং জীবনকে কীভাবে আরও সহজ করা যেতে পারে, তা জানা যাবে মজার এই বইটি পড়লে।

 

লেখক তাহসীন নাওয়ার প্রাচী বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষে পড়াশোনা করছেন।

amipurbo@gmail.com

Share if you like

Filter By Topic