‘মিশন সম্পন্ন হয়েছে’ – বাক্যটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ কখনোই মুখ ফুটে বলেননি। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দুই মেয়াদের দায়িত্ব পালনের সময়ই দুঃস্বপ্নের মতো তাড়া করেছে এ বাক্যটি। ইরাকে প্রধান যুদ্ধ-মিশন সমাপ্ত বলে মার্কিন একটি বিমানবাহী রণতরি থেকে ঘোষণা করেন তিনি। ঘোষণার সময় বুশের পিছনে, অনেক উঁচুতে ‘মিশন অ্যাকমপ্লিশড’ বা ‘মিশনসম্পন্ন’লেখা বড় ব্যানারটি শোভা পাচ্ছিল। কিন্তু তাঁর সেই ঘোষণা এবং ব্যানারসহ ছবিটি ব্যাপকভাবে সমালোচিত মার্কিনিদের ব্যর্থ ইরাকনীতির প্রতীক হয়ে ওঠে। বুশের এই ঘোষণার পর ইরাকের যুদ্ধ থেমে যায়নি। বরং ব্যাপকভাবে রক্তপাত বেড়ে যায়। দুই পক্ষই ব্যাপক হতাহতের শিকার হয়।
এ বছর জুলাই মাসের বক্তব্যে এক প্রশ্নের উত্তরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন তাঁর সহযোগীদের বলেন যে আফগানিস্তানে তালেবান দখল অনিবার্য নয়। বহু মাস এমন কী বহু বছর তার এই উক্তি বুশের ‘মিশন সম্পন্ন’শব্দদ্বয়ের মতো বাইডেনকেও তাড়া করে ফিরবে। তবে এটাও বিশ্বাস করা খুব কঠিন যে আফগান সেনাবাহিনী বালুর প্রাসাদের মতো ঝুরঝুর করে পুরোই ভেঙে পড়বে – এটা কেউ কল্পনা করেছিল।
আফগানিস্তানের ঘটনা প্রবাহের দিকে যারা গভীর নজর রাখছিল তাদের মধ্যে অন্যতম ইসলামাবাদ। খোদ ইসলামাবাদের অনেকেই মনে করেছিলেন আফগান নিরাপত্তাবাহিনী তালেবানকে মোকাবেলা করতে এবং তাদের অগ্রযাত্রার গতিকে স্তিমিত করতে পারবে।আফগানবাহিনীর রণ-সক্ষমতা নিয়ে যাঁদের সংশয় ছিল( অনেক বেশি বাস্তবস্মত মূল্যায়ন) তাঁরাও জোর গলায় বলেছেন, কাবুলের পতন ঘটতে তিন থেকে ছয় মাসতো লাগবেই! আমাদের মধ্যে অনেকেই আফগান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে অতীতের রঙ লাগাচ্ছিলেন। ১৯৯৬ সালে কাবুল কব্জায় নেওয়ার পরও গোটা আফগানিস্তান সামাল দিতে তালেবানকে ল্যাজে-গোবরে অবস্থায় পড়তে হয়েছিল- কেউ কেউ সেকথাও তুলে ধরেন।আর সোভিয়েত বাহিনী হটে যাওয়ার পর আফগানিস্তানে নজিবুল্লাহ সরকারের কথাও বলেন কেউ কেউ। সে সময় এ সরকার টিকতে পেরেছিল মাত্র তিনটি বছর।
আফগান সেনা-প্রশিক্ষণের কার্যক্রমে প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ধারণা আগাগোড়াই অনুপস্থিত ছিল। তালেবানের বিজয়ধারা মাত্র কয়েকদিনে সম্পন্ন হওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। আর এক্ষেত্রে ইতিহাস কিন্তু সবসময়ই ভালো পথ-প্রদর্শক হতে পারে না।
আগামীতে কী ঘটবে সেদিকে উল্লেখযোগ্য নজর স্বাভাবিকভাবেই থাকবে। ১৯৯০-র দশকে তালেবানের যে শাসন দেখা গিয়েছিল তার সাথে নতুন প্রজন্মের তালেবান বা তালেবান ২.০ শাসনের কোনো তফাৎ থাকবে কি না তাও খতিয়ে দেখা হবে। এদিকে, আফগান নিরাপত্তা বাহিনীর অপ্রত্যাশিত এবং দ্রুত ‘প্রপাতধরণীতল’হওয়া দিস্তা দিস্তা কাগজ ব্যয়ে লেখালেখির এবং বহুভাষণের অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে!
আফগানিস্তানের ভেগে যাওয়া কর্মকর্তাদের আবাসগৃহ প্রাসাদোপম ও অট্টালিকাগুলোতে তালেবান যোদ্ধাদের ঘুরে বেড়ানো এবং আশেপাশে এলাকাগুলোতে আনন্দ প্রকাশের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম জুড়ে ঘুরছে। এসব ভিডিও আমাদেরকে আরব সমাজবিজ্ঞানী, দার্শনিক এবং ইতিহাসবেত্তা ইবনে খালদুনের তত্বের কথাই মনে করিয়ে দেয়। এর মূল কথা হলো বিলাস-ব্যসনে মাতোয়ারা একটি সমাজকে সহজেই ধুলোয় মিশিয় দিতে পারে ‘বেদুইন স্বভাবে অভ্যস্ত’ যোদ্ধা বা সেনারা।
কিন্তু কাহিনীর আরো বাকি আছে।
এক পর্যায়ে এ গল্প রাষ্ট্র নির্মাণ প্রকল্পের ব্যর্থতার কথাই আমাদের মনে করিয়ে দেয়। অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলার রাষ্ট্র নির্মাণের প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে আসে বহিরাগত শক্তি, বিশেষ করে নির্মাণাধীন রাষ্ট্রের জন্য একটি সেনাবাহিনী গঠন এবং সেনাবাহিনীকে পেশাদার যোদ্ধায় পরিণত করার কাজ হাতে নেওয়া হয়।
ইরাক ও আফগানিস্তানে এটা দেখা গেছে যে নিয়োগ ও প্রশিক্ষণকে মূল লক্ষ্য হিসেবে ঠিক করা হলেও প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ওপর মোটেও জোর দেওয়া হয়নি। ফলে একদিকে দুর্নীতি মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে পেশাগত জীবনকে ভালভাবে এগিয়ে নেওয়ার এবং জবাবদিহিতার নিকুচি ঘটে। ( এরপরই উঠে আসবে সাধারণ সেনাদের বেতন না দেওয়ার করুণ গল্প।আর সে সাথে একটি ভাবনা সবার মনেই উঁকি দেবে, তাহলো, কাবুল সরকারের সংশ্লিষ্টবিভাগ কী করে বছরের পর বছর ধরে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করেও পার পেয়ে যেতে পেরেছে?)
এদিকে আংশিকভাবে হলেও এ প্রশিক্ষণ আফগান সেনাদেরকে নিজ দেশের সম্ভাব্য পণ্যের ওপর নির্ভর করার বদলে প্রশিক্ষণ দাতাদের সম্পদের ওপর নির্ভরশীল হতে শিখিয়েছে। মার্কিন সেনাবাহিনী এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে যেখানে মার্কিন বিমান সমর্থন তাদের কাছে অতিআবশ্যকীয় উপাদান হয়ে উঠেছে। ওয়ালস্ট্রিট জার্নালে প্রকাশিত ও বহুল পঠিত এক খবরে বলা হয়েছে, মার্কিন বাহিনী তাদের বিমানবাহিনী নিয়ে সরে যাওয়ার সাথে সাথে আফগানবাহিনীর জন্য বিমান সমর্থনও হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেওয়ায় দূরবর্তী পাহারা চৌকিগুলোতে মোতায়েন আফগান সেনারা মোকাবেলা করতে পারে না। পত্রিকাটি বলছে, এ অবস্থায় যুদ্ধ করার বদলে আত্মসমর্পণ করাই আফগান সেনাদের জন্য সহজতর হয়।
আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো, আন্তর্জাতিক বাহিনী আফগান সেনাদেরকে যে প্রশিক্ষণ দিয়েছে সেখানেও, ইচ্ছাকৃত বা অন্য কোনো কারণে, প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার বিষয়টি পুরোপুরিই গরহাজির ছিল। এছাড়া, আফগান সেনাদের দুর্বল মনোবল নিয়েও অবিরাম কথা বলা হয়। তবে এ নিয়ে কথা বলা যত সহজ, বিশ্লেষণ ততো সহজ নয়।এসব কিছুই পেশাদারিত্বের সাথে যুক্ত। পেশাদারিত্বের সাথে মেধা, উদ্দেশ্য এবং শনাক্তকরণ জড়িয়ে আছে (আর এসবই প্রতিষ্ঠানের অনুষঙ্গ)। পাশাপাশি সমাজের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টিও রয়েছে। আইএসের হামলার মুখে মার্কিন প্রশিক্ষিত ইরাকি বাহিনীর যখন দ্রুত পতন ঘটে তখনো ইরাকি বাহিনীর মধ্যে এগুলোর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়নি। একইভাবে আফগানিস্তানেও এসব নেই। ইরাকিবাহিনী নিয়ে একটি দৈনিক যা বলেছিল তা এখানে তুলে ধরা যেতে পারে: যদি আস্থাকে পেশাদারিত্বের প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে ধরে নেওয়া হয় তবে ২০১৪ সালে ইরাকের সেনাবাহিনীর প্রতি দেশটির জনগণের আস্থা ছিল না।কেবল তাই নয়, ইরাকি বাহিনীর সদস্যরাও একে অপরকে মোটেও আস্থাভাজন হিসেবে মেনে নিতো না।
মার্কিন ও আফগান তালেবানের মধ্যে চুক্তির জেরে আফগান সরকারের স্থাপনাগুলোর বিরুদ্ধে সহিংসতা বেড়ে যায়। এক্ষেত্রে আফগান জনগণ একটি নিয়ামক হয়ে ওঠে। আফগান জনগণ ও সরকারকে একই সঙ্গে এ চুক্তির চড়া মূল্য দিতে হয়।
তবে সব দোষের নন্দঘোষ কেবল বহিরাগতরাই নয়।
কাবুলে আশরাফ গনি ও তাঁর চারপাশের মানুষগুলো নিজ দেশবাসীদের মন জয় করার মতো তেমন কোনো কাজ করেননি। আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চল শেষবার তালেবানের প্রভাব এড়িয়ে যেতে পেরেছিল। কিন্তু এবারে কাবুলের সঙ্গে টানাপড়েনই তালেবানের হাতে অঞ্চলটির দ্রুত পতনের আংশিক কারণ হয়ে ওঠে । সম্প্রতি ওয়াশিংটন পোস্টের খবরে বলা হয়েছে, বাদাখশানে পানি ও বিদ্যুতের দাবিতে বিক্ষোভরত মানুষদের ওপর আফগান বাহিনী গুলি চালিয়েছে। ২০১৭ সালে মাজার-ই-শরিফে একজন গভর্নরকে পদচ্যুত করেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি। আর এঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় আধাসামরিক বাহিনী ও কেন্দ্রীয় সরকারি বাহিনীর মধ্যে প্রায় সশস্ত্র সংঘাত বেঁধে যাওয়ার উপক্রম হয়।
সময়ের সাথে সাথে আরো অনেক কিছুর বিবরণ বিশদভাবে প্রকাশ হতে থাকবে। জেলা ও নগর পর্যায়ের ঘটনাবলীই কেবল প্রকাশিত হবে না বরং তালেবানরা যখন আফগানিস্তানে একের পর এক অঞ্চল নিজেদের কব্জায় নিয়ে আসছিল তখন স্থানীয় শক্তিরা কী চাইছিল তাও একদিন প্রকাশ হবে। শেষের এই কাতারে অর্থাৎ স্থানীয় শক্তিগুলোর মধ্যে পাকিস্তানও রয়েছে। এ কারণে নিন্দার দায় থেকে পাকিস্তানও রেহাই পাবে না। কিন্তু আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতার কথা শুধুমাত্র এক বা দুটিঅধ্যায়ই শেষহবে না বরং কাহিনীর মূলধারা হয়েই থাকবে।
[পাকিস্তানের ডন পত্রিকায় প্রকাশিত নিবন্ধের বাংলা রূপান্তর করেছেন সৈয়দ মূসা রেজা। ]
