যুদ্ধের যেসব গান রচনা করেছিলো অনুপ্রেরণার আখ্যান


মোঃ ইমরান | Published: March 27, 2022 12:18:56


যুদ্ধের যেসব গান রচনা করেছিলো অনুপ্রেরণার আখ্যান

মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি - আপেল মাহমুদের গাওয়া গানটি একাত্তরে হয়ে উঠেছিল যুদ্ধরত লাখো বাঙ্গালীর অনুপ্রেরণার গান।

ইতিহাস বলে, যখনই বন্দুকের নল দিয়ে শাসকের গুলি বর্ষিত হয়েছে তখনই স্বাধীনতাকামী মানুষের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে মুক্তির গীত। যুদ্ধের সময় অনুপ্রেরণা দিয়েছে এরকম গান নিয়েই আজকের এই লেখা।

প্রেইজ দ্য লর্ড অ্যান্ড পাস দ্য অ্যামুনেশন

চলছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। জাপান আক্রমণ করে পার্ল হারবারে। এই আক্রমণ পাল্টা আক্রমণের মাঝে আমেরিকার নৌ অফিসার যিনি একজন পুরোহিতও, সহযোদ্ধাকে বলেন,

প্রেইজ দ্য লর্ড অ্যান্ড পাস দ্য অ্যামুনেশন

যার অর্থ দাঁড়ায়,

ঈশ্বরের প্রশংসা করো এবং অস্ত্রটি আমাকে দাও

উপায়ন্তর ছাড়া মার্কিন সেনাদের বেহাল দশায় এই কথাটি ছিল ওই মুহূর্তে বাস্তবতা। পরবর্তী সময়ে তার উক্তিটি এতোটাই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে গীতিকার ফ্রাঙ্ক লেজার এই নামে রচনা করেন গান।

লেজারের জন্য গানটি বিস্ময়ের থেকে কম নয়। তিনি এই গানের মাধ্যমে যুদ্ধের পরিস্থিতি সহজ সরল আঙ্গিকে তুলে ধরে এগিয়ে যাওয়ার জন্য উৎসাহিত করেছেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বিশ্বের অর্থনীতি, রাজনীতি, গোটা সমাজ ব্যবস্থাই পাল্টে দেয় আর পার্ল হারবারে আক্রমণ মোড় ঘুরিয়ে দেয় বিশ্বযুদ্ধের। যুদ্ধে অটল লড়ে যাওয়ার জন্যে গানটি ওই সময়ে অনুপ্রাণিত করে মার্কিন সৈন্যদের।

দেয়ার উইল বি ব্লু বার্ডস ওভার দ্যা ক্লিফ অফ ডভার

এই গানটিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে কেন্দ্র করেই লেখা। ইউরোপের আকাশে 'ব্লু বার্ডের' উড়ে যাওয়া নতুন কোনো বিষয় নয়। বিশেষ করে বসন্তের সময়। তবে ১৯৪৩ সালের বসন্ত ছিল অন্যরকম।

আকাশ তখন ছেয়ে থাকতো বোমারু বিমানে। সাদা মেঘের পরিবর্তে ভেসে বেড়াতো কালো গুমোট বিমানের ধোঁয়া। গট্ গট্ শব্দ জানান দিত পাখিদের আনাগোনা এই আকাশে নেই।

এরকম সময়েই সঙ্গীত পরিচালক ওয়ালটার কেন্ট ও লেখক ন্যাট বার্টন তৈরি করেন কালোত্তীর্ণ গানটি। গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন ভেরা লিন।

এই গান যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের মানুষকে অনুপ্রেরণা দিয়েছে, আশ্বস্ত করেছে সুদিনের যখন ব্লু বার্ড আবার উড়বে ইংল্যান্ডের আকাশে।

বেলা চাও

যুদ্ধে অনুপ্রেরণামূলক গানের মাঝে বিশ্বখ্যাত স্প্যানিশ সিরিজ লা কাসা দে লা পাপেল বা মানি হেইস্টএর সূচনা সংগীত বেলা চাও দেখে অবাক হতে হচ্ছে নিশ্চয়ই। তবে গানটির সাথে যুদ্ধের সম্পর্ক কোথায়?

ইতিহাসবিদদের মতে গানটি উত্তর ইতালির মনডিনা শ্রমিকদের প্রতিবাদী গান। পরবর্তী সময়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে গানটি হয়ে ওঠে একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের স্লোগান।

বেলা চাওয়ের সুর ও তালে আকর্ষণীয়, স্লোগানর তালে গাওয়া সহজ। হয়তো এরকম কিছুই চাচ্ছিলে আট দশক পর মানি হেইস্টের নির্মাতারা। বেলা চাও গানের তালে তালে ওয়েব সিরিজের জনপ্রিয়তায় ঝুম করে বাড়ে।

মাঠের শ্রমিকের দ্রোহের গান জায়গা করে নেয় বলিউডের অভিনেতা আয়ুশমান সিং খুরানার ড্রয়িং রুমের পিয়ানোতেও।

এ্যা মেরে ওয়াতান কে লোগো

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইতালি, ইংল্যান্ড ও আমেরিকার সুরেলা অনুপ্রেরণা ষাটের দশকে এসে পৌঁছায় চীনা-ভারত সীমান্তে। তখন ভারত ও চীনের মাঝে চলছিল যুদ্ধ।

একমাস এক দিনের যুদ্ধে ভারতীয় শহীদের সংখ্যা অনেক। দেশের সৈন্যদের অনুপ্রেরণার জন্য সুর সম্রাজ্ঞী লতা মঙ্গেশকর দিল্লিতে ভারতের জাতীয় স্টেডিয়ামে ১৯৬৩ সালে নিজেদের প্রজাতন্ত্র দিবসে গানটি প্রথমবার গান।

এই গানে ভারতের শহীদ হওয়া সৈন্যদের জন্য রয়েছে শোক ও শ্রদ্ধাঞ্জলি। এছাড়া ভবিষ্যতে সৈন্যদের জন্য রয়েছে যুদ্ধে যাওয়ার অনুপ্রেরণা।

৬২ সালের চীনের সাথে লড়াইয়ের পর ৬৫ - তেই যুদ্ধ বাঁধে প্রতিবেশী পাকিস্তানের সাথে। যুদ্ধে অনুপ্রেরণা দেয়ার জন্য দুপক্ষ থেকেই রচনা করা হয় একের পর এক গান। ওই সময়েও এ্যা মেরে ওয়াতান কে লোগো ভারতীয় সেনাদের গানটি অনুপ্রেরণা জোগায়।

বাংলাদেশ বাংলাদেশ

যুদ্ধের সময় অনুপ্রেরণা দেয় এরকম বিভিন্ন গানের সুর একীভূত হয় ১ আগস্ট, ১৯৭১ সালে নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে। কনসার্ট ফর বাংলাদেশ - এই নামের সাথে যুক্ত আছেন জর্জ হ্যারিসন, বব ডিলান, এরিক ক্ল্যাপ্টন, আলী আকবার খাঁ এবং পণ্ডিত রবিশঙ্কর।

রবি শংকর তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু জর্জ হ্যারিসনের নিকট বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় বিশ্বে জনমত এবং সহযোগিতা অর্জনের লক্ষ্যে একটি কনসার্টের প্রস্তাবনা নিয়ে গিয়েছিলেন।

গানের লিরিকও জর্জ হ্যারিসন এই আঙ্গিকেই লিখেন।

জর্জ হ্যারিসনের বাংলাদেশ বাংলাদেশ গানটি ওই সময়ে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অনুপ্রেরণার পাশাপাশি গানটি আকর্ষণ টেনে নিতে সক্ষম হয় পুরো বিশ্ববাসীর। ক্লাসিক্যাল, ফোক ও রকের মতো বিভিন্ন ধারার ভিন্ন ভিন্ন সংগীত শিল্পীদের একই মঞ্চে আগে কখনো দেখা যায়নি, এমনকি এখন পর্যন্তও এই দৃশ্যটি বিরল।

তীর হারা ঐ ঢেউয়ের সাগর

হ্যারিসনের বাংলাদেশ জনমত গঠনে সক্ষম হলেও স্বাধীনতার অর্জনের এই তীরহীন সাগর পাড় করতে হতো খোদ বাংলাদেশিদেরই।

স্বাধীনতা যাত্রা সহজ ছিল না। তাই মুক্তিকামী মানুষের জন্য স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম রণসঙ্গীতের পরিণত হয় এই গান। গানটির কথা লিখেছেন গোবিন্দ হালদার যার গীতিকার ও সুরকার আপেল মাহমুদ।

মোরা একটি ফুল (বাংলাদেশকে) বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি। জনযুদ্ধের সময়কার আরো অনেক গান বাংলাদেশের বেতার থেকে মুক্ত হয়ে যুদ্ধরত স্বাধীন বাংলার প্রতিটি মুক্তিযোদ্ধা, প্রতিটি ঘরে ঘরে আশার বাণী হয়ে বেজে ওঠতো।

কালজয়ী গানগুলো সেই সময়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মতো সাহস জোগাতো একেকজন মুক্তিকামী মানুষকে।

অনুপ্রাণিত করতো ইংরেজ আকাশের দেয়ার উইল বি ব্লু বার্ডের মতো যে একদিন পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠবেই, হবে জয় বাংলা, বাংলার জয়।

মোঃ ইমরান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করছেন।

imran.tweets@gmail.com

Share if you like