ইচ্ছে ছিল বিয়ে করবেন কোনো এক রেস্তোরাঁর সোপানে। থাকবে অসংখ্য ফুল, দেখা যাবে দূরে বয়ে চলা নিপার নদী আর মাথার ওপর তারা ঝলমল আকাশ থাকবে ছাদ হয়ে।
বিয়ে হয়েছে ঠিকই, তবে সেখানে নিপার নদীর কলকলের পরিবর্তে ছিল যুদ্ধের সাইরেন আর আকাশে ছিল একরাশ আতংক।
ইউক্রেনীয় এরিভা ও ফুরসিনের বিয়ের গল্প এটি। রাশিয়া-ইউক্রেনে চলমান সংঘর্ষের মাঝে সদ্য বিবাহিত প্রেমিক যুগল তারা। শুধু এরিভা ও ফুরসিনই নয়, যুদ্ধে প্রেম-ভালোবাসার এরকম অনেক গল্পের সাক্ষী এখন ইউক্রেন।
এই যুদ্ধে কেউ শেষবারের জন্য দেখতে চায় তার আপনজনকে, স্মরনীয় করে রাখতে চায় নিজেদের মুহূর্ত। আবার অনেকেই করছে দেশ থেকে পালানোর সংগ্রাম। এমন বিপর্যয়ে প্রেম, স্বজন হারানোর বেদনা ও টিকে থাকার সংগ্রাম যে মহাকাব্যের মতো হয়ে উঠেছে।
যুদ্ধের দামামার মাঝে এরিভা ও ফুরসিনের বিয়ে
২১ বছরের ইয়ারিন এরিভা ইউক্রেনের কিয়েভ শহরের একজন ডেপুটি কাউন্সিল আর সিলাতোস্লাভ ফুরসিন হলেন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার।

জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিনটি স্মরণীয় করতে চেয়েছিলেন তারা। দীর্ঘদিনের প্রেম অবশেষে বিয়ের রূপ নিতে যাচ্ছে, আয়োজন চলছিল পুরোদমে।
দুজনের পরিকল্পনা মোতাবেক তাদের বিয়ে হওয়ার কথা এই বছরের ১৮ মে। নিপার নদীর তীরবর্তী কিয়েভ শহরের একটি রেস্তোরাঁয় বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার ইচ্ছে ছিল তাদের।
তবে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণে বিয়ে আদৌ হবে কিনা এই নিয়েই আশঙ্কা দেখা দেয় দুজনের মনে। তাই দেরি না করে ভয়, আতঙ্ক ও সাইরেনের শব্দের মাঝে পাশের গির্জাতেই পাদ্রীর উপস্থিতিতে তারা সেরে ফেলেছেন বিয়ে।
সমস্যার নিরসন এখানেই হচ্ছে না এই নবদম্পতির। বিয়ের পর বাকিদের মতো আনন্দ করছেন না তারা। তাদের পরিকল্পনা স্থানীয় আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা কেন্দ্রে যোগদান করা।
“যে ভূমিতে থাকি এবং আমাদের প্রিয়জনদের রক্ষা করতে হবে,” আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তা-ই বলেছেন এই নবদম্পতি। বিয়ে সম্পন্ন করেই হাতে নিয়েছেন বন্দুক, দেশকে রক্ষা করছেন পাশাপাশি।
এদিকে এরিভা বর ফুরসিনকে ভরসা দিচ্ছেন, “একদিন আমরা বিবাহ বার্ষিকী পালন করবো। সেদিন কোনো ভয় থাকবে না, থাকবে না কোনো আক্রমণের শংকা।”
বিয়ের পর দুজনই যাচ্ছেন দেশকে রক্ষা করতে। এরিভা ও ফুরসিন ফিরে আসতে পারবে কি? পারবেন কি তাদের প্রতিশ্রুত বিবাহবার্ষিকী উদযাপন করতে?
জেরেমি ও মারিয়ার অনিশ্চিতয়তা
জেরেমি মায়ের বসবাস করেন ম্যানচেস্টারে আর তার প্রেমিকা মারিয়া রোমেনেনকো থাকেন ইউক্রেনের কিয়েভে। যুদ্ধ হতে পারে এই আশঙ্কায় এক নজর দেখতে জেরেমি চলে যান মারিয়ার কাছে।

যুদ্ধের আশঙ্কার জন্য তারা পোল্যান্ডে দেখা করেন। সেখানে নয় দিন থাকার পর জেরেমি ম্যানচেস্টার যাবার আগে কিয়েভে চলে আসেন তারা। কিন্তু তখনই শুরু হয় রাশিয়ার দখল অভিযান। আটকে পড়েন জেরেমি ও মারিয়া।
মারিয়া একজন সাংবাদিক হওয়ায় ভুগছেন নিরাপত্তাহীনতায়। অনাকাঙ্ক্ষিত হামলা এবং নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা মারিয়া পরিবার ছেড়ে যাওয়ার বেদনায় চিন্তিত।
“আমি মনে করিনি ঘটনা এতো তাড়াতাড়ি এগিয়ে যাবে এবং আমাকে পরিবার ছেড়ে যেতে হবে,” বলেন মারিয়া।
বিদায়ের আগে বন্ধুদের সাথে সময় কাটান জেরেমি ও মারিয়া। দেশ ছাড়ার প্রস্তুতি প্রায় শেষ তাদের। পরের দিন ওঠেই চারদিকে শোনে হামলার খবর।
১৮-৬০ বছরের পুরুষ ইউক্রেন ছেড়ে যেতে মানা - সরকারি নির্দেশ
আসন্ন রাশিয়ার হামলায় ইউক্রেন সরকার দেশব্যাপী মার্শাল ল জারি করেছে। এই মার্শাল ল অনুযায়ী কেবলমাত্র নারী ও শিশুরা ইউক্রেন ছেড়ে নিরাপদ স্থানে যেতে পারবে।
তবে ১৮-৬০ বছরের পুরুষ সদস্যরা পরিবারকে সাথে নিয়ে ইউক্রেন ছাড়তে পারবে না। তাদের থাকতে হবে ইউক্রেনে। মোকাবেলা করতে হবে আগ্রাসিত রাশিয়ান বাহিনীকে।

এজন্য রেলস্টেশন ও বিমান বন্দরে দেখা যাচ্ছে হৃদয়বিদারক দৃশ্য। ভ্লাদ তার দুই বছরের ছেলে দানিয়াকে স্ত্রী তাতিয়ানার হাতে তুলে দিচ্ছেন। বাবার যে থেকে যেতে হবে কিয়েভে, নিশ্চিত করতে হবে ভবিষ্যত ইউক্রেনের সন্তানদের!
মোঃ ইমরান বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করছেন।
imran.tweets@gmail.com
