মোহাম্মদপুরের শওকত তেহারী - ৩৭ বছরের ঐতিহ্যের স্বাদ


মাহমুদ নেওয়াজ জয় | Published: February 23, 2022 13:10:09 | Updated: February 23, 2022 22:48:39


মোহাম্মদপুরের শওকত তেহারী - ৩৭ বছরের ঐতিহ্যের স্বাদ

মোহাম্মদপুর এলাকাটার নাম শুনলেই কল্পনায় যেন ভেসে উঠে নানা অম্ল-মুধুর চিত্র। জেনেভা ক্যাম্পের বিখ্যাত কামাল, মামা, বোবার বিরিয়ানী ভোজনরসিকদের অনেকেরই প্রিয়৷ এর বাইরেও আছে টাউন হলের বিভিন্ন বার্গারশপ ও হালিমের দোকান।

তবে যদি বলা হয় তেহারীর কথা, একবাক্যে স্থানীয়রা বাতলে দেবেন শওকত তেহারী ঘরকে বেছে নেওয়ার কথা।

তেহারী নিয়ে আগে অল্প-দুয়েক কথা বলে নেয়া যেতে পারে। তেহারী খাবারটি মূলত পাক্কি বিরিয়ানী, অর্থাৎ চাল ও মাংস এখানে আলাদা করে রান্না করে তারপর মেশানো হয়।

কাচ্চিতে খাসি বেশি জনপ্রিয় হলেও রান্নার ধরনের কারণে তেহারীতে গরুর মাংসের প্রচলনই বেশি। গরুর মাংস আনুপাতিকভাবে শক্ত প্রকৃতির হওয়ায় মাংসের আকার ঠিক থাকে।

যেহেতু তীব্র জ্বালে রান্না করা হয়, তাই গরু কিংবা মহিষের মাংস এখানে বেশি উপযোগী। তাছাড়া তেহারীর মাংসের আকার হয় ছোট। কাজেই আকারে ছোট হলেও গরু ব্যবহারের ফলে মাংস গলে যায় না ।

তাত্ত্বিক কথাবার্তা এ পর্যন্তই থাক। এবার যাওয়া যাক শওকত তেহারী ঘরে৷

মোহাম্মদপুর টাউন হল এলাকায় অবস্থান এই দোকানটির। একটু সামনেই বিপরীত দিকে অবস্থিত শিয়াদের অন্যতম পবিত্র ধর্মীয় নিদর্শন ইমাম বাড়া। শওকত তেহারী ঘরের পাশের গলির ভেতরে রয়েছে সারিবদ্ধ বিভিন্ন মাংসের দোকান, তেহারীর মাংস ওখান থেকেই আসে।

দোকানের সামনে বাহারী কোনো সাইনবোর্ড নেই, একটা ব্যানারে বড় করে লাল বর্ণে লেখা আছে শওকত তেহারী ঘর। পাশে আছে জান্নাত হোটেল৷ আর এরপরও খুঁজে না পেলে স্থানীয় কাউকে জিজ্ঞাসা করলেই পেয়ে যাবেন দোকানটি।

আজ থেকে সাঁইত্রিশ বছর আগে, ১৯৮৫ সালে পাঁচ-ছয়জন মানুষ বসার ব্যবস্থা নিয়ে দোকান শুরু করেছিলেন বাবুর্চি শওকত আলী। তখন এটা ছিলো টিনের চালা দেওয়া ছোট একটি ঘর। এখনো যে দোকানটি খুব বড়, এমন নয়। দোকানে আছে মোট পাঁচটি টেবিল, সেখানে বিশজন মানুষ বসা যায়।

এ দোকানে গরুর তেহারী ছাড়াও মিলবে গরুর কাচ্চি, খাসির কাচ্চি এবং মোরগ পোলাও। তেহারীর বিশেষত্ব হলো এখানে চাল ও মাংসের সাথে ছোট ছোট দেশি আলু দেয়া হয়।

মোহাম্মদপুরের একসময়ের বাসিন্দাদের বেশিরভাগই ছিলেন বিহারী বা পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আগত, তাই তাদের রান্নায় পাকিস্তানী রান্নার একটা ছাপ পাওয়া যায়। শওকতের তেহারীর আলুর ব্যাপারটা এখান থেকেই এসেছে।

বর্ষীয়ান এই বাবুর্চিকে এখনো নিয়মিত দেখা যায় সফেদ পাঞ্জাবী-পাজামা সজ্জিত হয়ে দোকানের ক্যাশে বসে থাকতে কিংবা খাবার তদারকি করতে। বয়সের কারণে নিজে রান্না ছেড়েছেন, তবে মান যাতে অটুট থাকে সেজন্য এখনো নিজেই সব তদারকি করেন।

শুরুটা তেহারী দিয়ে হলেও ক্রমে মোরগ পোলাও, খাসি ও গরুর কাচ্চি, জর্দা পোলাও তৈরি হয়েছে তার দোকানে। এছাড়া বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে আছে তাদের তৈরি করা চমৎকার বোরহানি আর আলুবোখারার চাটনি৷

দোকানটির অন্য কোনো শাখা করেননি তিনি, দেননি কর্পোরেট রূপ। কারণ হিসেবে জানালেন দোকানের বর্তমান বিক্রিতেই সন্তুষ্ট তিনি, চেষ্টা করছেন নিজে সব দেখে-শুনে স্বাদ-মান ঠিক রেখে দোকান চালাতে।

প্রতিদিন দুপুর বারোটা থেকে রাত এগারোটা পর্যন্ত অবিরত বিক্রি-বাট্টা চলে এখানে। সব পদেরই বিক্রি ভালো, বিশেষত তাদের পোস্টার ফুড তেহারীর। প্রতিদিন দোকান+ অর্ডার/ক্যাটারিং মিলে ৫০০ প্যাকেটেরও বেশি খাবার বিক্রি হয়।

তেহারী প্রতি প্লেট ১৩০ টাকা। পরিমাণে বেশ ভালো থাকে। আলুবোখারার চাটনি পাওয়া যায় ২৫ ও ৫০ টাকার। বোরহানির গ্লাস ৩০ ও লিটার ১২০ টাকা। এছাড়া গরুর কাচ্চি ১৪০, খাসির কাচ্চি ১৫০ ও মোরগ পোলাও ১৩০ টাকা।

সাঁইত্রিশ বছরের পুরনো দোকানটি এখনো পরম মমতায় আগলে রেখেছেন শওকত ও তার পুত্র বেলায়েত। ফেরার সময়ও দেখা গেল জীবন সায়াহ্নে এসেও দোকান ও খাবারের দেখভালে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন সাদা পাঞ্জাবী-পাজামায় পরিপাটি দীর্ঘদেহী শওকত আলী।

মাহমুদ নেওয়াজ জয় বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে চতুর্থ বর্ষে অধ্যয়নরত।

mahmudnewaz939@gmail.com

Share if you like