বিটকয়েন, ব্লকচেইন, ক্রিপ্টোকারেন্সি, ডিজিটাল ওয়ালেট বর্তমান সময়ে সকলের কাছে বহুল পরিচিত শব্দসম্ভার বলা চলে। তবে নতুনত্ব হচ্ছে এসব অর্থনীতি বিষয়ক শব্দে সোশ্যাল মিডিয়ার সম্পৃক্ততা। ব্যাপারটা বেশ কৌতুহলোদ্দীপক বটে।
সবকিছু যখন হয়ে যাচ্ছে অতি আধুনিক তখনই টেক জায়ান্ট ফেসবুকের নজর পড়ে অর্থনীতিতে। ২০১৯ সালের ডিজিটাল কারেন্সি ‘লিব্রা’ বাজারে আনার ঘোষণার খবর ঠিক এদিকেই ইঙ্গিত করছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সম্প্রতি ফেসবুকের মেটা ইনক. কর্পোরেটে রূপান্তরের খবর আর মেটাভার্সের ভবিষ্যত পরিকল্পনার শোরগোলে বেশ খানিকটা আড়ালে পড়ে গেছে তাদের অভিসন্ধি।
লিব্রা মূলত ক্রিপ্টোকারেন্সির গতানুগতিক ধারার একটা আপডেট ভার্সন বলা চলে। লিব্রার কনসেপ্ট ছিল ফেসবুকের মাধ্যমে ডিজিটাল কারেন্সির প্রচলন করা। লিব্রার মডেল মোতাবেক এটি পেপাল ও বিকাশের মতো ই-ওয়ালেট।
সকলের পেপাল বা বিকাশ অ্যাকাউন্টে যেমন ডলার বা টাকা জমা থাকে। যার ফলে এক ব্যক্তি যেমনভাবে আরেক ব্যক্তির একাউন্ট থাকা সাপেক্ষে মুদ্রা আদান-প্রদান করা যায়। আবার বিকাশ বা পেপাল অ্যাপ ব্যবহার করে কেনাকাটাও করতে পারে সহজে। লিব্রা ওয়ালেটের মাধ্যমেও একই কাজগুলো করা যাবে।
তবে এটি যেহেতু ফেসবুকের আওতাধীন, কিছু চমক থাকাটাই স্বাভাবিক। ফেসবুক কর্তৃপক্ষ বলছে যে লিব্রা হবে বিশ্বের প্রথম গ্লোবাল কারেন্সি। যেকোনো দেশে এর ব্যবহার করা যাবে। তাছাড়া এটির মূল্য স্থির থাকবে, রাতারাতি বৃদ্ধি বা হ্রাসের আশঙ্কা নেই। যা অন্যান্য ক্রিপ্টোকারেন্সির মূল সীমাবদ্ধতা।
সরাসরি ফেসবুক তথা মেটার মেসেঞ্জার এবং হোয়াটসঅ্যাপ থেকেও এই লিব্রা কয়েন আদান-প্রদান করা সম্ভব হবে।
এছাড়া অন্যান্য ডিজিটাল ই-ওয়ালেটের মতো ক্যাশ ইন করতে বা আউট করতে হাই ক্রেডিট কার্ড চার্জ বা ব্যাংক চার্জ বা এ ধরনের কোন ক্যাশ-ইন চার্জ বহন করতে হবে না ইউজারকে।
যদি কোনো ফি-ও বহন করতে হয়, তবে তা হবে খুবই সামান্য। তাদের এ প্রক্রিয়া কেবল প্রতিষ্ঠিত গ্রাহক ও ব্যবসার মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়ন করবে না, এর বাইরে যারা ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত নন, এমন গ্রাহককেও প্রথমবারের মতো আর্থিক সেবা নেওয়ার সুযোগ করে দেবে।
আর এসব কাজের দায়িত্বে থাকবে ক্যালিব্রা এসোসিয়েশন, যা ফেসবুকের আওতার বাইরে থাকবে।
এসব তো গেল সুবিধার কথা। ২০২০ সালের শুরুর দিকে লিব্রা প্রজেক্ট শুরুর হওয়ার কথা থাকলেও এখনো তা সম্ভব হয়নি। বিস্ময়কর হলেও এটাই সত্যি যে, লিব্রার প্রচলন হলে মার্ক জাকারবার্গ হয়ে যেতে পারেন বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি। পুরো বিশ্বের অর্থব্যবস্থা চলে আসতে পারে তার হাতের মুঠোয়।
লিব্রার প্রচলন হলে ব্যাংকিং ব্যবস্থাও নড়বড়ে হয়ে যেতে পারে। তাছাড়া মানি লন্ডারিংও সহজ হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বৈশ্বিক নীতিনির্ধারক ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো। ফলে নিষেধাজ্ঞা জারি করে বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছে অন্যতম ধনী দেশ যুক্তরাষ্ট্র।
তবে ফেসবুক কি পিছু হটেছে? না। ফেসবুকের বক্তব্য অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রে তাদের যাবতীয় পরিকল্পনা সফল না করতে পারলেও তারা লিব্রা প্রজেক্ট কোনোভাবে বাতিল করতে রাজি ছিল না প্রথমদিকে। প্রয়োজনে পরিকল্পনায় পরিবর্তন এনে মেটা ব্যবসাক্ষেত্র হিসেবে টার্গেট করবে সুইজারল্যান্ড। করেছেও তাই।
২০২০ সালের ডিসেম্বরে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ জানায়, লিব্রার মডেলের নানা সমালোচনা থেকে নিজেদের দূরে রাখতে তারা পরিকল্পনা নিয়েছে ডিয়েম প্রজেক্ট।
কিন্তু ২০২২ তো শুরু হয়ে গেল। ডিয়েমের দেখা কোথায়? এখানেও টেক জায়ান্ট ফেসবুক দেখিয়েছে তাদের আরেকটি মাস্টারপ্ল্যান। গ্রাহকের খরচ কমানোর বাহানায় তারা বাজারে নিয়ে আসতে চেয়েছিল নোভি ওয়ালেট।
ইতোমধ্যে ডিয়েমের কাজ সম্পন্ন হলেও তারা বসে ছিল কবে নোভি ওয়ালেটের কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার অপেক্ষায়। তারা চাইলে যেকোনো সময় ডিয়েম লঞ্চ করতে পারতো তবে নোভির মুনাফা হাতছাড়া করতে না চাওয়ায় দুটো প্রজেক্ট একসাথে বাজারে আনার পরিকল্পনা করেছিল ফেসবুক।
প্রশ্ন একটাই, ফেসবুক অদূর ভবিষ্যতে অর্থব্যবস্থাকে কতটুকু নিয়ন্ত্রণ করবে?
তবে লিব্রা থেকে ডিয়েমে নাটকীয় পরিবর্তনের পরে হঠাৎ গত বছর নভেম্বরে ডেভিড মার্কাস ফেসবুক থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত জানান।
তিনি ২০১৮ সালের মে থেকে প্রতিষ্ঠানটির অর্থনীতি ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। নোভি ওয়ালেটের পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন ডেভিড মার্কাস।
তাছাড়া, ডিয়েম অ্যাসোসিয়েশন চালু করার পর জনপ্রিয়তা পাওয়ার বদলে সিনেটরদের নানা সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়েছে সেটির।
জেনেভায় অনুষ্ঠিত আলোচনা সভার পূর্বেই বাদ পড়েন অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান ৭ সদস্য। যার মধ্যে ছিল পেপাল, ইবে, স্ট্রাইপ, ফাইনেন্সিয়াল সার্ভিস জায়ান্ট ভিসা এবং মাস্টারকার্ড, যারা ডিয়েমের অর্থনীতি ও প্রযুক্তির দক্ষ হাতিয়ার হিসেবে যুক্ত হয়েছিল।
এছাড়াও বাদ পড়ে আর্জেন্টিনার অনলাইন পেমেন্ট প্লাটফর্ম মারক্যাডো পাগো এবং অনলাইন ট্রাভেল কোম্পানি বুকিং হোল্ডিংসের মতো প্রতিষ্ঠান। ফলে বিপুল পরিমাণে ক্ষতির আশঙ্কায় লিব্রা তথা ডিয়েম প্রজেক্ট বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ।
আসরিফা সুলতানা রিয়া বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত।
asrifasultanareya@gmail.com
